দেশ যেন ভবিষ্যতে নতুন করে রাজনৈতিক সংকটে পতিত না হয়

বেশ কিছুদিন যাবৎ বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি স্বাভাবিক ধারা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রধান বিরোধী দল বিনা বাধায় সভা সমাবেশ করছে। সরকারি দল বা অন্য কোনো পক্ষ থেকে তাদের সভা সমাবেশ প- করার চেষ্টা করা হচ্ছে না। গাইবান্ধা উপ নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন নিজেদের স্বাধীন সত্ত্বার প্রমাণ দিয়ে ওই আসনের ভোট গ্রহণ স্থগিত করেছেন। গতকাল দেশব্যাপী কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা ছাড়াই শেষ হয়েছে জেলা পরিষদ নির্বাচন। সরকারি দল রাজনৈতিক ভাষায় কথাবার্তা বলছে। সবকিছু মিলিয়ে গণতান্ত্রিক বাতাবরণের একটা আবহ বেশ বুঝা যাচ্ছে। এই আবহ যদি আগামী নির্বাচন পর্যন্ত বজায় থাকে তাহলে জনগণ খুব স্বস্তি অনুভব করতেন। কিন্তু তা কি হবে? অন্তত একটি বিষয়ে সরকারি ও বিরোধী দল পরস্পর বিপরীতমুখী অবস্থান ধরে রেখেছে, যে কারণে উদ্বেগ কাটছে না। সেটি হলো নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে। বিএনপি’র পক্ষ থেকে সাম্প্রতিক সভা সমাবেশগুলোতে সাফ জানিয়ে দেয়া হচ্ছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ছাড়া আগামী জাতীয় নির্বাচন তারা মানবেন না। এজন্য তারা বর্তমান সরকারকে ক্ষমতা থেকে হঠানোকেই প্রধান কর্মসূচী ভাবছেন। অন্যদিকে সরকারি দল সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় আর ফিরে যাওয়া সম্ভব নয় বলে পরিস্কার ভাবে জানিয়ে দিয়েছে। তাই এখন যে গণতান্ত্রিক পরিবেশ দেখা যাচ্ছে ভবিষ্যতেও যে তা বজায় থাকবে তা বলা কঠিন। এই জন্য সাধারণ মানুষের উদ্বেগ উৎকণ্ঠার কোনো শেষ নেই।
দ্রব্যমূল্যের ক্রমাগত উর্দ্ধগতিতে জনজীবন দিশেহারা অবস্থায় পৌঁছেছে। শুধু খাদ্য কিনতেই হিমশিম খাচ্ছে ৬৮ ভাগ মানুষ। মধ্যবিত্ত ও নি¤œবিত্ত মানুষের জীবন ধারণ করাই এখন অসম্ভব হয়ে উঠছে। সরকার স্বল্পমূল্যে চাল বা এ ধরনের যেসব সহায়তা দিচ্ছে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। মানুষের আয় বাড়েনি বিন্তু ব্যয় বেড়ে গেছে অনেক। এ কারণে যাদের সঞ্চয় ছিলো তারা সঞ্চয় ভাঙছেন, যাদের সঞ্চয় নেই তারা ঋণগ্রস্ত হচ্ছেন। আর যাদের ঋণ করারও ক্ষমতা নেই তাদের ভোগপ্রবণতা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে। সরকারের শীর্ষমহল থেকে ২০২৩ সনে অর্থনীতির চরম দুরবস্থার ইঙ্গিত দেয়া হচ্ছে। অর্থনৈতিক দুরবস্থা সামলিয়ে উঠার জন্য দরকার একটি স্বস্তিদায়ক রাজনৈতিক পরিবেশ। দেশের ভিতরে যদি প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস ও বৈরি সম্পর্ক বজায় থাকে তাহলে দুরবস্থা কাটিয়ে উঠার প্রচেষ্টাও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আগামী বছরটি এরকম এক সংকট নিয়েই অতিবাহিত হবে বলে অনুমিত হয়।
পাঁচ বছর পর নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণ একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। এই নির্বাচন করতে গিয়ে কোন্ পদ্ধতি অনুসৃত হবে, বর্তমান সরকার নাকি অন্যকোনো প্রকারে নিরপেক্ষ সরকার থাকবে; সেটি রাজনৈতিক দলগুলোকে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে স্থির করতে হবে। এজন্য সংলাপের কোনো বিকল্প নেই। রাজপথের আন্দোলনের পাশাপাশি এই সংলাপ যদি কার্যকরভাবে চালু থাকে তাহলে আমাদের বিশ্বাস বর্তমান বিরোধের একটি মিমাংসায় আসা সম্ভব। জনসাধারণ চায়, কোনো ধরনের সহিংস বা উত্তপ্ত পরিস্থিতি ছাড়া সামনের নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হোক। কারণ ক্ষমতায় কারা আাছেন বা কারা আসবেন এই প্রশ্নের চাইতেও জরুরি বিষয় হলো নিজেদের জীবন যাপনের প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করা। আর বর্তমান অর্থনতিক সংকট শুধু জাতীয় বিষয় নয়। এটি আন্তর্জাতিক মহামন্দার প্রভাব। আমরা চাইব মানুষের কল্যাণের জন্য রাজনীতি করা দলগুলো ক্ষমতায় যাওয়া-আসার চিন্তা পরিত্যাগ করে দেশের অর্থনৈতিক বিপর্যয় কাটানোর বিষয়টিকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে ভাববেন। তাহলে মানুষ গভীরভাবে সন্তুষ্টি লাভ করবে। এই দেশটি যেন ভবিষ্যতে নতুন করে আর কোনো রাজনৈতিক সংকটে পতিত না হয় এই আমাদের কামনা।