জলাশয় শুকিয়ে অবাধে মাছ নিধন

বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
সুনামগঞ্জের হাওর বিল খালে জলাশয় শুকিয়ে মাছ ধরার উৎসব চলে প্রতিবছরেই। এবার এই উৎসব আরও বেশি হচ্ছে। এতে করে একদিকে যেমন মাছের বংশ বিস্তার রোধ করা হচ্ছে, অন্যদিকে জলাশয়ের তলদেশ শুকিয়ে পরিবেশ বিপর্যয়ও ঘটানো হচ্ছে। এছাড়া কৃষি জমিতে সেচ সুবিধা ও গোসলসহ মানুষের নিত্যকর্ম সারতে যে সামান্যটুকু পানি প্রয়োজন, খাল-বিল ও নদীর তলদেশে তাও রাখা হচ্ছে না। প্রায় প্রতিদিনই কোন না কোন জলাশয় শুকিয়ে মাছ নিধনের খবর ছাপা হচ্ছে স্থানীয় পত্রিকাগুলোয়।
জলাশয় থেকে একেবারে ছেঁচেপুছে পানি নিষ্কাশন করে মৎস্য আহরণ করছে মাছ শিকারীরা। অভিযোগ হলে মাঝে মধ্যে স্থানীয় প্রশাসন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে কিছ কিছুু দণ্ড করছেন। তবে প্রত্যন্ত হাওরের বিল জলাশয়ের বেশিরভাগই কোন বাধা বিপত্তি ছাড়াই স্থানীয় প্রভাবশালীরা শুকিয়ে মাছ আহরণ করছে।
জামালগঞ্জের ফেনারবাঁক ইউনিয়নের দিরাই চাতল বিলে রোববার থেকে ভীমখালী ইউনিয়নের ভান্ডা গ্রামের মোস্তফা আলমের নেতৃত্বে বিলের চারপাশ শুকিয়ে মাছ ধরা হচ্ছে।
মেশিনচালিত লোহার মোটা পাইপ বসিয়ে বিলের তলদেশে থাকা পানি শুকানোর কাজ চলছে কয়েকদিন ধরে। বিল থেকে তুলে আনা ছোট মাছ স্তুপাকৃতির করে রাখা হচ্ছে। অন্যদিকে বড় মাছগুলো বিলের পারে গর্ত করে পানিতে ফেলা হচ্ছে। এ যেন মাছের বংশবিস্তার রোধসহ পরিবেশ দূষণের অবাধ তৎপরতা।
বিলের তলদেশ শুকিয়ে মাছ ধরা ঠিক হচ্ছে কি না জানতে চাইলে, মাছ শিকারী মোস্তফা আলম বললেন, তিনি যা করছেন তা অবৈধ। কিন্তু খরচের তুলনায় মাছ কম পাওয়ায় ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এমনটা করছেন তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একই ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রাম সংলগ্ন চাটনী বিল, বিনাজুরা ও উদয়পুর গ্রামের মধ্যবর্তী লড়কি বিল, খোঁজারগাঁও গ্রামের পার্শ্ববর্তী চন্দ্রঘোনা বিল, তেরানগরের দৌলতা নদী, হটামারা গ্রাম সংলগ্ন হকিয়াডুকি বিল, ভীমখালী ইউনিয়নের দেউতান বিল ও বেহেলী ইউনিয়নের বদরপুর সংলগ্ন ঘনিয়ার বিল, বেহেলী বাজারের পশ্চিমের কসমার বিলসহ এমন অনেক বিলের তলা শুকিয়ে মাছ ধরা প্রায় শেষ পর্যায়ে।
লক্ষ্মীপুর চাটনী পাড়া গ্রামের ঝিনুক মিয়া জানিয়েছেন, চাটনী বিলে গত এক সপ্তাহ ধরে মাছ ধরা অব্যাহত আছে। এই বিলের ইজারা যে মৎসজীবী সমিতি পেয়েছে তার সভাপতি লক্ষ্মীপুর নতুনপাড়া গ্রামের আজিবুর রহমান। সমিতির কাছ থেকে যারা লীজ নিয়েছে তারাসহ সমিতির মানুষ মিলেই পানি শুকিয়ে মাছ ধরার কাজ চালিয়ে নিচ্ছে।
মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি আজিবুর রহমান মাছ ধরার কথা অস্বীকার করেছেন।
এই উপজেলার বেহেলী ইউনিয়নের পুটিয়া গ্রামের পার্শ্ববর্তী বৌলাই নদীর শাখা পুটিয়া নদীতে সম্প্রতি গ্রামবাসীর বাঁধা উপেক্ষা করে অবৈধ মাছ শিকারীরা বিল শুকিয়ে এবং এক পর্যায়ে পানিতে বিষ ছেড়ে মাছ ধরেছে।
জামালগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সুনন্দা মোদক জানিয়েছেন, দিরাই চাতল বিলের খনন কাজ চলছে। তিনি যতটুকু জেনেছেন, এই বিলের পানি জমিতে নেওয়া হচ্ছে। আর চাটনী বিলের কথা শুনেছেন। সেখানে লোক পাঠানো প্রয়োজন, কিন্তু অফিসে স্টাফ না থাকার কারণে মোবাইল কোর্ট করাতে পারছেন না বলে জানালেন তিনি।
কেবল জামালগঞ্জের এই ছোট জলমহালগুলোতে নয়, জেলাজুড়েই এমন অপতৎপরতা আছে। প্রতিবছর এধরণের তৎপরতা চললেও এই বছর আর বেশি।
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) জসিম উদ্দিন বললেন, জামালগঞ্জে সম্প্রতি এধরণের একটি অন্যায় কাজের খবর পেয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে দোষীদের দ- দেওয়া হয়েছে। তিনি জানালেন, জলমহালের ইজারা শর্তেই বলা আছে, কোনভাবেই কেউ জলমহাল শুকাতে পারবে না। সকল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকেও নির্দেশনা দেওয়া আছে এমন তৎপরতার খবর পেলে তারা যেন ব্যবস্থা নেন। সুনির্দিষ্ট কোন অভিযোগ পেলে দ্রুত এই বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।