দ্রব্যমূল্যের বাজার চড়া, চাহিদার চেয়ে টিসিবির পণ্য কম

বিশেষ প্রতিনিধি ও আকরাম উদ্দিন
গেল ঈদের পর থেকেই তেলের দাম নাগালের বাইরে। পনের দিনের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম দিগুণ বেড়েছে। প্রতি ৫ লিটারে তেলের দাম বেড়েছে কমপক্ষে ২০ টাকা। এই চড়া মূল্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে সরকার টিসিবির (ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ) পণ্য বিক্রয় শুরু করেছে। মানুষের আস্থাও টিসিবি’র পণ্যের উপর। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী পাওয়া যাচ্ছে না টিসিবি’র পণ্য। অবশ্য, টিসিবির সিলেট বিভাগীয় আঞ্চলিক অফিস থেকে দাবি করা হয়েছে, ৬ জুন থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৪ গাড়ী টিসিবির পণ্য সুনামগঞ্জে বিক্রির জন্য দিয়েছেন তাঁরা। ক্রেতাদের দাবি টিসিবির পণ্য কালে ভদ্রে পাওয়া গেলেও মালামালের চেয়ে ক্রেতা বেশি।
জেলা প্রশাসকের বাজারশাখা সূত্রে জানা গেছে, ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)’এর সুনামগঞ্জের ডিলার ৭ উপজেলায় ১৫ জন। ভ্রাম্যমাণ ট্রাকসেল কার্যক্রমের আওতায় চিনি, মশুর ডাল, সোয়াবিন তৈল, পেয়াজ কেজি দরে বিক্রি করেন ডিলারেরা।
জেলা প্রশাসনের বাজার শাখায় থাকা ডিলারদের তালিকার মধ্যে রয়েছে সদর উপজেলার ডিলার মেসার্স মেহেদী এন্টারপ্রাইজের মো. এনামুল হাসান, ছাতক উপজেলার রাজাপুর বাজারের মেসার্স মামুন এন্টারপ্রাইজের আপ্তাব উদ্দিন, জাউয়াবাজার বড়গলির মেসার্স আলী ভেরাইটিজ স্টোরের ফয়জুল করীম, আলীগঞ্জ বাজারের মেসার্স হাসনাত ট্রেডার্সের আবুল হাসনাত, বুরাইগাঁওয়ের মেসার্স শমসের এন্টারপ্রাইজের এস.এম দেলোয়ার হোসেন চয়ন, জগন্নাথপুর উপজেলার ডিলার মেসার্স পলাশ ট্রেডার্সের ধনেশ চন্দ্র রায়, রাণীগঞ্জ বাজারের ডিলার মেসার্স সুমন ট্রেডার্সের মো. জবরুল ইসলাম ও মেসার্স সোহেল ট্রেডার্সের সোহেল মিয়া, কেউনবাড়ি বাজারের মেসার্স শাহ মিয়াধন ট্রেডার্স, দিরাই উপজেলার ডিলার দিরাই বাজারের মেসার্স ষ্টার এন্টারপ্রাইজের মো. শাহিন মিয়া, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার নোয়াখালি বাজারের মেসার্স সেবা টেলিকমের মো. রুবেল মিয়া, শাল্লা উপজেলার মদনপুর বাজারের মেসার্স শ্রীপালি ভান্ডারের রনজিত দাস, দোয়ারাবাজার উপজেলার আমবাড়িবাজারের মেসার্স দূর্গা ভান্ডারের কৃপা সিন্ধু দাস, দোয়ারা বাজারের মেসার্স বিনয় ট্রেডার্সের বিনয় চক্রবর্তী, বাংলা বাজারের মেসার্স হাজী সামসুল হক এন্ড সন্সের হাজী সামসুল হক।
টিসিবি সূত্রে জানা গেছে, করোনা পরিস্থিতিতে ভোক্তাদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে সারাদেশে সারাদেশে চিনি, ডাল ও তেল বিক্রয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে গেল ৬ জুন থেকে। ১৭ জুন পর্যন্ত এই কার্যক্রম চলবে। টিসিবির ট্রাক থেকে প্রতি কেজি চিনি পাওয়া যাবে ৫৫ টাকায়, যা একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ চার কেজি কিনতে পারবেন। এছাড়া প্রতি কেজি মসুর ডাল পাওয়া যাবে ৫৫ টাকায়, যা একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ দুই কেজি কিনতে পারবেন। এছাড়াও সয়াবিন তেল ১শ টাকা লিটারে একজন ক্রেতা দুই থেকে সর্বোচ্চ ৫ লিটার নিতে পারবেন।
সুনামগঞ্জ শহরের একাধিক ক্রেতা জানান, টিসিবির পণ্য ৬ জুন থেকে জেলা শহরে বিক্রয়ের ঘোষণা দেখেছি বিভিন্ন গণমাধ্যমে, কিন্তু বাস্তবে ৬ বা ৭ জুন সুনামগঞ্জ শহরের কোথাও মালামাল পান নি তারা।
শহরের উকিলপাড়ার মিজানুর রহমান সুমন জানান, টিসিবির পণ্য একদিন পেয়েছিলাম, মালামাল কিনতে যারা দাঁড়িয়ে ছিলেন বেশির ভাগেরই চাহিদা ছিল সোয়াবিন তেল কেনার, ডিলার অর্ধেক মানুষকেও তেল দিতে পারেন নি।
ক্রেতা আনোয়ার হোসেন বলেন, টিসিবি’র পণ্য এখন বাজারে পাওয়া যায় না। মালামাল তুলে ডিলারেরা সামান্য কিছু বিক্রি করেন। অন্য মাল কী করেন প্রশাসনের খেয়াল রাখা জরুরি।
দিরাই সড়ক মোডের ব্যবসায়ী মেসার্স মেহেদী এন্টার প্রাইজের মালিক এনামুল হাসান সুনামগঞ্জ শহরের টিসিবি ডিলার। জানালেন, গত ৬ জুন টিসিবির চিনি, ডাল, তেল এনে শহরের জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে ট্রাক রেখে বিক্রি করেছেন তিনি। তার মতে মালামালের চেয়ে এবার ক্রেতা অনেক বেশি। পণ্য দিয়ে চাহিদা মেঠাতে পারছেন না তারা। ৬ তারিখের পর আর এখনো (শুক্রবার) পর্যন্ত কোন মালামাল পান নি তিনি। তিনি জানান, গত ৬ জুন শেরপুরের টিসিবি অফিস থেকে ১ হাজার লিটার তৈল, ৭ শত কেজি চিনি, ডাল ৪ শত কেজি পেয়ে বিক্রি করেছেন তিনি ।
দোয়ারাবাজারের মেসার্স বিনয় ট্রেডার্সের বিনয় চক্রবর্তী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আমাকে মালামাল দেওয়া হচ্ছে না। এজন্য উপজেলায় বিক্রিও করতে পারছি না।
ছাতকের রাজাপুর বাজারের ডিলার আপ্তাব উদ্দিন এবং একই উপজেলার আলীগঞ্জ বাজারের আবুল হাসনাত জানান, দীর্ঘদিন ধরে তারা নানা কারণে মাল আনা বন্ধ করে দিয়েছেন। জানালেন, নিয়মিত মাল না পাওয়ায় তারা টিসিবির মালামাল আনা বন্ধ করে দেন।
ছাতক উপজেলার রাজাপুর বাজারের ডিলার মেসার্স মামুন এন্টারপ্রাইজের আপ্তাব উদ্দিন জানান, টিসিবি’র বিভাগীয় কার্যালয় শেরপুর। সেখান থেকে মালামাল এনে পরিবহন ভাড়া দিয়ে লাভ খুবই কম হয়। মালের মানও অনেক সময় ভালো থাকে না, এজন্য মাল আনতে আগ্রহ নেই তার। মাঝে মাঝে জেলা প্রশাসনের চাপে মাল তুলেন।
ছাতক উপজেলার জাউয়াবাজার বড়গলির মেসার্স আলী ভেরাইটিজ স্টোরের ফয়জুল করীম বলেন, আমরা প্রতি মাসে একবার বরাদ্দ পাই। গত রমজানের পর থেকে এখনও বরাদ্দ পাইনি।
আলীগঞ্জ বাজারের মেসার্স হাসনাত ট্রেডার্সের আবুল হাসনাত বলেন, আমি দুই বছর আগে টিসিবি’র মাল আনা বাদ দিয়েছি। মাল আনলে পরিবহন ভাড়া দিয়ে লোকসান গুনতে হয়।
জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ও বাস্তবায়ন কমিটি (ক্যাব) এর সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আওয়াল বলেন, রমজানের পর থেকে টিসিবি’র পণ্য বাজারে দেখা যায় নি। শুনেছি টিসিবি’র পণ্য সব ক্রেতাদের দেওয়া হয় না। ডিলাররা নিজেরা বিক্রি করেন চুপিসারে। প্রশাসনের এসব বিষয়ে নজর রাখা জরুরি।
টিসিবির সিলেট অঞ্চলের আঞ্চলিক প্রধান মো. ইসমাইল মজুমদার বললেন, ৬ জুন থেকে সুনামগঞ্জ জেলায় ১০ জন ডিলারকে ১০ ট্রাক চিনি, ডাল ও তেল দেওয়া হয়েছে। সুনামগঞ্জ শহরে বিক্রির জন্য বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৪ ট্রাক মালামাল দেওয়া হয়েছে। টিসিবির পণ্যের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই জানিয়ে তিনি বলেন, এবার প্রেস কোম্পানী’র চিনি, তীর কোম্পানীর ডাল এবং বসুন্ধরা ও পুষ্টি কোম্পানীর তেল দেওয়া হচ্ছে।