দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি : মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্তের বাজেটে টান

স্টাফ রিপোর্টার
‘আধা লিটার তেল আছে নি? আধা লিটার তেল আছে নি?’ এভাবেই জগন্নাথ বাড়ি রোডের নিত্য প্রয়োজনীয় প্রত্যেকটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আধা লিটার সয়াবিন তেল খোঁজছিলেন সুনামগঞ্জ পৌর শহরের বাসিন্দা বাহার উদ্দিন (৫০)। বেশিরভাগ দোকানে রয়েছে দুই লিটার, পাঁচ লিটারের বোতল।
বেশ কয়েকটি দোকানে খোঁজার পর মেসার্স জয় পাল’র দোকানে পেয়েছেন তিনি আধা লিটার বোতলের সয়াবিন তেল। তেল পেলেও আধা লিটার সয়াবিন তেলের দাম দিতে হয়েছে ১০৫ টাকা। দোকানদারও বললেন, ১০৩ টাকা দিয়ে কিনে আনতে হয়েছে। খানিকটা আক্ষেপের সাথেই পকেট থেকে ১০৫ টাকা বের করে আধা লিটার সয়াবিন তেল কিনে নিলেন বোরহান উদ্দিন।
বোরহান উদ্দিন পেশায় একজন ছোটো খাটো ফল ব্যবসায়ী। শহরের ফল মার্কেটে সারাদিন খেটে ফল বিক্রির পর যেটুকু আয় করতে পারেন হু হু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধিতে তা দিয়ে পেট চালানো দায় হয়ে পড়ছে এখন তার।
কথা হয় বোরহান উদ্দিনের সাথে, তিনি জানালেন ১ ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে সংসার। আগে সপ্তাহে মাসে একদিন ব্যাগ ভরে বাজার করলেও এখন প্রত্যেকদিন একটা দুটা পণ্য কিনে সংসার চলে। দু লিটার, পাঁচ লিটার সয়াবিন তেলের বোতলের জায়গায় আধা লিটার তেল খোঁজতে অনেকটা ইতস্তত বোধ করেন তিনি। কিন্তু উপায় না থাকায় বাধ্য হয়েই একটু একটু করে বাজার সদাই করতে হচ্ছে তাকে। কারণ অতিপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম দিন দিন বাড়লেও তার আয় বাড়ে নি। সারাদিন ফল বিক্রি করে আগে যা আয় করতেন, এখনো একই আয়। কিন্তু সংসারের খরচ বেড়েছে দ্বিগুণ। এই অবস্থা শুধু বোরহান উদ্দিনের নয়, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত ও হত দরিদ্র পরিবারের। নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিসের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি যেন ‘মরার উপর খাঁড়ার ঘাঁ’।
সরেজমিনে বুধবার শহরের বিভিন্ন মার্কেট ঘুরে দেখা যায়, ঈদের আগে প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম ছিলো ৩০ টাকার কম। এখন প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকায়। একই সাথে রসুনের কেজিতে দাম বেড়েছে ২০ টাকা। ডাল ঈদের আগের ছিলো ৯০ থেকে ৯৫ টাকা কেজি, এখন বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকায়। সবচেয়ে বেশি মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে সয়াবিন তেলের। ঈদের আগ পর্যন্ত সয়াবিন তেল বিক্রি হয়েছে ১৬০ টাকা লিটার, আর এখন বিক্রি হচ্ছে ১৯৮ টাকা লিটার। কেজি প্রতি ৩৫ টাকা থেকে বেড়ে ৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে আটা। এছাড়াও মুদি দোকানের প্রায় সব পণ্যের দাম কেজি প্রতি ৫—১০ টাকা হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বণিক ব্রাদার্সের প্রদীপ বণিক বলেন, দবাজারে সবতার দাম খালি বাড়ের। অন্যদিকে সুনামগঞ্জের অনেকের ধান পান লইয়া দৌঁড়ও আছে। ক্রেতা তো এমনিতেই কমিযার। আগে যারা ৫ লিটার তেল কিনতো অখন ওই দামে দুই লিটারও পাওয়া যায় না। টানাটানি হকলেরই।
এদিকে কাঁচা বাজারও অস্থিতিশীল। এ সপ্তাহে টমোটো পাইকারী ৪৫—৫০ টাকা কেজি, খুচরা ৬০ থেকে ৭০ টাকা, মরিচ ৭০—৮০ টাকা প্রতি কেজি, আলুর দাম কেজিতে বেড়েছে ২ টাকা, এছাড়াও কাকরুল, বেগুন, সিসিন্দা, পটলসহ সব সবজির দাম কেজি প্রতি ১০—১৫ টাকা করে বেড়েছে।
ময়নার পয়েন্টের বাসিন্দা লিমন আহমেদ (৩৫) সবজি কিনতে এসে বললেন, সবজির দাম শুনে মাথা হ্যাঙ হয়ে আছে। সব সবজির দাম ৫০—৬০ টাকার আশেপাশে। কিছু কিছু সবজি ৬০ টাকার উপরে। বাজেটে কুলাচ্ছে না, তাই চিন্তা করছি বাসাত গিয়া ডাল ভাত খেতে হবে। তবে ডালের দামও বাড়তি।
মা স্টোরের মালিক জানান, দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়ে কমে, নির্দিষ্ট থাকে না। দেশ জুড়েই এই সমস্যা চলছে। ঢাকা পণ্যের দাম কমলে আমরাও কম দামে বিক্রি করতে পারবো। বাজারে তেলটাই বেশি সমস্যা, গত সপ্তাহে কোন তেল দোকানে ছিল না। যা অর্ডার করি তার অর্ধেক তেলও পাওয়া যায় না। ১০০ লিটার তেল অর্ডার করেছি, যদি পাই তা হলে দোকানে ক্রেতা ধরে রাখতে পারবো।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, বাজারে কঠিন মনিটরিং আছে আমাদের। ভোক্তা অধিকারেরসহ নানা মাধ্যমে বাজারের খেঁাজ খবর রাখছি। আমরা ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করতে চাই। কোন অসাধু ব্যবসায়ী যদি মওজুদ করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে চান তাকে ছাড় দেওয়া হবে না। নাগরিকদেরও এই বিষয়ে সহযোগিতা চাই আমরা।