জাতির পিতার প্রতি অনন্ত শ্রদ্ধা

আজ ১৭ মার্চ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিনে আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তিনি তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের উচ্ছ্বসিত-অনুপ্রাণিত-সংকল্পবদ্ধ জনসমুদ্রে তেজোদীপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেন- ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ ১৭ মার্চ জন্মদিনের শুভেচ্ছার উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার জন্মদিনে মোমবাতি জ্বালি না, কেক কাটি না। … আমি জনগণেরই একজন। … আমার জনগণের জন্য আমার জীবন ও মৃত্যু।’ তিনি নিজের জন্মদিনে কোনো আনুষ্ঠানিকতা পছন্দ করতেন না। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের কাছে এ দিনটি শুভদিন। তার অনন্যসাধারণ অবদানেই বিশ্বের মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটেছে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের। তিনি স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন। জনগণ তার স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষার সঙ্গে একাত্ম হয়ে গিয়েছিল।
তারা ইস্পাত দৃঢ় ঐক্য গড়ে তুলেছিল। বিশ্ববাসী আমাদের এ মহান সংগ্রামের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছিল। আমরা বিজয়ী হয়েছি। আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে। এখন আমাদের সংগ্রাম মুক্তির। উন্নত-সমৃদ্ধ-গর্বিত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার। এ সংগ্রামেও আমরা জয়ী হবো- সন্দেহ নেই। কারণ তিনিই যে উজ্জ্বল ধ্রুবতারার মতো পথপ্রদর্শক হয়ে আছেন। স্বাধীনতা অর্জনের পর তার প্রিয় স্বদেশকে কেউ কেউ ‘বাস্কেট কেস’ হিসেবে অপবাদ দিয়েছিল। কেউবা বলেছিল, ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’। চিরকাল পিছিয়ে থাকা, অপরের দয়ায় বেঁচে থাকা- এমন ললাটলিখনের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল কেউ কেউ। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ মাথা নত করেনি। চার যুগের নিরলস সাধনা-দৃঢ় সংকল্পে দারিদ্র্য জয় করতে শিখেছে। স্বল্পোন্নত-পরনির্ভর দেশের অমর্যাদার অবস্থানের পরিবর্তন ঘটিয়ে স্থান করে নিচ্ছে মধ্যম আয়ের দেশের সারিতে। তার প্রিয় কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩০ লাখ নারী-পুরুষের আত্মদানে অর্জিত বাংলাদেশকে উন্নত বিশ্বের কাতারে নিয়ে যেতে আন্তরিক প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন। আমরা নিশ্চিতভাবেই এতে জয়ী হবো। এমন আস্থার ভিতও কিন্তু ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু রচনা করেছিলেন এভাবে- ‘কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না।’
আমাদের দুর্ভাগ্য, যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ রাষ্ট্র বিনির্মাণের দুরূহ কর্মকা-ে দেশবাসী যখন নিয়োজিত, সে সময়েই স্বাধীনতাবিরোধী দুষ্টচক্র জাতির পিতাকে হত্যা করে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয় মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী জাতীয় চার নেতাকে। এ অশুভ চক্র স্বাধীনতা ও মুক্তির পথ থেকে বাংলাদেশকে সরিয়ে নিতে একের পর এক ঘৃণ্য পদক্ষেপ নিতে থাকে। এমনকি বাংলাদেশের জনগণের মন থেকেও বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলার চেষ্টা কম হয়নি। টানা দুই দশকেরও বেশি সময়ের সামরিক দুঃশাসন ও স্বৈরশাসনের আমলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘নিষিদ্ধ-নির্বাসিত’ করার অপচেষ্টা চলে। তার হত্যাকা-ের বিচারের পথ রুদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু জনগণের মন থেকে বঙ্গবন্ধুকে মুছ ফেলা যায়নি। বাঙালির হৃদয়ে তার যে অনন্য স্থান, তা উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়েছে। তিনি আজ স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত। বিশ্ব আজ তাকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে বরণ করে নিয়েছে। তিনি জন্মস্থান টুঙ্গিপাড়ায় চিরনিদ্রায় শায়িত। কিন্তু বাঙালির কাছে, বাংলাদেশের মানুষের কাছে, বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের কাছে সেটাই পবিত্র স্থান হয়ে উঠেছে। ধানম-ির ৩২ নম্বর সড়কের যে ৬৭৭ নম্বরের বাসভবন থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন, সেটা এখন বঙ্গবন্ধু জাদুঘর, দেশ-বিদেশের মানুষের পরম কাক্সিক্ষত গন্তব্য; অবিনাশী প্রেরণার উৎস। তার ঘাতকরাও দ- থেকে রেহাই পায়নি।
বঙ্গবন্ধু আপামর জনগণকে ভালোবাসতেন। শিশুরা ছিল তার বিশেষ প্রিয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বেড়ে ওঠার জন্য যথোপযুক্ত ভবিষ্যৎ রচনায় তিনি ছিলেন সদা সচেষ্ট। তাদের জন্য জাতির পিতার সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা। এ দেশের অনাগত প্রজন্ম অনন্তকাল ধরে নিজেদের বিকাশে সব ধরনের সুযোগ পাবে- এ প্রত্যাশা পূরণের পথে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উদযাপন হয় জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে। জাতির পিতার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রদর্শনে এর চেয়ে উপযুক্ত অর্ঘ্য আর কিছুই তো হতে পারে না।