দুর্গা পূজা, অশুভ শক্তির চিরবিদায় ঘটুক

বাঙালি হিন্দু ধর্মাবলম্বীগণের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গা পূজার আজ মহা অষ্টমী। পুরান মতে অশুভ শক্তির বিনাশের প্রতীক দেবী দুর্গা। তিনি মাতৃরূপে তার সন্তানদের রক্ষা করেন। দেবী দুর্গা শুভ শক্তির প্রতীক। বাঙালি হিন্দুরা দেবীকে নিজের আপন জন মনে করে ভক্তির অর্ঘ নিয়ে তার শুভাগমনের প্রতীক্ষা করেন পুরো বছর। দুর্গা পুূজাকে কেন্দ্র করে উৎসবের আমেজ শুরু হয়ে যায় পুজার মাস খানেক আগে থেকেই। প্রতিমা নির্মাণ, প্যান্ডেল, আলোকসজ্জ্বা ইত্যাদির প্রস্তুতিতে এই সময় কেটে যায়। আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, অধিকাংশ দুর্গা পূজাই সর্বজনীন অংশগ্রহণের মাধ্যমে উদযাপিত হয়ে থাকে। সর্বজনীন অংশগ্রহণের ফলে পূজাকে কেন্দ্র করে সামাজিক সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটে। মানুষে মানুষে তৈরি হয় হৃদ্যতা। অন্যদিকে পূজার পাঁচ দিন ব্যাপী আয়োজনের বিভিন্ন অনুষঙ্গ থেকে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলে সবিশেষ আনন্দ লাভ করেন। ম-পে ম-পে সকল ধর্মের মানুষের ভিড় প্রমাণ করে যে, পূজার ধর্মীয় অংশটুকু বাদ দিয়ে বাকি সামাজিক অংশগুলো সকলের জন্য উপভোগ্য। এতে আমাদের আন্তঃধর্মীয় সম্পর্কও সম্প্রীতির বন্ধনে অটুট হয়। পূজাটি স্পষ্টতই তখন সর্বজনীন হয়ে উঠে।
এবারের পূজার সময় দিনের বেলা অত্যধিক গরম অনুভূত হচ্ছে। দিনের প্রখর সূর্যের তেজ মানুষকে সহজেই কাহিল করে ফেলছে। আশ্বিনের এই শেষ প্রান্তে সাধারণত এতটা গরম অনুভূত হওয়ার কথা নয়। এই অতিরিক্ত উষ্ণতা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবজনিত নিঃসন্দেহে। আবহাওয়ার এই পরিবর্তন আজ বৈশ্বিকভাবে মোকাবিলার আওয়াজ উঠেছে। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কিছু কাজও শুরু করেছে। কিন্তু এর ইতিবাচক ফলাফল এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়। আবহাওয়াকে যদি নিজস্ব প্রাকৃতিক নিয়মে চলতে দেয়া না যায় তাহলে সারা বিশ্বে এর প্রভাব হবে মারাত্মক। বিষয়টি অতিশয় ভাবনার।
আরেকটি বিষয় উল্লেখ করতে হয়। হিন্দু সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ থেকে সংগঠন পর্যন্ত অনেকেই এ নিয়ে কথা বলা শুরু করেছেন। সেটি হলো পূজাকে অনেকক্ষেত্রে অতিমাত্রায় তামসিক করে ফেলা হচ্ছে। গভীর রাত অবধি উচ্চমাত্রার শব্দযন্ত্রের ব্যবহার করে পরিবেশ ও জনজীবন বিপর্যস্ত করা হচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ড বন্ধের জন্য এখন অনেকেই সোচ্চার হয়েছেন। অনেক পূজামণ্ডপ এখন দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিচ্ছেন। এখনও যারা এই ধরনের অতি আধুনিকতার নামে জনজীবনে অস্বস্তি আনয়নকারী কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছেন তাদের প্রতি আমাদের সনির্বন্ধ আহ্বান থাকবে- পূজার পবিত্রতা বজায় রেখে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়ার জন্য।
গত দুই বছর যাবৎ করোনা পরিস্থিতির মধ্যে পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এখন যদিও করোনা আক্রান্তের হার নিম্নগামী তবুও অসতর্ক হওয়ার উপায় নেই। গত বছরও এমন হ্রাসমান অবস্থা থেকে লাফ দিয়ে ভাইরাসের অতিমাত্রায় ভয়ংকর হয়ে উঠা আমরা দেখেছি। সরকার প্রতিটি মণ্ডপে যথেষ্ট পরিমাণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য পরিপত্র জারি করেছেন। এ নিয়ে পূজা কমিটিগুলোর সাথে প্রশাসনের মতবিনিময় হয়েছে। আমরাও অনুরোধ রাখব, মণ্ডপ কর্তৃপক্ষ ও দর্শনার্থীদের প্রত্যেকেই যেন উপযুক্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে পূজার আনন্দে অংশগ্রহণ করেন।
‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ একটি অসাম্প্রদায়িক উদারমনা গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য এমন ভাবনা অতিশয় প্রয়োজনীয়। দুর্গা পূজায় এই উদার মনোভাবের প্রকাশ ঘটে। আমরা একটি আধুনিক প্রগতিবাদী ও উদার বাংলাদেশ হিসাবে বিশ^ দরবারে নিজেদের পরিচয় অব্যাহত রাখতে চাই। এই জায়গায় রাষ্ট্র ও নাগরিক সম্প্রদায় সকলের দায়িত্ব অপরিসীম। সরকার এই লক্ষে কাজ করে যাচ্ছেন। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা মাঝে-মধ্যেই আমাদের মনে শঙ্কা তৈরি করে। নাগরিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় অবস্থানই কেবল এইসব বিচ্ছিন্ন অশুভ তৎপরতাকে রোধ করতে পারে। চলমান দুর্গা পূজা উপলক্ষে আমরা আবার এই ভাবনার প্রকাশ ঘটিয়ে একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের নাগরিক হিসাবে বসবাস করার প্রত্যয় ব্যক্ত করি।
সকলকে দুর্গা পূজার শুভেচ্ছা।