দুর্নীতিবাজ অধ্যক্ষের হাতেই ফের আর্থিক দায়িত্ব

এনামুল হক, ধর্মপাশা
ধর্মপাশা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মো. আব্দুল করিমের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুর্নীতি সংক্রান্ত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তার এমপিও বাতিল হয়েছে। তবুও তাকেই ওই প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা ও শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন বিলসহ আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। যিনি আর্থিক কেলেঙ্ককারির জন্য এমপিও হারালেন তাকেই আবার আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কলেজের কোনো কোনো শিক্ষকের ঘোর আপত্তি থাকলেও উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের এমন নির্দেশনায় মুখ খুলতে পারছেন না কেউ। ফলে অনেকের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।
অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে শিক্ষক-কর্মচারীদের যা যা অভিযোগ
২০১৯ সালের ২০ অক্টোবর তৎকালীন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবু তালেব অধ্যক্ষ আব্দুল করিমের একটি অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে কলেজে গেলে কলেজের ২৬ জন শিক্ষক-কর্মচারী লিখিতভাবে নানা অভিযোগ তুলে ধরেন। শিক্ষক-কর্মচারীরা অভিযোগ করেন অধ্যক্ষ কলেজের টিউশন ফি, উপবৃত্তি, ভর্তি, রেজিস্ট্রেশন, ফরম পুরণসহ বিভিন্ন খাত থেকে ভুয়া ভাউচার দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা আত্মসাত করেন অধ্যক্ষ। প্রতি বছরই শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মার্কশিট, প্রশংসাপত্র ও সার্টিফিকেট উত্তোলনের সময় অর্থ আদায় করেন। পুনঃভর্তির নামেও চলে অর্থ আদায়। কলেজের উন্নয়ন খাত থেকেও ভুয়া ভাউচার দেখিয়ে টাকা আত্মসাত করেন অধ্যক্ষ। সে ক্ষেত্রে অধ্যক্ষ দুই ধরনের রশিদ ব্যবহার করেন। এক ধরনের রশিদের পুরো টাকা তার পকেটে যায়। দুই অফিস সহকারী ও একজন হিসাব রক্ষককে নিস্ক্রিয় করে রাখেন। ২০১১ সালে তিনি নিয়োগ লাভের পর অদ্যাবদি কোনো ভাউচার ও কলেজের আয় ব্যয়ের হিসাব হিসাব রক্ষক দ্বারা করানো হয় না। ২০১৭ সালের ডিগ্রি পরীক্ষায় ১৭ জন পরীক্ষার্থীর ফরম পূরণের টাকা আত্মসাত করেন অধ্যক্ষ। ফলে প্রবেশপত্র না আসায় ওই পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। পরে অভিভাবকদের চাপের মুখে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩ লাখ টাকা ভর্তুকি দিয়ে ১২ জনের প্রবশেপত্র সংগ্রহ করা হয়। অন্য পাঁচজন আর পরীক্ষা দিতে পারেনি। ২০১৮ সালে চয়ন মিয়া নামের এক ছাত্রের কাছ থেকে বিলম্ব ফি দেখিয়ে ১০ হাজার টাকা আদায় করেন অধ্যক্ষ। একই বছর একাদশ শ্রেণির ভর্তি বাবদ উত্তোলিত টাকা ডিডি ও সকল খরচ বাদ দিয়ে অবশিষ্ট ৭ লাখ টাকা ব্যাংকে জমা না দিয়ে বাংলা বিষয়ের প্রভাষক বরুণ কিশোর চৌধুরী (ভর্তি কমিটির আহ্বায়ক) কাছ থেকে নিয়ে যান অধ্যক্ষ। শুধু তাই নয় অন্যান্য কলেজ থেকে প্রাপ্ত পরীক্ষার কেন্দ্র ফি’র টাকাও নিজের পকেটে ভরেন অধ্যক্ষ। কলেজ সরকারিকরণের সময় কলেজে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের ৩ সদস্যের পর্যবেক্ষক টিম আসলে তাদেরকে দেওয়ার জন্য ৩০ হাজার টাকা দামের তিনটি বোয়াল মাছ ক্রয় করা হয়েছিল। যার টাকা কলেজের সকল শিক্ষক চাঁদার মাধ্যমে দিয়েছিলেন। কিন্তু অধ্যক্ষ দুইটি বোয়াল মাছ ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন এবং আরেকটি মাছ নিজের বাসায় নিয়ে যান। অধ্যক্ষ বছরের ৩৬৫ দিনই আপ্যায়ন বিল দেখান। ২০১৯ সালের ১৭ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত ধর্মপাশা কৃষি ব্যাংক থেকে ভুয়া ভাউচার দেখিয়ে ৮ লাখ ১৯ হাজার টাকা উত্তোলন করে নেন। এর আগের বছর কলেজের টিউশন ফি’র ৬ লাখ ৬৪ হাজার টাকা অগ্রণী ব্যাংকের মোহনগঞ্জ শাখা থেকে উত্তোলন করে কাউকে না জানিয়ে নিয়ে যান।
তদন্তে মিলে অভিযোগের সত্যতা
২০১৯ সালের ১৪ নভেম্বর অধ্যক্ষের এসব অভিযোগের বিষয়ে সরেজমিন তদন্ত করেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের একটি প্রতিনিধি দল। ওই প্রতিনিধি দল তাঁদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, কলেজের আয়-ব্যয়ের হিসাব বিবরণী বই কলেজে পাওয়া যায়নি। উচ্চ মাধ্যমিকের উপবৃত্তি প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি বাবদ প্রাপ্ত টাকা সঠিক ভাবে ব্যয় হয়নি এবং উক্ত টাকা অধ্যক্ষ আত্মসাৎ করেন বলে প্রমাণিত হয়। বিভিন্ন পরীক্ষার ফরম ফিলাপের সময়ে মার্কসীট, প্রশংসাপত্র, ও সার্টিফিকেট বাবদ টাকা নেওয়া হলেও পরীক্ষা পাসের পর আবার শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মার্কসীট, প্রশংসাপত্র ও সার্টিফিকেট বাবদ এবং বিভিন্ন শ্রেণিতে পুনঃভর্তির জন্যও টাকা আদায় করা হয়। এই টাকা অধ্যক্ষ কীভাবে খরচ করেছেন তার সঠিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে সমস্ত অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে উল্লেখ করে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর প্রতিবেদন দেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের উচ্চ মাধ্যমিক উপবৃত্তি প্রকল্পের পরিচালক (রুটিন দায়িত্ব) শ.ম. সাইফুল আলম।
মো. আব্দুল করিমের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দূর্নীতি সংক্রান্ত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ বেসরকারি মাধ্যমিক-৩ এর উপ-সচিব মো. কামরুল হাসান চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে ওই অধ্যক্ষের এমপিও বাতিলের জন্য সুপারিশ করেন। ওই সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর বেসরকারি কলেজ শাখার উপ-পরিচালক মো. এনামুল হক হাওলাদার চলতি বছরের ৭ মার্চ একই দপ্তরের সাধারণ প্রশাসন শাখার উপ-পরিচালককে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা প্রদান করেন এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ মোতাবেক ওই মাসেই এমপিও বাতিল হয় অধ্যক্ষের।
দুই মাস বন্ধ ছিল শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন
অধ্যক্ষের এমপিও বাতিল হলে কলেজের শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন উত্তোলন বেতন উত্তোলন দুই মাস বন্ধ ছিল। তখন শিক্ষকেরা বিষয়টি নিয়ে ইউএনওর সাথে দেখা করে কথা বলেন। ইউএনও কলেজের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা ও শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন বিলসহ আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনার সুষ্পষ্ট নির্দেশনা প্রদানের জন্য গত ১২ এপ্রিল সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দেন। সেই চিঠির প্রেক্ষিতে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের বেসরকারি কলেজ শাখার সহকারী পরিচালক (কলেজ-৩) মো. আব্দুল কাদির গত ৭ মে ইউএনওকে অবগত করেন যে, অধ্যক্ষের এমপিও বাতিল হয়েছে কিন্তু তিনি চাকরিতে বহাল আছেন। তাই কলেজ ও আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনায় অধ্যক্ষের কোনো বাধা নেই। তবে ইউএনও মো. মুনতাসির হাসান জানিয়েছেন, তিনি এ সংক্রান্ত কোনো দাপ্তরিক চিঠি পাননি। অধ্যক্ষ এ রকম একটি চিঠি তাঁকে দেখিয়েছেন।
অধ্যক্ষ মো. আব্দুল করিম বলেন, ‘অর্থ আত্মসাত নয়, এক খাতের অর্থ অন্য খাতে খরচের প্রমাণ মিলেছে। আমার এমপিও বাতিল ও বেতন বন্ধ রয়েছে। কিন্তু চাকরি বহাল আছে। তাই আমাকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।’
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের কলেজ ও প্রশাসন উইং শাখার পরিচালক অধ্যাপক মো. শাহেদুল খবির চৌধুরী বলেন, ‘জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে যিনি সিনিয়র তাকে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু ভারপ্রাপ্ত কাউকে দিতে গেলে তাকে (অধ্যক্ষ) অপসারণ করতে হবে। অধ্যক্ষের পদটি শূন্য না হলে তার পদটি থেকেই যায়।’