জামালগঞ্জ আ.লীগে নতুন মেরুকরণ

বিশেষ প্রতিনিধি
জেলার জামালগঞ্জে আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্ব মেটাতে শনিবার স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেছেন। এসময় ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, জামালগঞ্জ আওয়ামী লীগে আর কোন দ্বন্দ্ব থাকবে না। ঐক্যবদ্ধভাবে দলীয় সকল কর্মসূচী এবং দলকে সংগঠিত করার কাজ করবেন সকলে। এই ঘোষণার একদিন পরই উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ইকবাল আল আজাদ এবং উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান গোলাম জিলানী আফিন্দি রাজু বলেছেন, দলে থেকে যারা দলীয় সভানেত্রীর নির্দেশ মানে না। দলের প্রতীক নৌকায় ভোট দেয় না, তাদের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করা যাবে না’। তাঁদের এই বক্তব্যে এই উপজেলা আওয়ামী লীগে কোন্দলের নতুন মেরুকরণ হচ্ছে।
জামালগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগে দীর্ঘ দিন ধরেই বিভক্তি আছে। এই উপজেলায় জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি রেজাউল করিম শামীমের বাড়ি হওয়ায় একাংশের নেতা সবসময় তিনিই। অন্য অংশের নেতা ছিলেন প্রয়াত উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ইউসুফ আল আজাদ। এই দুই অংশের নেতা কর্মীরা কখনো স্থানীয় সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন এর আনুকূল্য পেয়েছে। কখনো সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামীমা শাহরিয়ারের সহানুভুতি পেয়েছে।
গেল সংসদ নির্বাচনেও ওখানকার একাংশের নেতারা অপরাংশের বিরুদ্ধে দলীয় প্রার্থীর বিরোধীতার অভিযোগ তুলেছিল। এছাড়া বিগত (২০১৯ সালের নির্বাচন) উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও দুই বলয়ের দুই প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। দলীয় প্রার্থীর বিরোধীতা করে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি রেজাউল করিম শামীম। দলীয় প্রার্থী ইউসুল আল আজাদ বিজয়ী হয়েছিলেন। এক বছরের মাথায় ২০২০’এর ৯ ফেব্রুয়ারি ইউসুফ আল আজাদ মারা যান। উপ-নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হন প্রয়াত ইউসুফ আল আজাদের ছেলে ইকবাল আল আজাদ। ওই নির্বাচনেও দলের দ্বিধাবিভক্ত নেতা কর্মীরা এক হতে পারেন নি। একাংশের বিরুদ্ধে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করার অভিযোগ ওঠেছিল।
দলীয় কার্যক্রম এবং নির্বাচনে আলাদা আলাদা অবস্থান নেওয়ায় দলের বিরোধ তীব্র হয়ে ওঠে উপজেলাজুড়ে। এই অবস্থায় গেল শনিবার কোন্দলে বিবদমান দুই গ্রুপের দুই নেতা জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি রেজাউল করিম শামীম ও স্থানীয় সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন ঐক্যের ডাক দিয়ে জামালগঞ্জে আনুষ্ঠানিকভাবে সভা করেন। দুইজনেই দলের নেতা কর্মীদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। সভায় উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ বিপুল সংখ্যক নেতা কর্মী উপস্থিত ছিলেন। তবে এই সভায় উপস্থিত হন নি জামালগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান উপজেলা যুবলীগের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ইকবাল আল আজাদ, উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান উপজেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক গোলাম জিলানী আফিন্দি রাজু, উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক আব্দুল মতিন চৌধুরী, ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক মাওলানা আব্দুল আউয়াল, শ্রম বিষয়ক সম্পাদক মোশারফ মিয়া, নির্বাহী সদস্য সদস্য ফেনারবাঁক ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি নুরুল হুদা চৌধুরী খোকন, সাংস্কৃতিক সম্পাদক জামিল আহমদ জুয়েল, সহ প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক কবির মিয়া, নির্বাহী সদস্য বদিউজ্জামান ও মহিলা বিষয়ক সম্পাদক হাফিজা আক্তার দীপু।
উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ইকবাল আল আজাদ বললেন, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি রেজাউল করিম শামীম বয়োজ্যেষ্ট রাজনীতিবিদ। কিন্তু তাঁর দাম্ভিকতা এতো বেশি, নিজের ভুলকে তিনি কখনোই ভুল হিসাবে গ্রহণ করেন না। গেল জাতীয় নির্বাচনে তিনি দলের প্রার্থীর বিরোধীতা করেছেন। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীকে চ্যালেঞ্জ করে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে বিপুল ভোটে পরাজিত হয়েছেন। উপজেলা পরিষদ উপ-নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী আমাকে করায় তিনি বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। ইউপি নির্বাচনেও তিনি দলীয় প্রার্থীর বিরোধীতা করার অভিযোগ আছে। তিনি নিজেকে দলের মালিক মনে করেন। নিবেদিতপ্রাণ নেতা কর্মীদের মূল্যায়ন করেন না তিনি। ছাত্রলীগ, যুবলীগের সঙ্গে যারা দীর্ঘদিন যুক্ত, তাদেরকে মূল্যায়ন করেন না, তার মতো তিনি দল চালান। গেল উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তাঁর (রেজাউল করিম শামীম) প্রচার সভায় বলা হয়েছে, ‘আওয়ামী লীগ ভোট চোর’। এভাবে তিনি দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন, আবার দলের নেতা সেজে এক নায়কতন্ত্র কায়েম করতে চান। আমরা মনে করছি হঠাৎ করে তিনি যে ঐক্যের ডাক দিচ্ছেন তাতেও কোন স্বার্থ আছে, শুনেছি তাঁর ভাইকে সাচনা বাজার ইউপি নির্বাচনে প্রার্থী করাবেন, এজন্য এই ঐক্যের ডাক মনে করছি আমি। আমি ওখানে যাই নি।
উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান উপজেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক গোলাম জিলানী আফিন্দি রাজু বললেন, রেজাউল করিম শামীম সাহেব গেল কয়েক বছরে একাধিকবার দলীয় সভানেত্রীর মনোনীত প্রার্থী এবং দলের প্রতীকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। আমাদের নির্বাচনী এলাকায় দুইজন সংসদ সদস্য রয়েছেন। একজন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য। সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিজের কার্যক্রমে এলাকাজুড়ে প্রশংসিত। তাঁকে মোকাবেলা করতেই এই ঐক্যের ডাক। আমরা যারা দলকে ভালবাসী তারা ওখানে যাই নি। আমরা দলীয় কর্মসূচি আলাদাভাবেই পালন করবো।
জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি রেজাউল করিম শামীম এ প্রসঙ্গে বললেন, আওয়ামী লীগের, যুবলীগের, ছাত্রলীগের সকল দায়িত্বশীল নেতা কর্মী শনিবারের ঐক্য সভায় ছিলেন। ইকবাল আল আজাদ দলে এমন গুরুত্বপূর্ণ কেউ নয়। আমরা দলীয় সভানেত্রীর নির্দেশনা অনুসারেই বিভক্ত দলকে আন্তরিকভাবে ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছি। সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতনও আন্তরিক এই বিষয়ে। আমি জাতীয় নির্বাচনে কখনোই দলের প্রার্থীর বিরোধীতা করি নি। এমন প্রমাণ কেউ দেখাতে পারবে না। আমি জাতীয় নির্বাচনে দলের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছি। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় দল থেকে শোকজ করা হয়েছিল, শোকজের জবাব দেওয়ায় আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রত্যাহার করা হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে আমি নয়, ২০০৮ সালে কারা দলের প্রার্থীর বিরোধীতা করেছিল সকলেই জানেন। দলের ঐক্য কেউ পছন্দ না করলে একা হওয়া ছাড়া উপায় নেই।
জামালগঞ্জের বাসিন্দা কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় নেত্রী সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামীমা শাহরিয়ার কেন ঐক্যর সভায় থাকলেন না জানতে চাইলে বললেন, আমি সব সময় দল এবং দলীয় নেত্রীর নির্দেশ মেনে চলি। সব সময় ঐক্যর মধ্যেই আছি, নেতা কর্মীদের সঙ্গেই আছি।
সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন বললেন, দলের ঐক্যের পক্ষে সকলেই আছেন। উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ইকবাল আল আজাদ জরুরি কাজ থাকায় আসেন নি, দলকে ঐক্যবদ্ধ করার পক্ষে সেও আছে।