জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতার আগমন বার্তা

স্টাফ রিপোর্টার
‘আশ্বিনের শারদপ্রাতে/বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জির/ধরণীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা/প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতার আগমন বার্তা/মা আনন্দময়ী মহামায়ার পদধ্বনি অসীমও ছন্দে বেজে উঠে রূপ লোক ও রসলোকে আনে নব ভাব মাধুরীর সঞ্জিবন’
(মাতৃবন্দনা-বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র)
শারদীয় দুর্গোৎসবের পূণ্যলগ্ন মহালয়া। কল্যাণময়ী জগতজননী দুর্গা দেবীকে মর্ত্যে আসার আমন্ত্রণ জানানোর দিন। শুরু হলো বারো মাসে তেরো পার্বণের অন্যতম দুর্গা পূজার ক্ষণগণনা। আনন্দময়ীর আগমনে, ঢাকের বাদ্যে, শঙ্খ ও উলু ধ্বনি, চন্দনের সৌরভে, ধূপের ধোঁয়া, আরতির অনুষঙ্গে জগন্ময়ীর সামনে নব পরিধানে-সাজে উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে সবাই। যান্ত্রিক জীবনের বাইরে গিয়ে স্মৃতির পাতায় সঞ্চিত হবে কিছু আনন্দঘন মুহূর্তের। বড় আনন্দের কয়েকটা দিন। প্রতি বছরের চেনা ছবিটারই আবার ফিরে আসা। আনন্দময়ীর আগমন আমাদের দিনগত পাপক্ষয়লব্ধ জীবনের সমস্ত হতাশা বিপন্নতা শোক ব্যাকুলতাকে ঢেকে দিতেই। আকাশ-বাতাসে এখন কেবলই আগমনীর সুর। মিলন উৎসবে মেতে উঠার দিন যে দোরগোরায় তা মনে করিয়ে দেওয়ার দিন আজ। এ বার দেবী দুর্গা ঘোটকে চড়ে আসছেন এবং গমন হবে দোলায়। আগামী ১১ অক্টোবর সোমবার মহাষষ্ঠী তিথিতে হবে বোধন, দেবীর ঘুম ভাঙানোর বন্দনা পূজা। ১৫ অক্টোবর শুক্রবার দশমীতে বিসর্জনে শেষ হবে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা।
মানবকল্যাণ প্রতিষ্ঠায় মহাশক্তির প্রতীক দেবী দুর্গা। মায়ের মতোই আবির্ভাব ও ভূমিকা তার। এ জন্যই তিনি সকলের মা দুর্গা। প্রতিবছর শরৎকালে দুর্গা দেবী মর্ত্যে আসেন ভক্তদের কল্যাণ সাধন করে শত্রুর বিনাশ ও সৃষ্টিকে পালন করার উদ্দেশ্যে। সঙ্গে নিয়ে আসেন তার সন্তান গণেশ, কার্ত্তিক, লক্ষ্মী আর সরস্বতীকে। এবারও তার আগমনী বার্তা পৌঁছে গেছে বাঙালির ঘরে ঘরে। আজ মহালয়া উদযাপনের মাধ্যমে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। মন্ডপে মন্ডপে উচ্চারিত হবে মা দুর্গার আগমনী ধ্বনি।
শাস্ত্রীয় বিধান মতে, মহালয়ার অর্থ হচ্ছে মহান আলোয় দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গাকে আবাহন। কন্যা-জায়া-মাতৃরূপে শরৎকালেই দেবী দশভূজা পূজিত হন ঘরে ঘরে। কখনও তিনি উমা, পার্বতী, মহামায়া, কৈলাশি, দুর্গতিনাশিনী, পরমা প্রকৃতি, নারায়ণী, মাহেশ্বরী, গিরিজা, গৌরী, দাক্ষায়ণী আবার কখনও বা মহিষাসুরমর্দিনী দশপ্রহরণধারিণী দেবী দুর্গা। রামপ্রসাদ তো দেবী দুর্গাকে কন্যা বলে অবিহিত করেছেন। কৈলাস থেকে পিত্রালয়ে উমার এই আগমন যেন বিবাহিতা কন্যার বৎসরান্তে পিতৃগৃহে আগমনের রূপকমাত্র। শ্রীশ্রীচন্ডিতে বলা হয়েছে, জগৎপ্রপঞ্চের অন্তরালে এক মহাশক্তি আছেন। তিনিই মহামায়া। এই মহামায়াই জগৎ সৃষ্টি করেন, পালন করেন আবার প্রলয়কালে সংহারও করেন। অসুরদের দ্বারা নির্যাতিত দেবতারা মহামায়ার সহায়তায় অসুরদের পরাজিত করে স্বর্গরাজ্য পুনরায় অধিকার করে নেন।
কবির ভাষায় শারদীয় দুর্গা পূজা মানেই শরতের শিশিরভেজা প্রকৃতি, শরতের নবীন ভোরের আলো, কাশফুলের দুলুনি, কখনও কয়েক ছিটে ইলেশগুঁড়ি বৃষ্টি, গালিচার মতো বিছানো শিশির-ভেজা কমলা-সাদা শিউলি ফুলের মধুরতা। যদিও শহুরে জীবনে এসব দেখা যায় না বললেই চলে। এখন পূজার ছোঁয়া পাওয়া যায় বিপনী বিতান, জুতোর দোকান, প্রসাধনীর দোকানে এমনকি ফুটপাতের দোকানগুলোতেও নানা বয়সী মানুষের উপচে পড়া ভিড়ে, বাসাবাড়িকে মনের মতো সাজিয়ে তোলার প্রয়াসে, বন্ধুদের সঙ্গে মন্ডপে মন্ডপে ঘুরে কোন পাড়ার প্রতিমা গড়ার কাজ কতটুকু, কোনটি বেশি জাঁকজমক হবে, বেশি সুন্দর হবে, পূজার কয়েকদিন কোথায় কি কি আনন্দ অনুষ্ঠানের আয়োজিত হবে, পূজার কয়েকদিন ঘুরে বেড়ানোর প্রোগ্রাম সাজানো এসব নিয়ে আড্ডা-বিতর্ক-চুলচেরা বিশ্লেষণের মধ্যে।
চন্ডীর নারায়ণী স্তুতিতে বলা হয়েছে, মহামায়া বিশ্বব্যাপিনী হইলেও নারীমূর্তিতে তাঁহার সমধিক প্রকাশ। দেবীর অংশে নারীমাত্রেরই জন্ম। নারীমূতি জগদম্বারই জীবন্ত বিগ্রহ। প্রত্যেক নারীতে মাতৃবুদ্ধি করা এবং প্রত্যেক নারীকে দেবীমূর্তিজ্ঞানে শ্রদ্ধা করাই মহামায়ার শ্রেষ্ঠ উপাসনা।
আশ্বিনের কৃষ্ণপক্ষের তিথীকে বলা হয় মহালয়া। এই কৃষ্ণপক্ষকে বলা হয় পিতৃপক্ষ। পিতৃপক্ষে স্বর্গত পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পন করা হয়। পিতৃপুরুদের তৃপ্ত করার জন্য তিল, জল, দান করা হয়। জলদানের মাধ্যমে পিতৃলোকের তৃপ্তিসাধনই হলো ‘তর্পণ’। ‘তর্পণ’ মানে খুশি করা। যাদের পিতা-মাতা প্রয়াত তাদের পিতা-মাতার জন্য, সাথে সমগ্র জীব-জগতের জন্য ‘তর্পণ’/কার্যাদি-অঞ্জলি প্রদান করতে হয়। আশ্বিন মাসের এই কৃষ্ণপক্ষের অবসান ও দেবীপক্ষের সূচনায় যে অমাবস্যাকে আমরা ‘মহালয়া’ হিসেবে চিহ্নিত করি, সেই দিনটি হচ্ছে পিতৃপূজা ও মাতৃপূজার সন্ধিলগ্ন। পিতৃপূজা ও মাতৃপূজার মাধ্যমে এই দিনটিতে আমরা আমাদের এই মানব জীবনকে মহান করে তুলতে প্রয়াসী হই। মার্ক-েয় পুরাণে বলা হয়েছে, পিতৃগণ তর্পণে/শ্রাদ্ধে তুষ্ট হলে স্বাস্থ্য, ধন, জ্ঞান ও দীর্ঘায়ু এবং পরিশেষে উত্তরপুরুষকে স্বর্গ ও মোক্ষ প্রদান করেন। মহালয়া হচ্ছে পিতৃপক্ষের শেষ দিন এবং দেবী পক্ষের আগের দিন। এক কথায় শারদীয় দুর্গা পূজার সকল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়ে গেছে আজ ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে। আলোর বেণু বাজিয়ে প্রকৃতি আবাহন করছে মায়ের। মা আসছেন। দুর্গতিনাশিনী দেবী মা দুর্গার কাছে প্রার্থনা- ‘হে মা তোমার অসুরদলনী তেজ ও বিভিন্ন আয়ুধের দ্বারা যেন জগৎসংসারের দুর্গতি, বিভেদ, বিবাদ, অনৈক্য, ব্যক্তিগত ক্ষুদ্রস্বার্থ, সংকীর্ণতা দূর হয় চিরতরে। আমাদের অন্তরে যেন আত্মশক্তির জাগরণ ঘটে।