‘জগৎজ্যোতিদের আলোতে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি’

স্টাফ রিপোর্টার
সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের প্রাক্তন ছাত্র শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি দাসের প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রদান এবং আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের শহীদ চার শিক্ষার্থীর স্মৃতিস্তম্ভে এই শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করা হয়।
বুধবার সকাল সাড়ে ১০টায় সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের আয়োজনে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি দাসের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রদান ও আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর রজত কান্তি সোম মানস। সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক (বাংলা) মো. জাকির হোসেন’র সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন সহযোগী অধ্যাপক (রাষ্ট্রবিজ্ঞান) মো. জামসিদ আলী, সহযোগী অধ্যাপক (পদার্থ বিজ্ঞান) অধ্যাপক আব্দুর রকিব তারেক, সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান (বাংলা) ড. রোখসানা পারভীন চৌধুরী।
আলোচনা সভায় সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর রজত কান্তি সোম মানস শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, পৃথিবীর ইতিহাসে বাংলাদেশের অভ্যুদয়, স্বাধীনতা সংগ্রাম একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। আগামী দিনেও আমাদের মুক্তিসংগ্রাম বিশ^ রাজনীতি ও সমাজনীতির ক্ষেত্রে পৃথিবীর মানুষকে জাগ্রত করবে মানবতার প্রতিষ্ঠায়। আমরা আশা করি আমাদের মাতৃভূমি নিজের স্বকীয়তা নিয়ে আরও বলশালী হয়ে এগিয়ে যা্েব। তিনি বলেন, নিজেদের ইতিহাস ঐতিহ্য সম্পর্কে আমাদের সচেতন হওয়া উচিত। মুক্তিসংগ্রামে আমদের সূর্যসন্তান মুক্তিযোদ্ধারা জীবন নিবেদিত করেছিলেন। আমাদের হৃদয়ের মধ্যে যদি স্বাধীনতার দেশপ্রেম বোধ কাজ না করে, জাতিরজনক বঙ্গবন্ধুকে যদি আমরা চৈতন্যে ধারন করতে না পারি তাহলে বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথে আমরা বিভ্রান্ত হবো। আমাদের সবচেয়ে গর্বের বিষয়, অহংকারের বিষয়, সবচেয়ে মহৎ অর্জন আমাদের স্বাধীনতা।
সহযোগী অধ্যাপক (রাষ্ট্রবিজ্ঞান) মো. জামসিদ আলী বলেন, গণতন্ত্রের মূল উৎসই হচ্ছে স্বাধীনতা। জগৎজ্যোতি মাতৃভূমির জন্য নিজের জীবনটাকে বিলিয়ে দিয়েছেন। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হককে বলা হতো বাংলার বাঘ আর সুনামগঞ্জের বাঘ ছিলেন দাশ পার্টির নেতা জগৎজ্যোতি। জগতের আলো ছিল। তিনি বলেন, দেশের শান্তি, কল্যাণ এবং উন্নয়নের জন্য আমাদের কাজ করতে হবে।
সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান (বাংলা) ড. রোখসানা পারভীন চৌধুরী বলেন, দেখা যাচ্ছে বর্তমান প্রজন্ম ইতিহাস বিমুখ হয়ে যাচ্ছে। নিজেদের ইতিহাস সম্পর্কে আমরা সবচেয়ে কম জানি। জগৎজ্যোতি দাস সুনামগঞ্জের গর্ব, সুনামগঞ্জ ুসরকারি কলেজের গর্ব। তিনি বলেন, হানাদার বাহিনী জগৎজ্যোতির লাশ চিহ্নিত করার জন্য তার মা-বাবাকে ডেকেছিলো। এসময় তারা তাদের মৃত সন্তানের সামনে বলেছে না, এটা আমার সন্তান না। কারণ তাতে করে অন্যান্যরাও ধরা পড়ে যাবে। বলেছিলেন-আমাদের ছেলের হাতে ছয়টা আঙ্গুল। এরকম সাহস, এরকম মনোবল, মৃত সন্তানের সামনে কারো হতে পারে কি না আমার জানা নেই। এই কারণেই জগৎজ্যোতির মতো সন্তানেরা আলো ছড়িয়েছে আর আজ আমরা স্বাধীনতার আলো পেয়েছি। এরকম আরো অনেক সূর্যসন্তানদের সম্পর্কে আমাদের জানতে হবে। কারণ নিজেদের জানাটা সবচেয়ে বেশী জরুরী।
অনুষ্ঠানে কলেজের শিক্ষকবৃন্দ এবং শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে সকাল ৯টায় প্রথমে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরীর পক্ষ থেকে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করা হয়। এরপর শহীদ বেদীতে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এসময় উপস্থিত ছিলেন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরীর সহসভাপতি লেখক সুখেন্দু সেন, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সালেহ আহমদ, সহসাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাহবুবুল হাছান শাহীন, সদস্য অ্যাডভোকেট আনোয়ার হোসেন, অ্যাডভোকেট সবিতা চক্রবর্তী, অ্যাডভোকেট সুরঞ্জিত গুপ্ত রঞ্জু, সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক (পদার্থ বিজ্ঞান) অধ্যাপক আব্দুর রকিব তারেক প্রমুখ।
প্রসঙ্গত, দেশ স্বাধীন হবার ঠিক এক মাস আগে ১৯৭১ সালের ১৬ নভেম্বর মাত্র ২২ বছর বয়সে নিজের বাড়ির খুব কাছে ‘খইয়া গোপী’ বিলে শত্রুর বুলেটে জীবনাবসান হয় জগৎজ্যোতির। একাত্তরে জগৎজ্যোতির নেতৃত্বে প্রশিক্ষিত চৌকস যোদ্ধাদের নিয়ে গঠিত হয় গেরিলা দল, যার নাম দেওয়া হয় ফায়ারিং স্কোয়াড ‘দাস পার্টি’। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত জগৎজ্যোতি ছিলেন উত্তর-পূর্ব রণাঙ্গণে ভরসার কেন্দ্রস্থল। জগৎজ্যোতির আত্মত্যাগের সংবাদটি সে সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, অলইন্ডিয়া রেডিওসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়। তাঁর অসীম সাহসিকতার প্রতি সম্মান জানিয়ে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরণোত্তর সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় খেতাব প্রদানের ঘোষণা দেয়। এ ঘোষণা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ও অল ইন্ডিয়া রেডিওতেও প্রচার হয়। কিন্তু প্রতিশ্রুত সে খেতাব আজও মেলেনি জগৎজ্যোতির। পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে বীরবিক্রম খেতাব দেওয়া হয় জগৎজ্যোতিকে। ১৯৯৮ সালের ৭ মার্চ স্বাধীনতা যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর বউদি ফনিবালা দাসের হাতে তাঁর বীরবিক্রম সম্মাননা ও ক্রেস্ট তুলে দেন।