তাহিরপুরে মুজিবপল্লীর ২৭ ঘর তালাবদ্ধ/ সুবিধাভোগীদের তালিকা পুনর্মূল্যায়ন করা হোক

ভূমিহীনদের আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের মানবহিতৈষী প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষের কারণে কীভাবে ভেস্তে যেতে বসেছে তার প্রমাণ হলো তাহিরপুর উপজেলার উত্তর বড়দল ইউনিয়নের শিমুল বাগান সংলগ্ন মুজিব পল্লী। ওখানে দুইটি ব্লকে ৭০ টি ঘর নির্মাণ করে যাচাই বাছাইকৃত ৭০ টি ভূমি ও গৃহহীন পরিবারের নামে বরাদ্দ দেয়া হয়। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, ৭০ টি ঘরের ২৭টি ঘর এখন তালাবদ্ধ থাকে। অর্থাৎ এই তালাবদ্ধ ঘরগুলো যাদের নামে বরাদ্দ হয়েছিলো তারা এখানে থাকছেন না। এর সারাংশ হলো অন্তত এই ২৭ পরিবার প্রকৃত ভূমিহীন নয় বা তাদের সরকারি ঘরের কোনো প্রয়োজন নেই। এরকম অবস্থা শুধু তাহিরপুরের এই মুজিব পল্লীতে নয় বরং সর্বত্রই একই রকম বাস্তবতার সন্ধান পাওয়া যাবে। আশ্রয়ণ প্রকল্প, আদর্শ গ্রাম প্রকল্প, গুচ্ছগ্রাম প্রকল্প, মুজিব পল্লী প্রভৃতি প্রকল্পের মাধ্যমে সরকার চেষ্টা করছেন দেশের প্রতিটি মানুষের আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য। কিন্তু উপকারভোগী বাছাই করার সময় প্রকৃত ভূমিহীনের পরিবর্তে যে বেশ বড় পরিমাণে ভূমিহীন নয় এমন ব্যক্তিরা এই সুবিধা পাচ্ছে তা এখন সুবিদিত। এজন্য কাকে দায়ী করা হবে? সরকারের সদিচ্ছাপ্রসূত একটি কল্যাণমূলক কর্মসূচীকে মাঠ পর্যায়ে যারা প্রশ্নবিদ্ধ ও অসফল করে তুলছেন তাদের এর জবাব দিতে হবে।
উক্ত সংবাদ প্রতিবেদন অনুসারে আরেকটি বিষয় সামনে চলে এসেছে। সেটি হলো জীবীকার সুনিশ্চিত ব্যবস্থার অভাবেও অনেকে এসব বরাদ্দকৃত ঘর ছেড়ে দিচ্ছেন। পুনর্বাসিত পরিবারগুলোর বেশির ভাগ প্রকল্প এলাকার বাসিন্দা নন। উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসে তারা ওখানে ঘর পেয়েছেন। অনেকে হয়তো আগের অবস্থানে মাছ ধরে জীবীকা চালাতেন। অনেকে অন্যবিধ পেশার মাধ্যমে পরিবারের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করতেন। হঠাৎ করে ঘর বরাদ্দ পেয়ে নতুন একটি এলাকায় এসে তারা কর্মহীনতায় পড়ে গেছেন। নতুন এলাকায় তাদের জুৎসই পেশার সন্ধান করতে পারছেন না অনেকে। আবার আগের জায়গায় পূর্ব পেশায় নিয়োজিত থেকে এই জায়গায় এসে বসবাস করাও সম্ভব নয়। এ কারণেই কিছু লোকের নির্গমন ঘটছে। ঘর বরাদ্দ কালে প্রকৃত ভূমিহীন পরিচয়ের সাথে তাদের পেশাগত সুবিধার দিকটিও বিবেচনায় নেয়া উচিৎ। কারণ মানুষ ঘর পেলেও জীবীকার জন্য তাকে কোনো না কোনো পেশায় নিয়োজিত হতে হবে। একেবারে কর্মহীন মানুষ এখন বেশি নেই। সকলেই কাজ করে বেঁচে থাকতে চায়। সুতরাং মানুষের পেশার বিষয়টি বিবেচনা না করে তাহিরপুর সদর বা দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের কোনো ভূমিহীন পরিবারকে যদি উত্তর বড়দল ইউনিয়নের পাহাড়ী এলাকায় ঘর বরাদ্দ দেয়া হয় তখন আসলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির খুব বেশি উপকার হয় না। কারণ ব্যক্তির পেশাগত অভ্যস্ততা তার অবস্থানকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠে যা নতুন একটি জায়গায় এসে তৈরি করা অনেকের দ্বারাই সম্ভব হয় না।
যাহোক আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে যে ঘরগুলো বরাদ্দ দেয়া হয়েছে তার একটি পুনর্মূল্যায়ন করা উচিৎ। বরাদ্দ নীতিমালা অনুসারে বরাদ্দপ্রাপ্ত ঘরে বসবাস না করে এর মালিকানা ধরে রাখার উপায় নেই। সুতরাং যাদের অন্যত্র বাড়িঘর রয়েছে এমন ব্যক্তিদের বরাদ্দ বাতিল করে তদস্থলে প্রকৃত ভূমিহীনদের বরাদ্দ দানের আশু ব্যবস্থা গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। এ ধরনের আবাসন প্রকল্প পুরো উপজেলাজোড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে তৈরি করার ব্যবস্থা করতে হবে যাতে বরাদ্দপ্রাপ্তরা নিজেদের অভ্যস্ত পেশায় সংযুক্ত থেকে সরকারি ঘরে বসবাস করতে পারেন। সুবিধা প্রদানের জন্য তালিকা তৈরির সময় যাতে সঠিক ব্যক্তিরাই কেবল নির্বাচিত হয় সে ব্যবস্থাটি সততা ও আন্তরিকতার সাথে বজায় রাখতে হবে।