জগন্নাথপুরের সাত তরুণের গল্প

জগন্নাথপুরের সাত তরুণের গল্প
জগন্নাথপুর অফিস
তাঁরা সাত বন্ধু, বয়সে তরুণ। সবাই কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী। সমাজের বিভিন্ন উন্নয়নমুলক কাজ ও মানবিক কাজে মানুষের পাশে দাঁড়ানো তাদের প্রত্যয়। করোনা পরিস্থিতিতে জগন্নাথপুর উপজেলার এ তরুণরা সামাজিক ও মানবিক কাজে শুরু থেকে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত রেখেছেন। এখন তাঁরা মুমূর্ষু করোনা রোগীর বাড়ি বাড়ি গিয়ে পৌঁছে দিচ্ছেন বিনামূল্যে অক্সিজেন সেবা। স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার পরামর্শে তাঁরা এ কাজ করেছেন। তরুণরা হলেন জগন্নাথপুর উপজেলার পাটলী ইউনিয়নের পাটলী গ্রামের বাসিন্দা সিলেট মদন মোহন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জুহের আহমেদ চৌধুরী, জগন্নাথপুর ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী যথাক্রমে জুনেদ আহমেদ, নুর আলী, ফয়সল আহমেদ, ফুজেল আহমেদ, মাছুম চৌধুরী ও জুবেল আহমেদ।
এলাকাবাসী ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র জানায়, করোনা পরিস্থিতিতে মুমূর্ষু করোনা আক্রান্ত রোগীর কথা চিন্তা করে উপজেলার পাটলী ইউনিয়নের প্রবাসীদের উদ্যোগে পাটলী বেসরকারি হাসপাতালে ২০ টি অক্সিজেন সিলিন্ডার প্রদান করা হয়। এসব অক্সিজেন সিলিন্ডার করোনা আক্রান্ত মুমূর্ষু রোগীর ব্যবহারে কাজে লাগাতে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার পরামর্শে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়। এজন্য শুরুতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করতে এগিয়ে আসেন এই সাত তরুণ। জগন্নাথপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী ঝিগলী গ্রামে এক মুমূর্ষু করোনা রোগীকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকের পরামর্শে অক্সিজেন সেবা পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে তাদের মানবিক কার্যক্রম শুরু হলেও এখন দিন রাত উপজেলার নানা প্রান্তে খবর পেলেই মুমূর্ষু করোনা রোগীর সেবায় বিনামূল্যে অক্সিজেন সেবা নিয়ে তাঁরা হাজির হচ্ছেন। নিজেদের শ্রম ও অর্থ ব্যয় করে ঝুঁকিপূর্ণ এমন মানবিক সেবা করতে পেরে তাঁরা নিজেরা আনন্দিত। আর তাদের কার্যক্রমের প্রশংসা ছড়িয়ে পড়ছে উপজেলাব্যাপী। শুধু অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়াই নন নিজেদের উদ্যাগে বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকার নিবন্ধন করে দেওয়া। গণটিকা কার্যক্রমে স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব পালন কাজে সক্রিয় ছিলেন।
স্বেচ্ছাসেবকটিমের সমন্বয়ক জুহের আহমেদ চৌধুরী বলেন, আমরা একান্তই সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিকমুল্যবোধ থেকে করোনাকালে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য কাজগুলো করছি। আমাদের সাত বন্ধু নিজস্ব মোটরসাইকেল যোগে আমরা চিকিৎসকের পরামর্শে কাজ করছি। এসব কাজ করতে আমাদের মধ্যে সমন্বয় ও আন্তরিকতা রয়েছে। স্বেচ্ছাসেবক জগন্নাথপুর ডিগ্রি কলেজের ডিগ্রি প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী জুনেদ আহমেদ বলেন, মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য এমন মানবিক শ্লোগান আমাদেরকে এ পথ চলতে অনুপ্রাণিত করছে। জুনেদ তাঁর এ কাজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জানান, এক বৃদ্ধ নারী। তাঁর ছেলে মেয়ে সবাই প্রবাসে। করোনা আক্রান্তের খবর পেয়ে আত্মীয় স্বজনও প্রতিবেশীরা তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করেছেন। আমরা চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে অক্সিজেন সেবা দেওয়ার পর তিনি অনেকটা সুস্থ বোধ করেন এবং আমাদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা তুলে ধরেন। করোনাকালে অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের মুখে একটু হাসি ফুটাতে পারার তৃপ্তিতে আমরা তৃপ্ত।
পাটলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজুল হক বলেন, ওই তরুণরা শুধু অক্সিজেন সেবায় নিজেদের নিয়োজিত রাখেননি। তাঁরা করোনার শুরু থেকে হতদরিদ্রদের খুঁজে খুঁজে সরকারি বেসরকারি খাদ্য সহায়তা ঘরে পৌঁছে দেওয়া সহ সামাজিক ও মানবিক কাজে সম্পৃক্ত ছিল। তাদের কাজে আমরা সন্তোষ্ট।
জগন্নাথপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মধু সুধন ধর বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের পাশে মানবিক কাজে দাঁড়িয়ে ওই সাত তরুণ মানবসেবার দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন। উপজেলার নানা প্রান্তে আমাদের পরামর্শে তাঁরা করোনা আক্রান্ত মুমূর্ষু রোগী কে অক্সিজেন সেবা দিয়ে সুস্থ করে তুলতে ভূমিকা রাখছেন। তিনি বলেন, সাম্প্রতিককালে করোনা আক্রান্ত প্রত্যন্ত এলাকার কমপক্ষে ২০ জন মুমূর্ষু রোগী কে তাঁরা এ সেবা দেওয়ায় রোগীরা সঙ্কটাপন্ন অবস্থা থেকে সুস্থ হয়ে উঠেছেন। তাদের কার্যক্রম নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পদ্মাসন সিংহ বলেন, করোনাকালে মানবিক কাজে ওই তরুণের স্বেচ্ছাশ্রম স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমি তাদের সফলতা কামনা করছি।