জলধারায় প্রতিবন্ধকতা

মো. আমিনুল ইসলাম
পৌর এলাকার জামতলা, নতুন পাড়া, পশ্চিম নতুনপাড়া ও জামাইপাড়ার কিছু এলাকার প্রায় ১০ হাজার বাসিন্দার অন্যতম দুর্ভোগ জলাবদ্ধতা। আর এই সমস্যা মানবসৃষ্ট। তিন বৃহত্তর এলাকার জলধারা মাটি ফেলে ভরাট করায় এবং কালভার্টের মুখে নিয়মিত আবর্জনা ফেলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করায় খালটি তার পূর্বের প্রবাহমান অবস্থা বদলে রূপ নিয়েছে অনেকটাই বদ্ধ জলাশয়ে। শহরের মল্লিকপুর বিজিবি ক্যাম্প এলাকা থেকে সড়ক ও জনপথ বিভাগের আওতায় থাকা সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের পূর্ব পাশ ধরে বয়ে চলা খালটি সুনামগঞ্জ সার্কিট হাউজ, হাজীপাড়া এলাকার প্রবেশ পথ, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মুখ হয়ে, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের সামনে এসে ছোট আকারের একটি কালভার্টে পরিণত হয়েছে। যদিও গত ১০ বছরের আলোচনা পর্যালোচনায় এই খালটি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের সম্মুখ অংশ হয়ে সুনামগঞ্জ পিটিআই (প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট) হয়ে জামতলা, নতুনপাড়ার কিছু এলাকা ও জামাইপাড়ার একাংশ হয়ে বৃহত্তর নতুন পাড়ার পানি নিষ্কাশনে ভূমিকা রেখেছে।
বর্তমানে এই খালটির পশ্চিম নতুনপাড়া ও জামতলা অংশে মাটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় পৌরসভার মাধ্যমে বাংলাদেশ শিশু একাডেমী এলাকা থেকে পানি নিষ্কাশনের কাজে নির্মাণ করা জামতলার ড্রেনেজ লাইনও অকার্যকর হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি গত কয়েক মাস আগে জামতলা সংলগ্ন পিটিআই এর
সীমানা প্রাচীরের ভেতরের অংশের খালটিতে ড্রেজার দিয়ে মাটি ভরাট করায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার করুণ অবস্থা তৈরি হয়েছে। পিটিআই কর্তৃপক্ষ জলাবদ্ধতার ভোগান্তি থেকে রক্ষা পেতে পানি নিষ্কাশনের জন্য জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের সীমানা প্রাচীর ঘেঁষে সরু একটি ড্রেনেজ লাইন নির্মাণ করে দিলেও এই সরু লাইন দিয়ে বিশাল এলাকার পানি নিষ্কাশন হচ্ছে না। সামান্য বৃষ্টি দিলেই ৪ থেকে ৬ ঘন্টা অব্দি জলাবদ্ধতার ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে পশ্চিম নতুনপাড়া ও জামতলাবাসীকে।
এই খালটির নতুনকোর্ট পয়েন্ট অংশে সৌন্দর্য্যবর্ধনের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে লাল শাপলা ফুলের বেশকিছু গাছ লাগানো হয়েছে। খালের মধ্যবর্তী অংশ ধরে রাতে আলো জ্বালানোর জন্য স্থাপন করা হয়েছে নানা রঙের বাতি। এর একটু সামনেই মেসার্স মাজেদ এন্টারপ্রাইজ’এর স্বত্বাধিকারী বাড়ি’র সম্মুখ অংশে ছোট্ট একটি কালভার্ট করে একটি বড় সড়ক করেছেন।
এর বাইরেও এই খালের হাজীপাড়া এলাকার প্রবেশ পথের কালভার্ট অংশ এবং সার্কিট হাউজের দক্ষিণ অংশে মাছ চাষের জন্য গত কয়েক মাস ধরেই স্থাপন করা হয়েছে বাঁশের তৈরী মাছ আটকানোর এক ধরণের অস্থায়ী প্রাচীর (স্থানীয় ভাষায় যাকে পাইট্যা বলে)। এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ এগুলো পানির ¯্রােতকে বাধাগ্রস্ত করে থাকে। এ কারণে স্বাভাবিকের চেয়ে পানির গতিবেগ এখানে কমে যায়। যা নিষ্কাশন হতে অতিরিক্ত ৩ থেকে ৪ ঘন্টা সময় লাগছে।
এই সমস্যার বাইরেও অন্যতম জটিলতা সৃষ্টি করেছে এলাকার কিছু বাসা বাড়ির নাগরিকদের ফেলে দেয়া ময়লা আবর্জনা। যা হাজীপাড়া এলাকার প্রবেশ পথে খালটির উপরে থাকা কালভার্টের দক্ষিণ অংশে সৃষ্টি করেছে আবর্জনার স্তুপ। মাসের পর মাস ধরেই এই স্থানে এলাকার বাসিন্দারা পলিথিন ব্যাগসহ সব ধরনের ময়লা আবর্জনা ছুড়ে ফেলছেন। এতে কালভার্টের মুখ ভরাট হয়ে মাটির উপরে শক্ত আস্তরণ তৈরি করে খালটির পানির স্বাভাবিক প্রবাহ প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। বর্তমানে এই অংশ দিয়ে বিশালাকার খালের পানি প্রবাহিত হচ্ছে সংকীর্র্ণ নালার মতো। অবস্থা এতোটাই নাজুক যে প্রতি মিনিটে ১৫ থেকে ২৫ লিটার পানি এই কালভার্ট দিয়ে নিষ্কাশন হচ্ছে।
সব মিলিয়ে এই জলধারার স্বাভাবিক প্রবাহমান অবস্থা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। ভুক্তভোগীদের মতে দ্রুততম সময়ে এই প্রকট সমস্যার সমাধান করতে উদ্যোগ নিতে হবে প্রশাসন ও পৌর কর্তৃপক্ষকেই।
জামতলা এলাকার বাসিন্দা আলমদীর হোসেন বলেন ‘সামান্য বৃষ্টি দিলেই রাস্তা ডুবে যায়, ঘরের মধ্যে হাঁটু পানি হয়ে যায়, আগে নতুন কোর্টের পেছনে খাল ছিলো, এই খাল দিয়ে পানি নিষ্কাশন হতো, এখন সব ভরাট করার ফলে আমাদের করুণ অবস্থা।’
জামতলা এলাকার রাকিবুল ইসলাম দিলু, নূর মিয়া, আব্দুল আলী, বশির ও কাজী রিংকু দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরকে বলেন ‘পিটিআইর দেয়ালের ভেতরের খালটি নতুন কোর্টের পেছনের নতুনপাড়া অংশের খালের সঙ্গে যুক্ত ছিলো, এটি ধরে প্রাথমিক শিক্ষা অফিস হয়ে নতুন কোর্টের সামনা দিয়ে হাজীপাড়া ও সার্কিট হাউসের সম্মুখ দিয়ে পানি নিষ্কাশন হতো মল্লিকপুর এলাকা সংলগ্ন হাওরে, সম্প্রতি এই খালে বাঁধ নির্মাণ করে পানি আটকে রাখা হচ্ছে, এতে আমরা যারা জামতলা ও পশ্চিম নতুনপাড়াসহ জামাইপাড়ার কিছু এলাকার মানুষ, তারা ভয়াবহ জলাবদ্ধতায় আছি, এই খালের সার্কিট হাউস অংশে মাছ চাষের জন্য পাইট্যা লাগিয়ে পানির গতি কমিয়ে দেয়া হয়েছে, প্রশাসন ও পৌরসভাকে এসব সরাতে উদ্যোগ নিতে হবে।’
অভিযোগ অস্বীকার করে হাজীপাড়া এলাকার মৎস্য ব্যবসায়ী আজরফ মিয়া বলেন ‘আমি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান, ডিসি স্যারকে জানিয়েই আমি মাছ চাষ করছি, আমার কয়েক লাখ টাকার মাছ এই খালে চাষ হচ্ছে, পানি আমি আটকাচ্ছি না, বরং হাজীপাড়া ও নতুনপাড়া এলাকা থেকে ময়লা এনে এই খালের হাজীপাড়া কালভার্টের মুখে নিয়মিত ফেলার কারণে পানি নিষ্কাশন বন্ধ হয়ে গেছে, আমি পৌরসভার পরিচ্ছন্নকর্মীদেরকে টাকা দিয়েও এই আবর্জনা সরিয়ে নিতে পারছি না, পৌরসভায় আমি বার বার গিয়ে জানিয়েছি, কিন্তু তারা কোনো কাজ করছে না’।
জানতে চাইলে পৌর মেয়র নাদের বখ্ত বলেন, ময়লা এবং পাইট্টা কোনটাই জলধারায় থাকা বাঞ্ছনীয় নয়। যদি সকলে সহযোগিতা করেন, জামতলা থেকে হাসনতোরণ পর্যন্ত বড় আকারের ড্রেন কাম ফুটপাত করার প্রকল্প প্রস্তাবনা আমরা মাননীয় পরিকল্পনামন্ত্রী’র নিকট তুলে দিতে পারি। তাতে পানি নিষ্কাশনের চিন্তা দূর হবে। শহরের সৌন্দর্যও বেড়ে যাবে।
জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল আহাদ বলেন, কালেক্টরেটের সামনের খালে কিছু পানি আটকা আছে, এজন্য কোনো এলাকার মানুষের সমস্যা হলে বাঁধ কেটে পানি ছেড়ে দেওয়া হবে।