টাঙ্গুয়ার পাড়ে স্যানিটেশন সুবিধার অপ্রতুলতা

সাইদুর রহমান আসাদ
আমার স্বাস্থ্যসম্মত বাথরুম নেই। আমাদের গ্রামের বেশিরভাগ মানুষের একই অবস্থা। যুগ যুগ ধরে ঝুলন্ত বাথরুমের উপরই ভরসা করতে হচ্ছে আমাদের। একটা স্বাস্থ্যসম্মত বাথরুম করতে হলে কমপক্ষে ২০ হাজার টাকা প্রয়োজন। যেখানে খেয়ে বেঁচে থাকাই কষ্টকর, সেখানে এতো টাকা খরচ করে বাথরুম দেওয়া বিলাসিতা আমাদের কাছে।
কথাগুলো বলছিলেন, তাহিরপুরের টাঙ্গুয়ারপাড়ের দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের পাটাবুকা গ্রামের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম। এই উপজেলার টাঙ্গুয়ার পাড়ের মানুষদের এখনও অস্বাস্থ্যকর বাথরুম ব্যবহার করতে হচ্ছে। এর কারণ হিসেবে স্থানীয়রা স্বাস্থ্যসম্মত বাথরুম নির্মাণে অধিক খরচ, জায়গা স্বল্পতা ও হাওরের আফালে ভেঙে যাওয়াকেই প্রতিবন্ধকতা মনে করেন।
নজরুল ইসলাম বলেন, আমি টাকা খরচ করে স্বাস্থ্যসম্মত বাথরুম নিমার্ণ করেছিলাম। বর্ষায় হাওরের আফালে (ঢেউ) ভেঙে গেছে। পরে আর বানাই নি। এখন বাঁশ ও বস্তা দিয়ে বাথরুম বানিয়ে ব্যবহার করছি।
উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের নয় নম্বর ওয়ার্ডের ইসলামপুর গ্রাম। টাঙ্গুয়ার হাওরের পাড়ে এই গ্রামটি নতুন হয়েছে। প্রায় ১০ বছর আগে হওয়া এই গ্রামে এখন ২৩ টি পরিবার বাস করছে। এই পরিবারগুলোর মধ্যে মাত্র দুটি পরিবারের স্বাস্থ্যসম্মত বাথরুম রয়েছে। বাকী একুশ পরিবার ঝুলন্ত বাথরুম ব্যবহার করছেন। এতে সারা বছরেই রোগ—বালাই লেগে থাকে গ্রামটিতে।
ইসলামপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. রাসেল মিয়া বললেন, আমাদের গ্রামের কারও স্বাস্থ্যসম্মত বাথরুম নেই। একটি বাথরুম করতে ২০ হাজার টাকা খরচ হয়। এতো টাকা খরচ করে বাথরুম বানানোর সার্মথ্য নেই আমাদের। তিন বছর আগে এনজিও সংস্থা থেকে দুটি পারিবারকে স্বাস্থ্যসম্মত বাথরুমের উপকরণ দেওয়া হয়েছিলো। পরের বছর বর্ষায় সেগুলো ভেঙে যায়। বাঁশ এবং ছটের বস্তা দিয়ে বাথরু তৈরি করেই ব্যবহার করছি আমরা। এগুলো বর্ষায় ভেঙে যাওয়ার ভয় থাকে না।
তিনি আরও বলেন, সারাবছর গ্রামের মানুষের অসুখ লেগেই থাকে। স্থানীয় ফার্মেসী থেকে ওষুধ খেলে ভালো হয়ে যায়। এভাবেই চলে যাচ্ছে দিন।
এদিকে সরকারের পাশাপাশি মার্কিন সরকারের পরিচালিত বেসামরিক বৈদেশিক সাহায্যকারী সংস্থা ‘ইউএসএআইডি’র অর্থায়নে গত কয়েক বছর ধরে হাওরাঞ্চলের স্বাস্থ্য সেবা নিয়ে কাজ করছেন বেশ কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য রয়েছে কেয়ার বাংলাদেশ, ঢাকা আহ্সানিয়া মিশন ও সৌহার্দ্য। তাদের মাধ্যমে কিছু মানুষ স্বাস্থ্য সম্মত স্যানিটেশনের সুবিধা পায়। গত বছরের ২৫ মার্চ তাহিরপুর সদর উপজেলার বীরনগর গ্রামকে খোলা পায়খানা মুক্ত ঘোষণা করা হয়। তবে এ বিষয়ে বেসরকারি সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তির বক্তব্য পাওয়া যায় নি।
টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের জয়পুর গ্রাম। গ্রামের দক্ষিণ দিকে বর্ষায় হাওরের আফাল আছড়ে পড়ে। আর উত্তরে পাটলাই নদী পেরিয়ে হাওর শেষ হয়েছে ভারতের মেঘালয়ের কিনারে। বর্তমানে এই গ্রামে ৭০— ৭৫ টি পরিবারের বসবাস। প্রায় আট বছর আগে বেসরকারি সংস্থার পক্ষ থেকে প্রতিটি পরিবারকে স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশনের মালামাল দেওয়া হয়। গ্রামের উত্তরে নদীর পাড় ঘেঁষে নির্মাণও করা হয়। আট বছরে নদীগর্ভে গিয়েছে স্যানিটেশনের সব উপকরণ। এখন আবারও সবাই ঝুলন্ত ল্যাট্টিন ব্যবহার করছে।
এই গ্রামের বাসিন্দা মো. আবুল হোসেন বললেন, আট বছর আগে বেসরকারি সংস্থার পক্ষ থেকে গ্রামের সবাইকে স্বাস্থ্য সম্মত ল্যাট্টিন দেয়া হয়। নদীর পাড় ঘেঁষে দেয়ায় বছরে বছরে এক এক করে ভেঙে গেছে। এখন কারো বাড়িতে স্বাস্থ্য সম্মত ল্যাট্টিন নেই। সবাই ঝুলন্ত ল্যাট্টিন ব্যবহার করছে।
উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের খলিশাজুরি গ্রামের বাসিন্দা মো. আলীনুর মিয়া বললেন, আমাদের গ্রামে কখনও সরকারি বা বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে ল্যাট্টিন নিয়ে কাজ হয় নি। কোনো প্রচার প্রচারণাও হয় নি। মানুষের মাঝে সচেতনতার অভাব ছিলো। আগে প্রতিটি বাড়িতে বাড়িতে ঝুলন্ত ল্যাট্টিন ছিলো। এখন যাদের সামর্থ হয়েছে তারা স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্টিন দিয়েছে। বাকীরা এখনও ঝুলন্ত ল্যাট্টিন ব্যবহার করছেন।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য মতে, গত একবছরে জেলায় পানিবাহিত রোগ ডায়ারিয়ায় ৬ হাজার ৪৫ জন আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। এরমধ্যে সুনামগঞ্জ সদর ২২৫, বিশ^ম্ভরপুর ৫৩, ছাতক ১২৫৮, শান্তিগঞ্জ ৩২১, দিরাই ৪৫০, ধর্মপাশা ২৫৪, দোয়ারাবাজার ১১২৩, জগন্নাথপুর ৩৭৬, জামালগঞ্জ ৪৬৭, শাল্লা ৬৬ ও তাহিরপুরে ১৪৪৩ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন।
তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অফিসার ডা. মির্জা রিয়াদ হাসান বললেন, তাহিরপুরে হাসপাতালে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে অনেক রোগী আসেন। তাদের মধ্যে বেশিরভাগ শিশু। এখনও হাওর এলাকার বেশিরভাগ পরিবারের স্যানিটেশনের অপ্রতুলতা রয়েছে।
২০৩০ সালের মধ্যে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ১৭ টি লক্ষের মধ্য একটি হলো নিরাপদ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা। এসডিজি ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী সবার স্বাস্থ্য সম্মত স্যানিটেশন নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। সে দায়িত্ব বাস্তবায়নে কাজ করছে জেলা জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবুল কাশেম বললেন, আমরা সুনামগঞ্জে স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন নিয়ে কাজ করছি। ৭ টি জেলা নিয়ে ‘হাওরাঞ্চলে পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন’ নামে আরেকটি প্রকল্পের কাজ চলছে। সেখানে প্রায় ৯০ কোটি টাকার বরাদ্দ পাওয়া গেছে। এই প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৪ সনে শেষ হবে। এই কাজ শেষ হলে স্বাস্থ্য সম্মত স্যানিটেশনের আওতায় হাওরের বিশাল একটি অংশের মানুষ চলে আসবে।