দুর্গোৎসবে বন্যার রেষ/ ‘ইবার কোনওরকম পূজাটা করন’

বিশেষ প্রতিনিধি
‘বন্যার সময় ৪০ ভাগ মানুষ ভিটা ছাড়া আছিল। হকলের ঘরঔ চাইর থাকি আট ফুট পানি, গোলার ৬০ ভাগ ধান ডুবাইল আছিল, ই ধান খাওয়ার উপযুক্ত নায়, বিক্রি করতে গেলে কেউ কিনে না। এই অবস্থার মাঝে দুর্গাপূজা সামনে, অন্য বছর গাঁওয়ের সভায় এক হাজার টেকা চাঁদা দিবার লাগি কইলে-কইছে- বারশ-পনরশ টেকা দিমুনে, ই-বছর আটশ টেকা যারে কওয়া গেছে, কয় তিনশ দিমুনে, দিতো কওয়াই থাকি, দেখতেঔতো দেখা যার, তার চলের না, কোনও রকম কোনও রকম পূজাটা করণ যায় কি-না চেষ্টা কররাম আমরা। নিয়মটা রক্ষা অইতো, প্রত্যেকদিন মিটিং অইতাছে, হকলেরঔ চিন্তা কিভাবে উদ্ধার অইতাম। বাইচ্ছা-কাইচ্ছায়তো অভাব বুঝে না, কাপড় চোপড়ের লাগি কান্না-কাটি করে। কান্দাকাটি কইরা কয় গত বছর দিছো, ইবার কেনে দিতায় না। বুঝ দিবার লাগি দিমুনে দিমুনে কর মায়ে-বাপে, কাপড়-ছোপড় দিলেতো পূজা ইবার করতোঔ পারতো নায়।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের সরদাবাজ গ্রামের রবীন্দ্র কুমার দাস সোমবার বিকালে বাড়ির উঠোনে বসে কথাগুলো বলে দীর্ঘশ^াস ছাড়ছিলেন।
গ্রামের সার্বজনীন মহামায়া ভ্রাতৃসংঘের প্রতিমার পাশে বসে কথা বলার সময় এগিয়ে আসলেন রবীন্দ্র কুমার তালুকদার নামের আরেকজন। বললেন, দুর্গাপূজায় তিনমাস আগে থেকেই বাজেট নির্ধারণ হয়। গত বছর পূজায় চাঁদা আদায় হয়েছিল প্রায় পাঁচ লাখ টাকা। এইবার ৪২ জন সদস্য কমপক্ষে ২৫ বার বসেছি। দুই লাখ টাকাই মেলানো যাচ্ছে না। বন্যায় মানুষের গোলার ধান পচে নষ্ট। ধান বিক্রি করলে কেউ কিনে না। একমণ ধানে ১০ কেচি চাল হয়। এই চাল খাওয়ার উপযোগী নয়। পূজা করে আসছি, করতে হবে, গত বছর যারা ছয়-সাত হাজার টাকা দিয়েছে, এবার হাজার দেড় হাজারের বেশি দিতে পারছে না। শনিবার ষষ্ঠি, এখনো বাজার করতে পারি নি। আগামীকাল বাজার করার চিন্তা করছি। অন্যান্য বছর গ্রামের শিশু বৃদ্ধ সকলেই নতুন কাপড় কিনে। এবার এই চিন্তা বাদ।
এই দুই রবীন্দ্র কেবল নয়। সরদাবাজ গ্রামের মহাদেবতলা মন্দিরের পূজারী সকলেরই একই চিন্তা কিভাবে এবার দুর্গাপূজা শেষ করা যাবে।
গ্রামের সুভাস চন্দ্র দাস বললেন, চার বছর হয় গ্রামে পূজা হচ্ছে। পূজার আগে উৎসবমুখর পরিবেশ থাকে গ্রামে। এবার এই আমেজ নেই। সকলের চোখে মুখে কষ্টের ছাপ।
গ্রামের সাবিত্রি রানী দাস বললেন, পূজাতো নিয়মরক্ষার জন্য হলেও করতে হবে। অভাব অনটন যাই থাকুক।
জ্যোতিকা রানী দাস বললেন, ‘আমার তিনটা বাইচ্ছাঔ ছোট, চৈতি, উৎস্য ও তুষ্ট তিনটাঔ কাপড়ের লাগি আচলো ধইরা টানের, কয়রাম বাবায় কইছে আনবো-আনবো, কইয়া কইয়া বুঝ দেয়রাম, আর দুইদিন পরে যখন পূজা আইবো, কিতা কইমু বুঝরাম না।’ একই কথা বললেন, গ্রামের শুভ ও সুব্রতের মা সুপ্রভা রানী দাস।
গ্রামের বাসিন্দা অসীম কুমার দাস অসুস্থ্য। প্রতিমা কারিগরের পাশে বসেই সময় কাটছে তার। বললেন, আমার অন্বেষা ও অহনা দুজনই আজকে সকালেও নতুন কাপড়ের লাগি কান্না-কাটি করছে। কি বলে বুঝ দেব তাদেও বুঝতে পারছি না। ঘরের ধান নষ্ট হয়ে গেছে। নিজে অসুস্থ্য কাজ কর্মও করতে পারছি না। টাকা কোথায় পাব।
কেবল সরদাবাজের মহামায়া ভ্রাতৃসংঘের পূজায় এমন দৈনতা নয়। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত জেলার অন্তত ৩০ টি ম-পে এবার আর্থিক দৈনতায় পূজা হবে অনারম্ভর।
সরদাবাজের কয়েক কিলোমিটার দূরের গ্রাম লালারচরের সুবল পাল বললেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামের কেউই এবার ভালো চাঁদা দিতে পারছে না। এজন্য লালারচর যুব সংঘের পূজা কম খরচে করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত বছর মূর্তি তৈরির কারিগর দক্ষিণা (মজুরি) ছিল ৪০ হাজার টাকা। এবার ১৬ হাজার টাকায় মূর্তি করা হচ্ছে।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট বিমান কান্তি রায় বললেন, জেলায় এবার ৪২৪ টি ম-পে পূজা হচ্ছে। এরমধ্যে সুনামগঞ্জ সদর, দোয়ারা, ছাতকসহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার ৩০ ম-পের পূজারীরা আর্থিক কষ্টে আছেন। এই পূজাগুলোয় সরকারি সহায়তা বাড়িয়ে দিলে ভালো হয়। পাশপাশি যেসব ম-পের আর্থিক স্বচ্ছলতা আছে, তারাও যেন ক্ষতিগ্রস্তদের সহয়তায় এগিয়ে যান সেই অনুরোধ করলেন তিনি।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম বললনে, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিটি দুর্গাম-পে এবার ৫০০ কেজি করে চাল দিয়ে সহযোগিতা করা হচ্ছে। বন্যায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কোন এলাকা আলাদা করে দেখা হচ্ছে না। সবাইকে সমানভাবে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।