দুর্নীতি ঠেকাতে প্রকল্প তৈরি’র আগে যাচাই দাবি

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতি ঠেকাতে প্রকল্প তৈরি’র আগেই আরও বেশি যাচাই-বাছাই করার দাবি জানিয়েছেন কৃষক নেতা, গণমাধ্যমকর্মী ও জনপ্রতিনিধিরা। বুধবার থেকেই পানি উন্নয়ন বোর্ড’এর নিযুক্ত সার্ভে টিম কোথায় বাঁধ কীভাবে হবে এই কাজ শুরু করেছে। কৃষক নেতা ও গণমাধ্যম কর্মীরা বলেছেন, কোথায় বাঁধ দিলে হাওরের ফসল অকাল বন্যা থেকে রক্ষা হবে, কতটুকু উচ্চতায় বাঁধ হওয়া প্রয়োজন, সেটি বিশেষজ্ঞরা যেমন বুঝেন, স্থানীয় কৃষকরাও এর ধারণা দিতে পারেন, এজন্য স্থানীয় কৃষকদের যুক্ত করে এই কাজ করলে ভাল হয়। সুনামগঞ্জের ১৪ শ’ কিলোমিটার হাওর রক্ষা বাঁধের যেখানে যেখানে সংস্কার, মেরামত বা নতুন করে বাঁধ নির্মাণ করা প্রয়োজন তা ৩০ নভেম্বরের মধ্যেই নির্ধারণ করবে জেলা হাওর রক্ষা বাঁধ বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটি। বাঁধ নির্মাণের জন্য এবার ৬৮ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন প্রকৌশলী জানান, এই সপ্তাহের মধ্যেই কোথায় কোথায় বাঁধের কাজ করতে হবে, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ তালিকা করে উপজেলা বাঁধ বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটির কাছে পাঠাবে। এই কমিটি ইউনিয়ন পরিষদের পাঠানো প্রস্তাব যাচাই করবে। পরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিযুক্তিয় দুটি প্রতিষ্ঠান ল্যা- সার্ভে টিম, ঢাকা এবং সার্ভে টেকনোলজি বাংলাদেশ লিমিটেড, এই দুই প্রতিষ্ঠান এসব বাঁধে বাঁধে গিয়ে সার্ভে করে রিপোর্ট জমা দেবে কোথায় কীভাবে বাঁধ হবে। বুধবার সার্ভে টিমের একটি দল ধর্মপাশার হাওরে কাজ শুরু করেছে।
স্থানীয় কৃষক নেতারা বলেছেন, বাঁধ কোথায় হবে, কীভাবে হবে, এটি নির্ধারণ করার সময়ই বেশি সংখ্যক সুবিধাভোগী কৃষককে যুক্ত করতে হবে। না হয় অপ্রয়োজনীয় বাঁধ এবং লুটপাট হবার আশঙ্কা বেশি থাকে।
জেলার শাল্লা প্রেসক্লাবের সভাপতি পিসি দাস বলেন, ২০১৭ সালে জেলার অনেক স্থানেই কিছু অপ্রয়োজনীয় বাঁধ হয়েছে। ২০১৮’ তে অপ্রয়োজনীয় বাঁধের সংখ্যা কমেছে। তবে বাঁধের কাজ শুরু করার আগের পরিমাপ এবং কাজ শেষ করার পরের পরিমাপের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে মিল না থাকায় কোথাও প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি ( পিআইসি) ঠকেছেন। আবার কোথাও বেশি লাভবান হয়েছেন। এ ব্যাপারে আরও সতর্ক হতে হবে।
কৃষক সংগ্রাম সমিতির জেলা সাধারণ সম্পাদক খায়রুল বাশার ঠাকুর খান বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিরা বাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে কোনো কোনো সময় সামগ্রিক লাভের কথা চিন্তা করেন, আবার কোনো কোনো সময় তাঁদের আর্থিক লাভ হবে কিনা, সেটিও ভাবেন, এজন্য বাঁধের কাজ কোথায় কীভাবে হবে, এক্ষত্রে নজরদারী বাড়াতে হবে। সুবিধাভোগী কৃষকদের মতামত নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজটি করা যেতে পারে।
দিরাইয়ের কৃষক নেতা অমর চাঁদ দাস বলেন, বাঁধের কাজে যারা আর্থিকভাবে লাভবান হন, তারা তাদের সুবিধামত বাঁধে বেশি বরাদ্দ আনার চেষ্টা করে। যেখানে প্রয়োজন নেই, সেখানেও প্রকল্প তৈরি করে। যেখানে ২০ হাজার টাকায় হবে, সেখানে ২ লাখ টাকা বরাদ্দ আনার চেষ্টা করে। যেখানে ৫ লাখ টাকা লাগবে, সেখানে ২০ লাখ টাকার প্রকল্প তৈরি করে। এজন্য প্রকল্প তৈরি’র সময়ই গণমান্য স্থানীয় কৃষকদের পরামর্শ নিলে এ ধরনের দুর্নীতি কিছুটা হলেও রোধ হবে।
শাল্লা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল আমিন চৌধুরী বলেন, গত বছর হাওররক্ষা বাঁধ নির্মাণের সময় আমরা দেখেছি, উজানের বাঁধের উচ্চতা বাড়িয়ে দিয়ে নীচের এলাকায় উচ্চতা কম দেওয়া হয়েছে। যেমন শাল্লার নিয়ামতপুর এলাকার বাঁধের উচ্চতা ছিল বেশি, শ্রীহাইল এলাকায় উচ্চতা কম। স্থানীয়রা এটি ঠিক মনে করেন না। স্থানীয়রা মনে করেন ভাটির দিকে উচ্চতা বেশি দিতে হবে। এজন্যই বাঁধ কোথায় হবে এমন প্রকল্প নির্ধারণেও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলতে হবে, আবার উচ্চতা কেমন হবে এই নিয়েও কথা বলা প্রয়োজন।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাবিবুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে যেসব প্রস্তাবনা উপজেলায় যাবে, সেগুলো যাচাই বাছাই করা হবে। আবার সার্ভে টিমগুলোও এগুলো যাচাই করবে। বাঁধের কাজ কোথায় কোথায় হবে, কীভাবে হবে এই বিষয়ে স্থানীয়রাও লিখিতভাবে জেলায়-উপজেলায় পরামর্শ জানাতে পারেন, আমরা গুরুত্ব দিয়ে এগুলো যাচাই করেই কাজ করবো।