টাঙ্গুয়ায় বাঁধ না করার সিদ্ধান্ত/ যেতে হবে হাওর রক্ষার সমন্বিত কর্মসূচীর দিকে

বৃহত্তর টাঙ্গুয়ার হাওরে কোনো ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ মনিটরিং জেলা কমিটি। শনিবার জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে কমিটির দায়িত্বশীলরা দিনভর টাঙ্গুয়ার হাওর পরিদর্শন শেষে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। টাঙ্গুয়ার হাওর একটি সংরক্ষিত জলাশয়। এটি আন্তর্জাতিকভাবে রামসা কর্তৃক স্বীকৃত বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। টাঙ্গুয়ার হাওরকে সরকার সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করে এর ভিতরকার জলাশয় ও বিল সমূহ ইজারা দেয়া বন্ধ করেছিলেন। হাওরের ব্যবস্থাপনায় সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ শুরু করা হয়েছিলো। এই হাওরে শীতকালে প্রচুর অতিথি পরিযায়ী পাখির আগমন ঘটে থাকে। মিঠাপানির মাছের প্রজননস্থল হিসাবেও সারা দেশে পরিচিতি রয়েছে এই হাওরের। ইজারাপ্রথার অবসার ঘটিয়ে হাওরকে সংরক্ষণ করার উদ্দেশ্য ছিলো হাওরের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা। অর্থাৎ মাছের বংশবৃদ্ধি ও পাখির আগমন বৃদ্ধি ঘটানো। এছাড়া এই হাওরের মূল্যবান প্রাণীজ ও উদ্ভিজ জীববৈচিত্রকে রক্ষা করা। কিন্তু কার্যত সরকারি-বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হাওরের কোনো প্রকারের উন্নতি হয়নি। বরং হাওরটি যথেচ্ছভাবে লুটপাটের শিকার হয়ে সম্পদ ও ঐতিহ্য শূন্য অবস্থায় পতিত হয়েছে বলে সকলে মনে করেন। তাই টাঙ্গুয়ার হাওরকে পবিবেশ ও প্রতিবেশগত বিবেচনায় সংকটাপন্ন এলাকা হিসাবে বিবেচনা করা হয়। হাওরের পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষার জন্য এবার ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ না করার সিদ্ধান্তটি একটি ভালো উদ্যোগ বটে তবে এটিই একমাত্র পন্থা নয়। টাঙ্গুয়ার হাওরকে রক্ষার জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। বলাবাহুল্য এরকম কার্যকর সমন্বিত উদ্যোগের দেখা হাওরটি কখনও পায়নি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেয়া তথ্য মতে এই হাওরে ৫০ হেক্টরের মতো জমিতে ধান চাষ করেন স্থানীয়রা। বিশাল টাঙ্গুয়ার হাওরের তুলনায় এই পরিমাণ জমি নেহায়েৎই নগণ্য। সাধারণত হাওরের কান্দা ও গ্রামসংলগ্ন উঁচু স্থানে স্থানীয় লোকজন ধান চাষ করে থাকেন। গতবছর এই হাওরে বাঁধ নির্মাণের অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায় নির্মিত বাঁধগুলো রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। অর্থাৎ বিশাল হাওরের বিস্তৃত জলরাশির চাপ ওই বাঁধগুলো সামাল দিতে পারে না। হাওরটিতে ধান চাষের জন্য সহায়তা বা উৎসাহ দেয়া হয় না। এত বড় হাওরের সামান্য কিছু পরিমাণ কৃষি জমিকে বাঁধ দিয়ে রক্ষা করা কঠিন কাজই বটে। বিষয়টি বিভিন্নভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে। হাওরের মৎস্যসম্পদ কমে যাওয়ায় হাওরপাড়ের লোকজনের কর্মসংস্থানের অভাব দেখা দিয়েছে। বলা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, টাঙ্গুয়ার হাওরের মৎস্যসম্পদ ও বনজ সম্পদাদি রক্ষায় সাম্প্রতিক অতীতে এই এলাকার লোকজন তেমন ভূমিকা রাখতে পারেননি। তারা সজাগ, সতর্ক, হাওরবান্ধব ও আন্তরিক হলে এভাবে হাওর কখনও সম্পদ শূন্য হতে পারত না। সকলের জানা হাওর এলাকার লোকজন সবসময়ই অভাবের মধ্যে থাকেন। অভাবের কারণে তারা এই হাওরকে উপজীব্য করেই বৈধ অবৈধ পন্থায় জীবিকার অন্বেষণে নিয়োজিত থাকেন। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর কার্যকর বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করা যায়নি। তাদেরকে হাওরের স্বজনে পরিণত করা যায়নি। এটি পরিকল্পনাগত সীমাবদ্ধতা ছিলো। এই লোকজনেরই একটি অংশ হাওরের কোণায়-কানায় অল্পবিস্তর কিছু ধান চাষ করেন। এদেরকে অবশ্যই বিকল্প জীবিকার উপযুক্ত সন্ধান দিতে হবে।
আগেই বলা হয়েছে টাঙ্গুয়া হাওর রক্ষায় সমন্বিত কর্মসূচীর দরকার। আগের অভিজ্ঞতার পুনর্মূল্যায়ন করে কেন সরকারি-বেসরকারি ব্যবস্থাপনা ব্যর্থ হলো তা বিবেচনায় নিয়ে অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি করতে হবে। এবং এই কর্মসূচীর কেন্দ্রে রাখতে হবে হাওরপাড়ের মানুষকে। তাঁদেরকে হাওরের বন্ধু বানাতে না পারলে বিশাল এই হাওরকে রক্ষা করা সম্ভব হবে না। আর তা করতে পারলেই বাঁধ নির্মাণ না করার হাওরবান্ধব সিদ্ধান্তটি দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর সুফল বয়ে আনবে।