- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://sunamganjerkhobor.com -

‘জনগণের মুক্তিই আমার লক্ষ্য’

স্টাফ রিপোর্টার
১৯৭১ সালের ১৭ মার্চ বুধবার ছিল বঙ্গবন্ধুর ৫২তম জন্মদিন। দুপুরে ধানমণ্ডির বাসভবনে একজন সাংবাদিক বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করেন, আপনার ৫২তম জন্মদিনে আপনার সবচেয়ে বড় ও পবিত্র কামনা কী? উত্তরে বঞ্চিত বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা স্বভাবসিদ্ধ কণ্ঠে বলেছিলেন- ‘জনগণের সার্বিক মুক্তি।’ এর পর সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জ্ঞাপনকালে তিনি ব্যথাভারাতুর কণ্ঠে, বেদনার্ত স্বরে বলেছিলেন, আমি জন্মদিন পালন করি না- আমার জন্মদিনে মোমের বাতি জ্বালি না, কেকও কাটি না। এ দেশে মানুষের নিরাপত্তা নাই। আপনারা আমাদের জনগণের অবস্থা জানেন। অন্যের খেয়ালে যে কোনো মুহূর্তে তাদের মৃত্যু হতে পারে। আমি জনগণেরই একজন। আমার জন্মদিনই কী, আর মৃত্যুদিনই কী? আমার জনগণের জন্য আমার জীবন ও মৃত্যু।
আজ ছিল প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় দিনের বৈঠক। সকাল ১০টায় শুরু হওয়া এক ঘণ্টার এ বৈঠকেও তৃতীয় কোনো ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন না। প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে বের হয়ে এসে বঙ্গবন্ধু বলেন, আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। এর চেয়ে বেশি কিছু বলার নাই।
সাংবাদিকরাও তাকে অনুসরণ করে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে হাজির হন। বঙ্গবন্ধু বলেন, যখন আমি আলোচনা করি অবশ্যই আমার দাবির কথা বলি। এই মুহূর্তে আমি এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে চাই না। প্রকাশ্যে সবকিছু বলার সময় এলে সংবাদ সম্মেলন করে সব কথাই বলব। আমার কাছে কোনো গোপন কারবার নাই। এরপর তিনি বলেন, আমি কি আন্দোলন প্রত্যাহার করেছি? আমাদের আন্দোলন চলছে। লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে আজকের দিনটিও শান্তিপূর্ণ সভা-শোভাযাত্রা, সরকারি, আধা-সরকারি অফিস-আদালত বর্জনের মাধ্যমে অতিবাহিত হয়। এ ছাড়া স্বাধিকার আন্দোলনে নিহত বীর শহীদদের উদ্দেশে শোক এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণের আশা-আকাক্সক্ষাকে তোয়াক্কা না করে একতরফাভাবে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতের প্রতিবাদে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের সর্বত্র কালো পতাকা উত্তোলিত থাকে। রাজধানীর সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছিল তালা। ছাত্র-শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী সবাই আজ বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে এক প্রাণ এক আত্মায় মিশে গিয়ে স্বাধিকারের দাবিতে মুখর হয়ে ওঠে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গণ, পাড়া-মহল্লার উন্মুক্ত স্থান, খেলার মাঠে চলছে কুচকাওয়াজ আর আসন্ন মুক্তির যুদ্ধে শামিল হওয়ার প্রশিক্ষণ। সে এক স্বতঃস্ফূর্ত জোয়ার! প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায় বঙ্গবন্ধুর নির্দেশক্রমে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে ‘সংগ্রাম পরিষদ’, প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন, নারী-পুরুষকে চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ প্রদান ইত্যাদি। ঢাকার রাজপথ আজ ছিল কুচকাওয়াজরত ছাত্র এবং স্বেচ্ছাসেবকদের পদভারে প্রকম্পিত। স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ নেতারা আগামী ২৩ মার্চ ‘প্রতিরোধ দিবস’ পালনের লক্ষ্যে বাংলাদেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-ছাত্র-ছাত্রী-কর্মচারী-কর্মকর্তা, কৃষক-শ্রমিকসহ প্রত্যেক নর-নারীর কাছে আহ্বান জানিয়েছেন। এদিন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীরা রাইফেল চালনায় প্রশিক্ষণ শুরু করে।
সন্ধ্যায় চট্টগ্রামে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী বলেন, পূর্ববাংলা এখন স্বাধীন, সাড়ে সাত কোটি বাঙালি এখন স্বাধীনতার প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ। তিনি বলেন, আমার ৮৯ বছরের অতীতের সবকটি আন্দোলনের সাথে আমি জড়িত ছিলাম। কিন্তু একটি সার্বজনীন দাবিতে জনগণের মধ্যে বর্তমান সময়ের মতো একতা ও সহযোগিতা আমি এর আগে কখনো দেখিনি।
১৯৭১ সালের ১৭ মার্চ নিউজউইকের একটি নিজস্ব পর্যালোচনাও প্রকাশ করা হয়। সেখানে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর বর্তমান সিদ্ধান্ত যে অকার্যকর ও ভুল, সেটি উল্লেখ করা হয়। সেখানে আন্তর্জাতিক বিখ্যাত কূটনীতিকদের বিভিন্ন মতামত সামনে রেখে প্রতিবেদক লোরেন জেনকিনসন লেখেন ‘পূর্ব এবং পশ্চিমাঞ্চল বিচ্ছিন্ন হবে এটা কোনো প্রশ্ন নয়। বরং পরিস্থিতি হঠাৎ এতদূর গড়িয়েছে যে, পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চল কি পরবর্তী সপ্তাহে কিংবা আগামী মাসে অথবা দুই বছর পর বিচ্ছিন্ন হবে এটাই প্রশ্ন।’ সেদিন ভারত প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেয়। ভারতের আকাশসীমায় বাংলাদেশগামী উড়োজাহাজ নিষিদ্ধ করে দেশটি।

  • [১]