জুবিলীর জুম অনলাইন ক্লাস : চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন
ঐতিহ্যবাহী সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় সুনামগঞ্জ, জেলার শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাইলফলক। মহামারীর কারণে যখন সারাদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ বন্ধ, শিক্ষাকে সচল রাখার জন্য বিদ্যালয়টি তাদের অনলাইন কার্যক্রম হাতে নেয়। দীর্ঘদিন পর্যন্ত এই কার্যক্রম বিদ্যালয়ের ফেইসবুক পেইজ, ইউটিউব এবং কেবল টিভিতে সীমাবদ্ধ ছিল। যার ফলে প্রকৃত ইন্টারেকশন হতো না। কত সংখ্যক শিক্ষার্থী উপকৃত হচ্ছে তার প্রকৃত হিসাব ছিল না। গতকাল পহেলা অক্টোবর থেকে জুম অ্যাপস এর মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট শিক্ষার্থীদের জড়িত করে ক্লাস নেয়া শুরু হয়। আমার সৌভাগ্য, প্রথম দিনের উদ্বোধনে ক্লাসটি নেবার দায়িত্ব আমাকে দেয়া হয়েছিল। দীর্ঘ ছয় মাস পর, সরাসরি না হলেও কম্পিউটারের স্ক্রিনে আমার শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের দেখে আমি আমার আবেগ সংবরণ করতে পারিনি। আনন্দ অশ্রুতে চোখ ঝাপ্সা হয়ে এসেছিল। বিষয়টি লুকাতে পারিনি আমার প্রিয় শিক্ষার্থীদের থেকেও। যাই হোক সাথে সাথে নিজেকে সামলে নিয়ে কুশল বিনিময় করি। সে কী উচ্ছ্বাস! আমাদের প্রত্যাশার বাইরে, প্রথম ক্লাসেই হাউসফুল ছিল। ১০০ শিক্ষার্থী যোগ দিয়েছিল ক্লাসে। প্রধান শিক্ষক মহোদয় ও ছিলেন। আমাদের জুম এপে এখন ১০০ জনকেই জড়িত করার ক্যাপাসিটি আছে। কিছু শিক্ষার্থী এন্ট্রি না পেয়ে ওয়েটিং এ ছিল। খারাপ লেগেছে তাদের জন্য। জুম ক্যপাসিটি বাড়ানো বা নতুন কোনো পরিকল্পনা নিয়ে ভাবতে হবে আমাদের। সামান্য কিছু টেকনিকেল সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। একেবারেই নতুন অবস্থায় এরকম কারিগরী সমস্যা হওয়া খুবই স্বাভাবিক। তবু আশাবাদী আমাদের শিক্ষার্থীদের স্বতস্ফূর্ততা দেখে। আমাদের গতানুগতিক শিক্ষাব্যবস্থায় ক্লাসরুমে সব সময় আমরা শতভাগ শিক্ষার্থী উপস্থিত পাইনা। আর্থ-সামাজিক বা মানসিক বিভিন্ন পরিস্থিতির কারণে অনেকেই শ্রেণি থেকে নিজেদের বাইরে রেখে দেয় অনেক সময়। স্কুল পালায় কেউ কেউ। যেহেতু অনলাইন ব্যবস্থা একটি নতুন বিষয় আর শিশুরা সব সময় নতুন বিষয় আগ্রহী হয়। এজন্য এই প্লাটফর্মে শিশুদের আগ্রহ দেখা যায় বেশি।
কিন্তু এটা সত্য যে আমাদের অনেক অভিভাবকের এই সামর্থ্য নেই যে তাদের শিশুদেরকে ডিভাইসটি দেবে। ইন্টারনেট স্পীড ও ডাটার উচ্চ মূল্যও এ ক্ষেত্রে অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। আবার অনেক শিশুর অনলাইন গেইম, ইউটিউব ইত্যাদি আসক্তির কারণে অনেক অভিভাবক আমাদের অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম এর প্রভাব নিয়ে শংঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু প্রথম দিনের উপস্তিতি আমার কাছে খুবই ইতিবাচক মনে হয়েছে। তবুও আমাদের শিশুদের স্বার্থেই আমাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে।
জুম অনলাইন ক্লাসে যারা যোগ দেবে আশা করি তারা কিছু শিখবে। ডিভাইস দিয়ে বাচ্চাদের একা ছেড়ে না দিয়ে সামনে থাকা উচিৎ। এই জুম আয়োজনের ফলে শিশুদের একগুঁয়েমী কিছুটা কাটবে আশা করি। দীর্ঘদিন পরে তাদের বন্ধুদের দেখতে পাবে। কুশল বিনিময় করতে পারবে। সবাই হয়তো যুক্ত হতে পারবে না। সবাইকে স্বাভাবিক সময়েও আমরা ক্লাসে পাইনা। যারা চাইবে তারাই কেবল উপকৃত হবে। আমরা ডাক দিয়ে যাব।যারা সাড়া দেবার দিবে। এর বেশি আর কী করতে পারি।বলেছিলাম, যে কোনো সুপরামর্শ সাদরে গ্রহণ করব। এই পরিস্থিতিতে সুধীজনের সু-পরামর্শের একান্ত প্রয়োজন। প্রতিটি শিশু অনন্ত সম্ভাবনার এক একটা আঁকর। এই সম্ভাবনার বিকাশ ঘটে শিক্ষার মাধ্যমে। এ জন্যই একটি শিশুও যদি আমার দ্বারা কিঞ্চিৎ উপকৃত হয়। তব্ওু আমার শ্রম স্বার্থক হবে। অন্তত যারা পারে তারা উপকৃত হোক। দীর্ঘদিন শশুরা শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বাইরে আছে। তাদেরকে শিক্ষায় আমরা ফিরিয়ে আনি। অবশ্য এই ডিজিটাল কার্যক্রম পরিচালনায় অনেক ঝুঁকি আছে। তাদের হাতে নেট সহ ডিভাইস দিলে উপকার পাওয়ার যেমন সম্ভাবনা আছে, আবার তার অপব্যবহারের কারণে ক্ষতি হতে পারে মারাত্মক ভাবে। এজন্য আমি মনে করি এবং অনুরোধ রাখি শিশুরা যখন কম্পিউটার বা মোবাইল ব্যবহার করে তখন অভিভাবকগণ যেন তাদের সামনে থাকেন। এটা খুবই জরুরি। কেননা অনলাইনের ইন্টারনেটের অবাধ দুনিয়াতে তাদের ছেড়ে দিলে, ডিজিটাল গেইম সহ অনেক ক্ষতিকর বিষয়ে আসক্ত হয়ে যাবার সম্ভাবনা থেকে যায়। ডিজিটাল কোকন বলা হয় যাকে। পরিশেষে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের বিদগ্ধ প্রধান শিক্ষকের প্রতি। যিনি অত্যন্ত যুগোপযোগী এই জুম অ্যাপস এর মাধ্যমে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের ব্যস্ত রাখার প্রচেষ্টা শুরু করেছেন। এই প্রচেষ্টা সফল হোক। আমাদের শিশুরা ফিরে পাক তাদের বন্ধুদের। আমাদের সুনামগঞ্জ এর শিক্ষা ব্যবস্থায় আসুক যুগান্তকারী ইতিবাচক পরিবর্তন। এই প্রত্যাশা।
লেখক : মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন District Ambassador ict4e ও সহকারী শিক্ষক (ইংরেজি) সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়, সুনামগঞ্জ।