জামালগঞ্জের পল্লীতে মানবাধিকার লংঘন/ গ্রামছাড়া পরিবারগুলোর নিরাপত্তা দেয়া হোক

গ্রাম্য মাতব্বরদের কথা না শুনায় জামালগঞ্জ উপজেলার সাচনাবাজার ইউনিয়নের চানপুর গ্রামের ৯ পরিবার গত ১০ মাস ধরে নিজেদের ঘর-বাড়ি ছেড়ে অনেকটা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের গতকালের সংখ্যায় প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, নির্যাতিত পরিবারগুলো রবিবার দুপুরে জেলা সদরে মানববন্ধন করে তাদের কষ্টের কথা জানিয়েছেন, প্রতিকারের প্রার্থনা করেছেন। ভুক্তভোগীদের বক্তব্য থেকে জানা যায় গ্রামের জনৈক ভরত চন্দ্র মজুমদার ১০ একর জমি কিনেছিলেন। ওই জমি কিনতে কথিত মাতব্বরদের আপত্তি ছিলো। ভরত সে আপত্তি শোনেননি। পরে আপোস মিমাংসার জন্য ওই জমির কিয়দংশ গ্রামবাসীকে দান করেন ভরত। তাতেও শান্ত করা যায়নি মাতব্বরদের। মাতব্বররা এক জোট হয়ে ভরত চন্দ্র তালুকদার ও তার স্বজনদের উপর নির্যাতন শুরু করে। এই নির্যাতনে ভরত ও তার স্বজনসহ ৯ পরিবার গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হন। এলাকা ছাড়ার কারণে বাস্তুচ্যূতরা জীবিকার সংকটে পড়েছেন, অন্যদিকে গ্রামে থাকা তাদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদও বেহাত হওয়ার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তারা নিজের গ্রামে ফিরতে চান। গ্রামে ফিরে যাতে ওই মাতব্বরদের কোপানলে পুড়তে না হয় সেজন্য তারা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
খবরটি বিশ্লেষণ করলে যে কারও মনে হতে পারে ভরত ও তার স্বজনরা এই একবিংশ শতাব্দীর কোনো চরিত্র নন। মনে হতে পারে তারা বোধ করি আরও দুই বা তিন শতক আগের মানুষ। যে সময় গ্রামে সামন্ত প্রভু, জমিদার, রাজন্যবর্গের শাসন চালু ছিলো, সে সময়ের। ওই সময়ে ব্যক্তির কথাই ছিলো আইন, তারা উঠ্ বললে উঠতে হত, বস্ বললে বসতে হত। জমিদার বা ভূস্বামীরা কারও উপর রুষ্ট হলে তার আর বাঁচার উপায় ছিলো না। আমরা সেই যুগ পেরিয়ে এসেছি, কায়েম করেছি আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা। যেখানে ব্যক্তি তার স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতা নিয়ে নিরাপদে বসবাসের অধিকার পাবে। এমন আধুনিক ও গণতান্ত্রিক সমাজে একটি জনপদে কাউকে বৈধভাবে সম্পদ আহরণে বাধা দেয়া কিংবা শুধু আক্রোশের বশে ৯টি পরিবারকে গ্রাম ছাড়তে বাধ্য করার মতো চরম মানবাধিকার পরিপন্থী ঘটনা ঘটতে পারে তা একেবারেই অকল্পনীয়। অথচ জামালগঞ্জের চানপুর গ্রামে এরকমটাই ঘটল। গ্রামাঞ্চলে যে রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থার সমান্তরালে আরেকটি শাসন ব্যবস্থা চালু রয়েছে এই ঘটনা তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ।
প্রশাসনের উচিৎ এই বিষয়টির উপর নজর দেয়া। ৯ পরিবারের ভিটে ছাড়া করার অভিযোগ গুরুতর মানবাধিকার লংঘন ও অপরাধমূলক কর্মকা-। তাই উত্থাপিত অভিযোগের সার্বিক দিক খতিয়ে দেখা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের আবশ্যকীয় দায়িত্ব। যদি অভিযুক্তদের অপরাধ প্রমাণ হয় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং নির্যাতিত পরিবারগুলোকে সম্মানের সাথে তাদের ভিটেবাড়িতে পুনর্বাসিত করার ব্যবস্থা নিতে হবে। নতুবা এই ধরনের অনাচারের মাত্রা বেড়ে যাবে। যে যেরূপ ইচ্ছা যে কাউকে বাড়ি থেকে বিতাড়ন করবে, তাকে অন্যায় নির্দেশ পালনে বাধ্য করবে; তা মেনে নেয়ার নয়। প্রায় এক বছর ধরে ৯টি পরিবার গ্রাম ছাড়া থাকার পরও এতদিন ধরে কেন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলো না তা কিছুতেই আমাদের বোধগম্য হচ্ছে না। ওখানকার জনপ্রতিনিধিরা কী করছিলেন? অবস্থাদৃষ্টে পরিষ্কার যে, ভরত ও সঙ্গীয়রা গ্রামের মাতব্বরদের চাইতে দুর্বল। দুর্বল না হলে তাদের গ্রামছাড়া হতে হতো না। এই দুর্বল পরিবারগুলোর কাছে আশ্বাসের বার্তা নিযে তো সবার আগে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের পৌঁছে যাওয়ার কথা ছিলো।
জামালগঞ্জের চানপুর গ্রামের নির্যাতিত পরিবারগুলোর মানবাধিকার লংঘনের উপযুক্ত বিচার এবং নির্যাতিত পরিবারগুলোর নিরাপদে ওই গ্রামে বসবাসের নিশ্চয়তা দাবি করি আমরা।