ধর্মপাশা ও মধ্যনগরে কর্মসৃজন কর্মসূচি বন্ধ/ ৫ বছর আগের পরিসংখ্যান বর্তমানে প্রাসঙ্গিক নয়

দারিদ্রতা হ্রাস পাওয়ার কারণে জেলার ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলায় কর্মসৃজন কর্মসূচির বরাদ্দ বন্ধ রয়েছে বলে গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়। সংবাদটি খুশির খবর হতে পারত যদি সত্যিকার অর্থে ওই উপজেলা দু’টি দারিদ্রতার ভয়াল অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে পারত। কিন্তু বাস্তবের সাথে এর কোনো মিল খুঁজে পাওয়া সত্যিই কঠিন। সরকারের নিয়ম অনুযায়ী যেসব এলাকায় দারিদ্রতার হার ২০% এর উপরে সেখানে কর্মসৃজন কর্মসূচির বরাদ্দ দেয়া হয়। কিন্তু পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৬ সনের খানা আয়-ব্যয় জরিপ অনুসারে সাবেক ধর্মপাশা উপজেলার দারিদ্রতার হার ১৭.৮ শতাংশে নেমে আসে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর বিভিন্ন জরিপ নিয়ে মাঝেমধ্যে প্রশ্ন উঠে। সঠিকভাবে তথ্য চয়ন করে জরিপ না করার বিষয়েও অনেক কথা আছে। জরিপের সাথে যখন বাস্তবতার মিল পাওয়া যায় না তখনই এ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। যে কারণে ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলার দারিদ্রতার হার কমিয়ে দেখানোর বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। একটি পরিসংখ্যানের কারণে যখন বড় একটি এলাকার গরিব মানুষের সাময়িক কর্মসংস্থানের জন্য বাস্তবায়িত সরকারি কর্মসূচির বরাদ্দ বন্ধ হয়ে বেকারত্ব সমস্যাকে প্রকট করে তুলে, পাশাপাশি ছোটকাঠো উন্নয়ন কাজের সুযোগ বন্ধ হয়; তখন ওই তথ্যের ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠা খুব স্বাভাবিক। ধর্মপাশা উপজেলার উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা জানিয়েছেন, উপজেলা পরিষদের সমন্বয় সভায় এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে এবং পুনরায় প্রকল্পটি চালুর অনুরোধ জানিয়ে প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তার মানে হলো, খোদ উপজেলা পরিষদ দারিদ্রতা কমার ওই পরিসংখ্যানের উপর আস্থা রাখেননি এবং তারা মনে করেন এখনও উপজেলা দুইটিতে কর্মসৃজনের কাজ শুরু করা আবশ্যক। সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিকও এই সিদ্ধান্তের সাথে দ্বিমত জানিয়েছেন বলে সংবাদভাষ্য অনুসারে জানা যায়।
জাতীয়ভাবে গত দুই বছরে বাংলাদেশে দারিদ্রতার পরিমাণ বেড়েছে বলে বিভিন্ন পরিসংখ্যানে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। করোনার অভিঘাতের ফলে দারিদ্রতা বাড়ার বিষয়টি এখন সর্বজন স্বীকৃত। এর উপর হাওরাঞ্চলে গতবছর ব্যাপকভাবে বোরো ফসল হানি ঘটেছে। এ বছর ইতিহাসের ভয়াবহ বন্যায় সুনামগঞ্জ জেলা বিশাল ক্ষতির শিকার হয়েছে। করোনা, ফসল হানি ও বন্যার কারণে জেলার সর্বত্র মানুষের আয় কমেছে, কর্মচ্যুতি ঘটেছে, সম্পদ হানি হয়েছে; এসবের যোগফল স্বরূপ দারিদ্রতা বাড়ার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ। কোনো ধরনের পরিসংখ্যান ছাড়াই সাদা চোখে এই বাস্তবতা দৃশ্যমান। সর্বোপরি এখন দ্রব্যমূল্যের সীমাহীন উর্দ্ধগতি দারিদ্রতার প্রকোপ নিঃসন্দেহে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এরকম অবস্থায় একটি অপূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে বহু বছর ধরে চলে আসা কর্মসূচিটি বন্ধ করে দেয়া নিতান্তই দুর্ভাগ্যজনক। আমরা জানি না, জেলার আর কোন কোন উপজেলায় এভাবে কর্মসৃজন কর্মসূচির বরাদ্দ বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে ধর্মপাশা বা মধ্যনগর উপজেলার বাইরে আরও উপজেলা এরকম থাকতে পারে।
কর্মসৃজন প্রকল্প কেবল অভাবের সময়ে গরিব মানুষকে সাময়িক কর্মসংস্থানের মাধ্যমে সহায়তা কর্মসূচিই নয়, বরং এই কর্মসূচির মাধ্যমে বেশকিছু ছোটখাট উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজও বাস্তবায়িত হয়। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে নানা ধরনের অসংখ্য অভিযোগ ও দুর্নীতির সুনিশ্চিত তথ্য থাকলেও মোটাদাগে এটি চালু রাখার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কর্মসূচির শরীর থেকে দুর্নীতির পচা ঘা শুকিয়ে জনবান্ধব চরিত্র নিয়ে বাস্তবায়ন করা হলে একদিকে বহু গরিব মানুষ কিছুদিন কাজ করার সুযোগ পায় অন্যদিকে গ্রামীণ অবকাঠামোর কিছু উন্নয়নও ঘটে। তাই সরকারের প্রতি আমাদের অনুরোধ, দারিদ্রতা হ্রাসের ২০১৬ সনের পরিসংখ্যানটি ভুলে গিয়ে করোনা পরবর্তী দারিদ্রতা বাড়ার তথ্য আমলে নিয়ে বন্ধ হওয়া উপজেলাগুলোতে পুনরায় এই কর্মসূচি চালু করুন।