তাহিরপুরের দুই সরকারি অফিসের অপচর্চা/ পুরো ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনই কাম্য

তাহিরপুর উপজেলার উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ওয়াশব্লক সংস্কারের নামে আসা সামান্য বরাদ্দ থেকেও নয়-ছয় করতে সামান্যতম দ্বিধা করতে পারলেন না। অনুদঘাটিত, অপ্রকাশিত, অজানা আরও বহু দুর্নীতি কা-ের সাথে তাল মিলাতে গিয়ে তিনি সামান্য ১৮ হাজার টাকা বরাদ্দ থেকেও কিছু অংশ চেটে দেখার খায়েশ ঠিকই মিটাতে চেয়েছেন। সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, ওই উপজেলার ১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ওয়াশব্লক সংস্কারের জন্য বিদ্যালয় পিছু ১৮ হাজার টাকা করে মোট ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা বরাদ্দ পান তিনি। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের স্থানীয় অফিস তাকে এই পরিমাণ টাকা দেয়। যদিও আমরা বুঝতে অক্ষম, কাজটি নিজেরা না করিয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিস কেন নগদে ওই টাকা শিক্ষা কর্মকর্তাকে দিতে গেলেন। প্রকাশিত সংবাদে একজন শিক্ষক জানিয়েছেন শিক্ষা কর্মকর্তা তাকে ১৮ হাজার টাকার মধ্যে ১৫ হাজার টাকা দিয়েছেন। অন্য এক শিক্ষক বলেছেন ৮ হাজার টাকা দেয়ার কথা। অর্থাৎ শিক্ষা কর্মকর্তা যা বরাদ্দ পেয়েছেন তার একটি অংশ নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন। কেন? এর সহজ উত্তর হলোÑ হাতে রেখে দেয়া টাকাকে হয়তো তিনি নিজের অংশ মনে করেছেন। শুধু কম টাকা দিয়েই শিক্ষা কর্মকর্তা ক্ষান্ত হননি। শিক্ষকদের খালি বিল-ভাউচার স্বাক্ষর করে জমা দেয়ার জন্যও তিনি বলে দিয়েছেন। সরকারি ব্যয় সম্পাদন সংস্কৃতিতে এরকম কা- অবাক করার মতো কোনো বিষয় নয়। বরং যিনি সরকারি বরাদ্দের শতভাগ যথাযথ কাজে ব্যয় করেন তাকে এই সমাজে হালে সবচাইতে বোকা লোক বিবেচনা করা হয়। তাহিরপুরের শিক্ষা কর্মকর্তা বোকা নন বলেই পুরো টাকা না দিয়ে অংশবিশেষ নিজের হাতে রেখেছেন। এই চাতুরিপনার জন্য তিনি বিশেষ বাহবা পেতে পারেন। কিন্তু বেয়ারা শিক্ষকরা এই তথ্য গণমাধ্যমে ফাঁস করে দিয়ে যে তার মানসম্মান এভাবে ধুলোয় মিলিয়ে দিবেন তা তিনি বোধ করি ঘুর্ণাক্ষরেও চিন্তা করেননি। তিনি এটা ভাবলেন না, শিক্ষকরা হলেন জাতি গঠনের কারিগর। তাদের সকলেই এখনও পচে যাননি। কেউ কেউ রয়েছেন শিক্ষকতার মহান আদর্শকে বুকে ধারণ করা উন্নত শির হয়ে। তারা এ অনিয়ম মেনে নিতে পারেননি।
একই উপজেলার অন্য একটি খবর রীতিমতো হাসির উদ্রেক করে। উপজেলা হিসাব রক্ষণ অফিসের ভল্টের লোহার গ্রিল ভাঙারি ব্যবসায়ীর নিকট বেচে দিচ্ছিলেন ওই অফিসের ফুটফরমাইশ খাটার জন্য নিয়োজিত এক ব্যক্তি। ইউএনও অফিসের নাজিরের চোখে বিষয়টি ধরা পড়ে যায়। তার হস্তক্ষেপে রক্ষা পায় ভল্টের গ্রিল বিক্রির অপচেষ্টা। একবার ভাবুন একটি সরকারি অফিসের কা-কারখানা। একেবারেই আক্ষরিক অর্থে যে ব্যক্তি অফিসের কেউ নয়, স্থানীয়ভাবে যাকে ফুটফরমাইশ খাটার জন্য রাখা হয়েছে; সে এমন কাজ অবলীলায় করে ফেলতে পারে। সে এত সাহস কোথায় পেল? নিশ্চয়ই অফিসের অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতি থেকে সে এমন চুরি বিদ্যা রপ্ত করেছে। এই একটি ঘটনা আমাদের কিছু সরকারি অফিসের চরিত্র সকলের সামনে ফুটিয়ে তোলার জন্য যথেষ্ট।
তাহিরপুর শিক্ষা অফিস ও হিসাব রক্ষণ অফিসের ঘটনা দুইটি প্রতীকী ব্যঞ্জনা মাত্র। এগুলো অনুদঘাটিত বিশাল সমুদ্রের এক দুই ফোটা বিন্দুর মতো। এই সংস্কৃতির মধ্যেই আমাদের বসবাস। এই জায়গাগুলোই জনগণের নানা সেবা-সুবিধাদি নিশ্চিত করে। এজন্য আমরা কেবল সংশ্লিষ্ট অফিসের জড়িতদের দায়ী করব না। এ হলো আমাদের জাতীয় অবস্থার সকরুণ বাস্তবতার অংশবিশেষ মাত্র। আমরা এই অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তনের কথা প্রতিক্ষণ ব্যক্ত করি। একটি জাতি এত অধঃপতিত ব্যবস্থা নিয়ে বেশি দূর যেতে পারে না। তাই আমরা ঘটনা বিশেষের পরিবর্তে পুরো ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের প্রত্যাশাই পুনরায় ব্যক্ত করি কেবল।