ভ্রমণ-দুবাই, শারজাহ, আবুধাবি

এনাম আহমদ (অ্যাডভোকেট)
মধ্য নভেম্বরের চমৎকার এক নাতিশীতোষ্ণ ভোরবেলা চতুর্থবারের মতো দুবাই এয়াপোর্টে পা রাখলাম। আশা-নিরাশা, হতাশা অবশেষে ভরসা নিয়ে আমার এবারের দুবাই যাওয়া। সুনামগঞ্জ থেকে সকাল ৭টায় ঘর থেকে বের হয়েছিলাম। দুবাই এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে দেখি কাকতালীয় ভাবে আবারও সকাল ৭টা। দু’দেশের সময়ের পার্থক্য মেনে নিয়েও প্রায় ২৪ ঘন্টার দীর্ঘ জার্নি। মাঝখানে তিন এয়ারপোর্টে অপ্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা, হৃদয়হীনতা, অস্থিরতা; অবস্থা বেগতিক দেখে প্রত্যুতপন্নমতিতা, অবশেষে দুবাই ইমিগ্রেশন কর্তাদের উদারতা ও দূরদর্শিতায় মহা সমারোহে আমার এবারকার আরবে প্রবেশ।
প্রথম দুবাই এ পা রাখা এক যুগ আগে ইংল্যান্ড থেকে দেশের ফিরতি পথে। বাংলাদেশ বিমান থেকে আকাশে ভাসতে ভাসতে দুবাই দেখে তখন রীতিমতো ভিরমি খেয়েছিলাম। ইউরোপের চোখ ধাঁধানো জৌলুস উপভোগ করে দুবাইকে কেমন যেন বিবর্ণ মলিন একটি শহর বলে মনে হয়েছিল। দুবাই শহর ঢাকার মতোই দুই অংশে বিভক্ত। পুরাতন দুবাই ও নতুন দুবাই। এয়ারপোর্টটি পুরাতন দুবাইয়ের কাছাকাছি থাকায় এমনটি মনে হয়েছে। তবে এটি পারস্য উপসাগরের তীরবর্তী হওয়ায় ঐ অংশটি অত্যন্ত মনোরম। প্রথমবার সেপ্টেম্বর মাসের দুপুর বেলা দুবাইয়ের সূর্যের উত্তাপ গায়ে মেখে দিশেহারা হয়ে গিয়েছিলাম। প্রকৃতি যেখানে রুদ্রমূর্তি ধারণ করে রাখে। মানবতা সেখানে শেষ বিচারে পরাজিত হয়। উত্তাপের হাত থেকে রক্ষা পেতে প্রায় সব ভবনই সাদা রং করা। তবে সজীবতা ফেরাতে তারা তুমুল কর্মযজ্ঞে নিয়োজিত। মরুভূমিতে এবং একই সঙ্গে পারস্য উপসাগরে বাঁধ দিয়ে হুলুস্থুল কর্মকা- করে সম্ভবত তারা সফল হয়েছে। পৃথিবীর চারপাশ থেকে আজকাল মানুষজন দুবাই দুবাই বলে হামলে পড়ে তাদের সাফল্যের স্বীকৃতি প্রদান করে। মাঝখানে আরও দুবার দুবাই যাওয়া আসার অভিজ্ঞতা হয়েছে। সখ্যতা হয়নি। এবার অর্ধমাস অবস্থান করার সম্ভাবনা থাকায় সম্পর্কের সংকট কাটানোর পর্যাপ্ততা রয়েছে।
৬০-৭০ বছর আগে আরবদের অবস্থা আমাদের চেয়েও শোচনীয় ছিল। সে ইতিহাসটি এখনও তারা তাদের মিউজিয়ামগুলিতে সংরক্ষণ করে রেখেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত পারস্য উপসাগরের দক্ষিণ পূর্বে অবস্থিত একটি দেশ। এটি ৭টি রাজতন্ত্র দ্বারা গঠিত (দুবাই, আবুধাবি, শারজাহ, আজসান, উম্মুল, কুয়াইন, ফুজিরা, রাস আল খাইসা)। রাষ্ট্রটি ১৯৭১ সালের ২ ডিসেম্বর বৃটিশদের স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুসারে প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশটির রাজধানী আবুধাবি। আবুধাবির আমির খলিফা বিন জায়েদ আল নাহিয়ান দেশটির রাষ্ট্রপতি ও রাষ্ট্রের প্রধান। অন্যদিকে দুবাইয়ের আমির মোহাম্মদ বিন রাশিদ আল মাক্তুম হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী ও সরকার প্রধান। ১৯৬৯ সাল থেকে সঠিক পরিকল্পনা ও প্রাপ্ত তেল রপ্তানী করে দেশটি বর্তমানে চরম সমৃদ্ধি লাভ করেছে।
এবারের দুবাই যাওয়া মূলত পারিবারিক। সে অনুযায়ী গুরুজনদের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে সাশ্রয়ে এই ভ্রমণের সিডিউল ঠিক হয় প্রায় এক বছর আগে। মৃদুমন্দ প্রস্তুতি চলতে থাকে তখন থেকেই। অভিজ্ঞতা অর্জন করি সম্প্রতি দুবাই ভ্রমণ করে আসা অ্যাড. বোরহান উদ্দিনের কাছ থেকে। জানা গেল তারা এক মাসের ভিসা দেয়। এ তথ্য মতে ইংল্যান্ড থেকে আসা একটি গ্রুপের সঙ্গে আমার দুবাই দেখা হওয়ার কথা ১৬ নভেম্বর। সে অনুযায়ী দুবাইয়ের আবাসিক হোটেলে থাকার অগ্রিম ব্যবস্থা করা হয়। আগে থেকে ব্যবস্থা করে রাখলে রুম অনেক সাশ্রয়ী মূল্যে পাওয়া যায়। নভেম্বরের ২য় সপ্তাহে দুবাই যাব বিধায় মধ্যে অক্টোবরে ভিসার জন্য পাসপোর্ট জমা দেই। সদা বিনয়ী অ্যাড. মাকসুদুল হক জোহার আন্তরিক ব্যবস্থাপনায় সিলেটের একটি প্রতিষ্ঠানে তা জমা দেই। উনারা আশ^াস দেন এক সপ্তাহের মধ্যে ভিসা হওয়ার। কিন্তু দুই সপ্তাহ পর খবর আসে আমার ভিসা প্রক্রিয়া জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। মানে সম্ভাবনা ফিফটি ফিফটি। দেশের বাইরে যাবো আর সংকটে পড়বোÑ তা তো হয় না। সমস্যা হবে জানতাম। তাই বলে শুরুতে। এদিকে লাগেজ ধার করে অনেকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ব্যাপক প্রচার করে আমি যাবার ‘সামান্য’ প্রস্তুতিও নিয়ে ফেলে মাঝারি মানের লজ্জার মধ্যে পড়লাম। শান্তিপূর্ণ সহ অবস্থানের আশা জলাঞ্জলি দিয়ে সম্মানজনক প্রস্থানের পথ খুঁজতে থাকলাম। তবে আগেই কেটে ফেলা বিমানের টিকেটের টাকা পুরোপুরি জলে যাওয়ায় ‘জলের গান’ শুনেও সেই দুঃখ ভুলতে পারলাম না। আসলে সময় সব দুঃখই ভুলিয়ে দেয়। যখন তা ভুলতে বসেছি তখনই সুরঙের অন্য প্রান্ত থেকে আলোর দেখা পাওয়া গেল। ট্রেভেলস্ থেকে জানানো হলো ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। দুই দিন পর ভিসা সমেত পাসপোর্ট আমার সামনে এসে আছড়ে পড়লো। তখন আমার হাতে সময় মাত্র ৪৮ ঘন্টা। এই অল্প সময়ের মধ্যে তখন ডলার, লাগেজ, ব্যাপক প্রচার নিয়ে মহা ব্যস্ততায় পড়লাম। এদিকে ভিসায় আমার পেশা লিখে দিয়েছে বিজনেস। বিনা উস্কানীতে কাঁদুনি গ্যাস! আইনজীবী হিসেবে ইমিগ্রেশন পেরোনো আমার জন্য কঠিন কিছু না। যদিও গুণগ্রাহীরা দুবাই ভ্রমণের ক্ষেত্রে বিমানবন্দরে ডিসটার্ব করে বলে সতর্ক করে দিয়েছে। আমি তা গ্রাহ্য না করলেও ভিসা ও বাস্তবে ভিন্ন পেশা উল্লেখ থাকায় আবারও বারুদের গন্ধ পেলাম। চাপা অশ^স্তি নিয়ে শুরু হলো আমার দুবাই যাত্রা।
উত্তেজনা চরমে থাকায় বিকেল ৫টায় চলে যাই ওসমানী বিমান বন্দরে। সিলেট থেকে ইউএস বাংলার ফ্লাইটে রাত পৌনে আটটায়। দীর্ঘ সময় লাউঞ্জে বসে ছটফট করছি, সময় কাটছে না দেখে আশেপাশের যাত্রীদের সাথে আলাপ জমানোর চেষ্টা করলাম। আমার প্রথম শিকার সৌদি আরবের অরসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা। সৌদি সরকারের কি একটা বিষয় নিয়ে তাকে তদন্তে পাঠিয়েছে। আমরা একে অন্যর দুর্বল ইংরেজী বুঝতে না পারলেও দীর্ঘক্ষণ কথা বলতে কারো কোন অসুবিধে হল না। ৮.৩০ এ ঢাকার অভ্যন্তরিণ টার্মিনালে পৌঁছে দুই লাফে আন্তর্জাতিক বর্হিগমনে চলে গিয়ে আমিরাত এয়ার লাইন্সের কাউন্টারে দাঁড়িয়ে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলাম……(চলবে)