দুগ্ধ খামারের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে আমাদের অসীম আগ্রহ

জেলা প্রাণীসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব মোতবেক ছোট-বড় মিলিয়ে জেলায় দুগ্ধ উৎপাদনকারী গরুর খামার সংখ্যা ৫৩৬ টি। অবশ্য সুনামগঞ্জ ডেইরি ফার্মার্স এসোসিয়েশনের তথ্য মোতাবেক তাদের সংগঠনভুক্ত খামারের সংখ্যা ৩৫২টি। সংখ্যার এই তারতম্য থাকতেই পারে। কারণ সবগুলো খামারই যে বর্ণিত সংগঠনের সদস্য তা বলার অবকাশ নেই। জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব মোতাবেক বিদ্যমান খামারগুলোতে দৈনিক ৮০৪০ লিটার দুধ উৎপাদন হচ্ছে। এর বাইরে ব্যক্তিগতভাবে যারা গাভি পালন করেন তাদের উৎপাদন যোগ করলে জেলায় দুধের উৎপাদন এখন কম নয়। যদিও চাহিদার তুলনায় এই উৎপাদন এখনও অনেক কম। তবুও জেলায় দুগ্ধখামার গড়ে উঠার প্রাথমিক সময়ে এই পরিমাণ উৎপাদন কম নয়। তরুণ-যুব সমাজের মধ্যে এখন দুগ্ধ উৎপাদনের লক্ষে গরুর খামার স্থাপনের আগ্রহ বাড়ছে। ব্যক্তিগতভাবে অথবা সংঘবদ্ধ হয়ে অনেকেই গরুর খামার দিচ্ছেন। অনেকে মূল পেশার পাশাপাশি গরুর খামারকে বিকল্প পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। সামনের দিনগুলোতে নিঃসন্দেহে খামারের সংখ্যা আরও অনেক বাড়বে। সেই সময় আর বেশি দূর নয় যখন জেলার দুধের চাহিদা জেলা থেকেই পূরণ করা সম্ভব হবে। মাছ, হাঁস-মোরগের পর এবার বাংলাদেশের খামারীরা দুধে বিপ্লব সংঘটন করতে চলেছেন। এটি ভাল লক্ষণ। সরকার অবশ্য নানাভাবে এইসব খামার স্থাপনকে উৎসাহিত করে চলেছে। এই ধারার ক্রমোন্নতিই আমাদের কাম্য।
একটা সময় ছিল, সুনামগঞ্জে দুধের সংকট ছিল মাত্রাতিরিক্ত। ব্যক্তিগত উৎস থেকে সংগ্রহ করে যারা দুধ বিক্রি করতেন তারা নানা অসাধু পন্থার আশ্রয় নিতেন। এরা দুধে পানি মিশিয়ে গ্রাহক ঠকানোর কাজটা ভালই করতেন। ফলে প্রতি লিটার দুধে পানির পরিমাণ নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে সর্বদাই আতংক থাকত। অন্যদিকে জেলার অধিকাংশ মিষ্টিজাত দ্রব্য উৎপাদনকারীদের নির্ভর করতে হত বাইরের ছানার উপর। বগুড়ার ছানা না আসলে কোনো মিষ্টিই উৎপাদন করা যেত না। মিষ্টি উৎপাদনকারীদের ছানার প্রধান উৎস এখনই বাইরে। কিন্তু এই উৎস যে অচিরেই বন্ধ হয়ে যাবে জেলার আনাচে-কানাচে গড়ে উঠা খামারগুলো তার পূর্বাভাস দেয়।
দুধকে সুষম বা আদর্শ খাবার বলা হয়ে থাকে। শিশুর শরীর গঠনে মাতৃদুগ্ধের পরই গরুর দুধের ভূমিকা অনস্বীকার্য। আমাদের বাঙালি সংস্কৃতিতে দুধ-দধি-মিষ্টির কদর বেশি। বাঙালিদের কোনো অনুষ্ঠানই মিষ্টি ছাড়া শেষ হয় না। বাঙালি রসনা বিলাসেরও অন্যতম উপকরণ নানা পদের মিষ্টি। বাঙালিদের তৈরি মিষ্টির কদর রয়েছে বিশ্বজুরে। এছাড়া দুধ প্রক্রিয়াজাত করে দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণযোগ্য নানা সামগ্রী উৎপাদন করা যায়। ঘি, পনির এর অন্যতম। সারা বিশ্বে রয়েছে দুধের বাজার। তাই অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করার সুযোগ রয়েছে। সুতরাং বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক উৎপাদনের ক্ষেত্রে দুগ্ধ উৎপাদন একটি উজ্জ্বল খাত হিসাবে বিবেচিত হয়। তরুণ ও যুব সমাজকে আরও বেশি করে আগ্রহী করে তুলতে পারলে দুধের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করা কঠিন কোনো কাজ নয়।
এজন্য অবশ্য এই খাতের ঝুঁকি কমানোর বিষয়ে সরকারকে কিছু উদ্যোগ নিতে হবে। রোগ-বালাইয়ে আক্রান্ত হয়ে যাতে খামারের গরুর ক্ষতি না হয় সেটি নিশ্চিত করতে হবে। এই জায়গায় খামারীদের জন্য বিশেষ বীমা চালু করা যেতে পারে। নতুন নতুন উদ্যোক্তা খোঁজতে হবে। তাদের আর্থিক সহায়তায় উদারভাবে এগিয়ে আসতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিতে হবে। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ গোচারণের জন্য উৎকৃষ্ট স্থান। বড় আকারের খামারের পরিবর্তে ছোট ছোট খামার স্থাপনের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে একদিকে যেমন বহু কর্মসংস্থান তৈরি হবে তেমনি এইসব উদ্যোগ দারিদ্র্য বিমোচনে রাখবে বিশাল ভূমিকা। দুগ্ধ খামারের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে তাই আমাদের অসীম আগ্রহ।