টাঙ্গুয়ার হাওরে পাখি কমছে

বিশেষ প্রতিনিধি
টাঙ্গুয়ার হাওরে পাখি কমছে। পাখি কেন কমছে এ নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। তবে বিশ^ পরিযায়ী পাখি দিবস (আট অক্টোবর) এ জেলায় অনেকটা নিরবেই কেটেছে। টাঙ্গুয়ার হাওরেও এই দিবসে কোন প্রচারণা দেখা যায় নি। টাঙ্গুয়ায় পাখি কমার কারণ খুঁজতে গিয়ে অভিজ্ঞজনেরা নানা বিষয় সামনে এনেছেন, তারা বলেছেন, পাখি কমতি ঠেকাতে কার্যকর উদ্যোগও গ্রহণ করছে না কেউ।
পাখির সংখ্যা কমার বিষয়ে বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ইনাম আল হক বললেন, পাখি কেবল বাংলাদেশে নয়, এশিয়ার যে অঞ্চল দিয়ে পাখির যাতায়াত, সব অঞ্চলেই পাখি কমছে। টাঙ্গুয়ার হাওরে পাখি কমার প্রধান কারণ হচ্ছে ওখানকার পানির নীচের নরম গাছ কমে গেছে। পাখির বিশ্রামের স্থানও কমে যাচ্ছে, নিরাপত্তার অভাবও আছে। পানির নীচের নরম পাতার গাছ কেন কমে যাচ্ছে, এ নিয়ে কোন গবেষণাও হচ্ছে না, কারো কোন উদ্যোগও নেই। উদ্ভিদ বিজ্ঞানীদের এ বিষয়ে কাজ করা প্রয়োজন। কিন্তু কেউই এই নিয়ে ভাবছেন না।
ইনাম আল হকের মতে পানির নীচের উদ্ভিদ বা খাদ্য কমে যাওয়া ছাড়া পাখি কমার অন্য কারণগুলো খুবই গৌণ, কিন্তু ওগুলো নিয়েই বেশি ভাবছেন অনেকে।
টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের তেলিগাঁও গ্রামের বদন পালের বাড়ীতে কয়েক হাজার পানকৌড়ির বাস। বদন পাল বললেন, পাখি শিকারীদের উৎপাত ঠেকাতেও কঠোর পদক্ষেপ নেই। তিনি রাত জেগে পাখি পাহাড়া দেন। শরীর অসুস্থ্য হলে বা ঘুমিয়ে গেলেই পাখি শিকারীরা বিশেষ পদ্ধতিতে পাখি মেরে বস্তা ভর্তি করে নিয়ে যায়। বহু জায়গায় এই বিষয়ে জানালেও কেউ এদের ঠেকাতে কোন ব্যবস্থা নেয় নি।
টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের জয়পুর এলাকার কবির আহমদ বললেন, টাঙ্গুয়ার হাওরে প্রতিদিন এখন তিন-চারশ ট্রলার যেদিক ইচ্ছে ঘুরছে। বেশিরভাগেই উচ্চ শব্দে মাইক ব্যবহার করছে। প্রশাসনের দেওয়া শর্তও মানছে না তারা। উচ্চ শব্দের কারণেও ভয়ে সরছে পাখিরা। কবির আহমদ বললেন, শব্দ দূষণ ঠেকানোর পাশপাশি ট্রলার চলাচলের সীমানা বেধে দেওয়া জরুরি।
শিক্ষক ও সাংবাদিক গোলাম সরোয়ার লিটন মনে করেন, হাওরের ভেতরে শব্দ নিয়ন্ত্রণ জরুরি। হাওরপাড়ের সাউন্ড সিস্টেমের দোকানীদের এই বিষয়ে সতর্ক করতে হবে।
বন অধিদপ্তরের পাখি বিশেষজ্ঞ শিবলি সাদিকও বললেন, টাঙ্গুয়ার হাওরের অনেক পাখি থ্রেটের মধ্যে আছে। তার মতে ইঞ্জিন চালিত বোট, সাউ- সিস্টেম, টাঙ্গুয়ার হাওরে কারেন্ট জালের ব্যবহার, পাখি শিকার ও ড্রোন ক্যামেরার ব্যবহার পাখিদের হুমকিতে ফেলে দিয়েছে।
শিবলি সাদিক বললেন, টাঙ্গুয়ার হাওরে বক ও পানকৌড়ি বসবাসের ছয়টি কলোনী আছে। বাঙালভিটায় দুটি, তেলিগাঁও, গুলগাঁও, রাজেন্দ্রপুর ও নয়াবন্দ গ্রামে এসব কলোনী রয়েছে। এই কলোনী থেকেও পাখি শিকার হয়।
বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের জরিপ অনুযায়ী ২০২১ সালে টাঙ্গুয়ার হাওরে পাখির সংখ্যা ছিল ৫৯ হাজার ৭৪ টি। বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ইনাম আল হক জানিয়েছেন, ২০২২ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি’র জরিপে এই সংখ্যা আরও কমেছে।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটকবাহী হাওরবোটের চলাচলসহ মানুষের আনাগোনায় পাখি কিছুটা কমেছে। তবে পাখি শিকারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর অবস্থান রয়েছে।