তিনটি অনিয়ম এক সুতোয় বাঁধা, অনিয়ম-দুর্নীতিই যেন নিয়ম হয়ে উঠেছে

বুধবার দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে দুইটি সংবাদ ছিল যা থেকে সমাজের দুর্নীতিপ্রবণ বাস্তবতার সন্ধান মিলে। জগন্নাথপুরে সাবেক একজন সংসদ সদস্য নিজের বাড়ির নির্মাণ কাজে অবৈধ বিদ্যুৎসংযোগ নেয়ার পর অভিযোগের ভিত্তিতে তা বিচ্ছিন্ন করা হয়। অভিযুক্ত সংসদ সদস্য কেবল একজন সাবেক আইনপ্রণেতাই নন বরং জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মত একটি বড় ধর্মীয় সংগঠনের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। এই ধরনের মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রতিটি পদক্ষেপ ন্যায় ও আইনসংগত হওয়া উচিৎ। ছোট-বড় সকল বিষয়েই তাঁদের সতর্ক থাকতে হয় যাতে কোন বিতর্ক তৈরি না হতে পারে। তাঁদের আচরণ হবে অনুসরণীয়-অনুকরণীয়, এমনটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু তিনি যদি নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত বিদ্যুতের ক্ষেত্রে অবৈধ সংযোগ নেয়ার মত একটি ক্ষুদ্র কাজে জড়িত হয়ে যান তাহলে সকলের জন্য তা দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হয়ে উঠে। যদিও তিনি বলেছেন, নির্মাণ কাজের শ্রমিকরা ভুল করে কাজটি করেছে তবুও এর দায় তিনি এড়াতে পারেন না। কারণ নির্মাণ কাজ চালু রাখতে বিদ্যুতের প্রয়োজন রয়েছে সেটি তাঁর জানা থাকার কথা, তিনি বিদ্যুৎসংযোগের বৈধ ব্যবস্থা করে দেননি বলেই শ্রমিকরা অবৈধ সংযোগ নিতে বাধ্য হয়েছেন বলেই অনুমান করা যায়।
অন্য ঘটনাটি একটি সরকারি দপ্তরের। ধর্মপাশা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস ২৩টি বিদ্যাøলয়ের বিনামূল্যের পুস্তক পরিবহনের খরচ খাতে সরকারি কোষাগার থেকে টাকা তুলে ওই টাকা সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়গুলোকে আর দেয়নি। গত ৩-৪ বছর ধরেই ওই অফিসে পুস্তক পরিবহনের টাকা তোলে না দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। সংবাদে বলা হয়েছে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার উদাসীনতার সুযোগ নিয়ে হিসাবরক্ষক কৌশলে পরিবহন খরচের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। একটি সরকারি দপ্তরের প্রধান যিনি আবার নিজের অধিক্ষেত্রের আয়ন-ব্যয়ন কর্মকর্তা, তাঁকে উদাসীন থাকার কোন সুযোগ নেই। তাঁর দপ্তরের যেকোন অনিয়ম-বিচ্যুতির জন্য প্রধানত তিনিই দায়ী। এরপর অন্যদের দায়। জানা যায়, পুস্তক পরিবহনের জন্য সরকার টাকা দেয় এই তথ্য জানা ছিল না শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানদের। এই অজ্ঞতার সুযোগ গ্রহণ করেছে শিক্ষা অফিস। সম্প্রতি সিআরবিএস প্লাস নামক একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে শিক্ষকরা জানতে পারেন যে, সরকার পরিবহন খরচ খাতে বইপিছু ২৫ পয়সা করে বরাদ্দ দিয়ে থাকেন যা তারা ২০১৮ সনের পর থেকে পাননি। এরপরেই ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে। অফিসের হিসাবরক্ষক নানা খুঁড়া যুক্তির আশ্রয় নিয়ে শাঁক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করেছেন।
উপরের দুইটি ঘটনা আমাদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ও সরকারি কর্মচারিদের মানসিক দীনতা ও দুর্নীতিপ্রবণ মনের পরিচায়ক। এরকম ঘটনা এখন আখছারই ঘটছে বলে এ নিয়ে মানুষ কথা বলা ছেড়ে দিয়েছে। অনিয়মই যেন আমাদের নিয়ম হয়ে গেছে। এক সর্বগ্রাসী অনিয়মের রাজত্বে বসবাস আমাদের। এই দুই ঘটনার পাশাপাশি বৃহষ্পতিবারের দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ এনে শাল্লার ইউএনও’র বিরুদ্ধে ডিসি’র কাছে নালিশ দাখিলের একটি খবর প্রকাশ হয়। শাল্লার ইউপি চেয়ারম্যানরা ইউএনও ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারি প্রকৌশলী কর্তৃক নীতিমালা লংঘন করে কারও সাথে আলোচনা ব্যতিরেকেই টাকার বিনিময়ে পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়ে পিআইসি গঠনের অভিযোগ করেছেন। বস্তুত পিআইসি গঠনে এরকম প্রবণতা পুরো জেলাজুড়েই শুনা যায় এবং এ-কারণে কৃষক-বান্ধব পিআইসি প্রথাটি অকার্যকর প্রমাণিত হয়ে পড়ছে।
অনিয়ম-দুর্নীতিই যদি সমাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠে তাহলে আমরা যত সুন্দর ভবিষ্যৎই গড়ে তুলতে চাই না কেন তা হবে মরুভূমির বুকে ¯্রােতস্বীনি নদী দেখার মতই অবাস্তব। আমাদের আসলে সর্বত্র নিয়ম প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ব্যক্তি থেকে প্রতিষ্ঠান সর্বত্রই সুশাসন ও সদাচরণ চর্চার দিকে এখন নজর দেয়ার সময় এসেছে।