জাতির সূর্য সন্তান মুনীর চৌধুরী

এস ডি সুব্রত
মুনীর চৌধুরী মানিকগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈত্রিক নিবাস নোয়াখালি জেলায়। তাঁর একটি বিশেষ কীর্তি বাংলা টাইপ রাইটারের কি-বোর্ড উদ্ভাবন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের মাত্র দু’দিন আগে ১৪ ডিসেম্বর তিনি পাকবাহিনীর সহযোগীদের দ্বারা অপহৃত ও নিহত হন। মুনীর চৌধুরী জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৫ সালের ২৫ নভেম্বর। তিনি প্রথম বাংলা টাইপ রাইটার আবিস্কার করেন ১৯৬৫ সালে ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজিতে অনার্সে ভর্তি হলেন এক যুবক। আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইএসসি পাস করে আসা সেই যুবক বেশ ফিটফাট। হাতে সিগারেট, পায়ে দামী নাগরা, সাদা পাঞ্জাবিতে সোনার বোতাম লাগিয়ে ঘুরে বেড়ানো সেই যুবকের সৌখিনতার বাহার দেখে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকতেন অনেকেই। চল্লিশের দশকে স্টাইলিশ বলতে যা বোঝায় তার ষোলআনা একদম রপ্ত করে নিয়েছিলেন আবু নয়ীম মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী। শুধু স্টাইল কিংবা বাইরের চাকচিক্য দিয়েই নয়, এই যুবকের জ্ঞানের ধারও ছিলো বেশ প্রখর। শেক্সপিয়র, বার্নার্ড শ’ কিংবা ভিক্টর হুগো সবই পড়া হয়ে গেছে। সেই যুবকের জন্ম হয়েছিলো খানবাহাদুর আবদুল হালিম চৌধুরী আর উম্মে কবির আফিয়া বেগমের ঘরে।
ধীরে ধীরে যুক্ত হয়ে পড়লেন বামপন্থী আন্দোলনের সাথে। অনলবর্ষী বক্তা হিসেবে মুনীর চৌধুরীর খ্যাতি তখন পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ঢেউও তখন একটু একটু আছড়ে পড়ছিলো পূর্ব বাংলার বেলাভূমিতে। লেখালেখি করবেন বলে তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়েই পরিচয় হয় লিলি মির্জার সাথে। দুজনারই দুজনকে ভালো লেগে যায়। সেই ভালো লাগা কালক্রমে রূপ নেয় ভালবাসায়। ১৯৪৮ সালের শুরুর দিকে তিনি কলকাতায় গিয়েছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য। রাজনীতিও ছেড়ে দিলেন, ঢাকা থেকে দূরে গিয়ে পালিয়ে বাঁচতে চাইলেন রাজনীতির উত্তপ্ত ময়দান থেকে। অনেকটা সেই কারণেই খুলনার দৌলতপুরে ব্রজলাল কলেজে চাকরি নিলেন ইংরেজির প্রভাষক হিসেবে। তখন তার মাথায় ঘর-সংসার শুরুর চিন্তা বাসা বেঁধেছে। তাঁর ডায়েরিতে তিনি নিজের এই পরিবর্তন নিয়ে তিনি লিখেছেন, কিন্তু পরীক্ষার প্রশ্নপত্র আর খাতা সংগ্রহ করতে এসেছিলেন ঢাকায়, আর সেই সুযোগেই পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে বসলো। জেলের নিরানন্দ জীবনে তিনি আরো একটু একটু করে লেখালেখির অনুপ্রেরণা পেলেন। বাবা উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, তিনি সুপারিশ করলে হয়তো সহজেই ছাড়া পেয়ে যেতেন। কিন্তু তার বাবা তা করেননি। তাই জেলে বসে অলস সময়ে লেখালেখি, বই পড়া আর মুক্তির অপেক্ষায় দিন গুনছিলেন।
১৯৫০ সালে ঢাকায় এসে জগন্নাথ কলেজে শিক্ষকতা শুরু করলেন তিনি। সেই বছরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন তিনি। ছাত্রজীবন থেকে রাজপথে বক্তৃতা তো আর কম দেননি। আর এই বাগ্মীতার কারণেই হয়তো খুব অল্প সময়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনপ্রিয় শিক্ষকদের একজন হয়ে ওঠেন তিনি।
জেলের অন্ধকারে নিক্ষিপ্ত হয়ে আরো জেগে ওঠেন মুনীর চৌধুরী। জেলে তখনকার রাজবন্দীদের খাতায় আবদুল হামিদ খান ভাসানী, আবুল হাশিম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ, অধ্যাপক অজিত গুহ, রণেশ দাশগুপ্তের মতো বিখ্যাত ব্যক্তিদের পাশে যোগ হয় তরুণ শিক্ষক মুুুুনীর চৌধুরীর নাম। ‘কবর’ নাটক মুনীর চৌধুরীর অন্যতম সেরা সাহিত্যকর্ম। তবে নাটক যে অন্যায়ের প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে, এই মনোভাব সৃষ্টির পেছনে মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ নাটকের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বাংলাদেশের অভ্যুদয় এবং পরবর্তীকালের নানা রাজনৈতিক প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে রচিত শত-সহস্র নাটকের বাতিঘর হিসেবে কাজ করে গেছে ‘কবর’। তবে জেলে বসে ‘কবর’ ছাড়াও অনুবাদ করেছেন জর্জ বার্নার্ড শ’র ‘You never can tell’। অনূদিত গ্রন্থের বাংলা নাম দিয়েছিলেন ‘কেউ কিছু বলতে পারে না’। জন গলজ্ওয়র্দি’র ‘The Silver Box’ এর অনূদিত রুপের নাম দিয়েছিলেন ‘রূপার কৌটা’।জেলে থাকাকালীন আরেক বন্দী অধ্যাপক অজিত গুহের কাছ থেকে বাংলা ভাষা আর সাহিত্যের পাঠ চুকিয়ে নিলেন। ১৯৫৩ সালে জেলে বসেই বাংলায় এমএ পরীক্ষা দেন। লিখিত পরীক্ষায় পাশের পর ভাইভা দিতে পুলিশের পাহারায় এসেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। রেজাল্টটা ছিলো ‘প্রথম বিভাগে প্রথম’। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে ইংরেজির ফুলটাইম অধ্যাপকের পাশাপাশি বাংলা বিভাগের খণ্ডকালীন অধ্যাপকের দায়িত্ব পেলেন। ১৯৫৬ সালে রকফেলার বৃত্তি নিয়ে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষাতত্ত্ব পড়তে গেলেন। ১৯৬৯ সালে বাংলা বিভাগের প্রধানও নিযুক্ত হয়েছিলেন মুুীর চৌধুরী। বাংলা সাহিত্যে উজ্জ্বল অবদানের জন্য ১৯৬২ সালে বাংলা একাডেমি পুরষ্কার, ‘মীর মানস’ গ্রন্থের জন্য ১৯৬৫ সালে দাউদ পুরষ্কার, পাক-ভারত যুদ্ধ নিয়ে তার রচনা সংকলন ‘রণাঙ্গন’ এর জন্য ১৯৬৬ সালে তিনি লাভ করেন ‘সিতারা-ই-ইমতিয়াজ’। ১৯৭১ সালের ১৫ই মার্চ বাঙ্গালীদের প্রতি অবিচার আর অনাচারের প্রতিবাদে ডাক দেওয়া অসহযোগে সাড়া দিয়ে এই সম্মান বর্জন করেন তিনি। যে বাংলা ভাষার জন্য লড়াই করেছেন, জেল খেটেছেন, সেই বাংলা টাইপ করার জন্য উন্নতমানের কি-বোর্ডের প্রয়োজন তিনি অনুভব করছিলেন অনেকদিন ধরেই। শেষমেশ নিজেই খাটাখাটনি করে ‘মুনীর অপ্‌টিমা‘ নামের কি-বোর্ড দাঁড় করিয়ে দিলেন।
১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর বাসা থেকে তাকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানী সেনাবাহিনীদের দোসর আল-বদরের সদস্যরা। বাংলাদেশকে পঙ্গু করে দেওয়ার মহাযজ্ঞে একজন একজন করে সোনালি সন্তান হারিয়ে যেতে থাকে রায়েরবাজারের বধ্যভূমিতে। সেই সাথে হারিয়ে গিয়েছিলেন মুনীর চৌধুরী।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক, সুনামগঞ্জ