নদীপথ দখল করে মাছ শিকার এই প্রবণতা বন্ধ করতে হবে

সুরমা নদীর বিভিন্ন অংশে নদীর প্রায় অর্ধেক দখল করে অবৈধভাবে মাছ শিকার করছেন কিছু লোক। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, সুরমা নদীর সদর ও দোয়ারাবাজার উপজেলার অনেকগুলো স্পটে বিভিন্ন ব্যারিকেড তৈরি করে নদীর অর্ধেকাংশ নিজেদের দখলে রাখেন মাছ শিকারীরা। নদীর ওই দখলীকৃত অংশে কোনো নৌযান চলতে পারে না। ফলে নৌ চলাচলের জন্য নদীপথ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। নৌ শ্রমিকরা নদী পথের এই সংকুচনের ফলে নৌ চলাচলে নানাবিধ সমস্যা মোকাবিলা করছেন বলে জানিয়েছেন। কখনও যদি কোনো নৌযান ভুল করে মাছ শিকারীদের বেঁধে দেয়া সীমানার ভিতর ঢুকে পড়ে তাহলে তুলকালাম হয়ে যায়। নৌযানের চালকদের এ কারণে মাছশিকারীরা মারধরও করেন। অন্যদিকে নদীপথ ছোট হয়ে আসায় নৌযানগুলোকে দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়। নৌপথের এই দখলিকরণ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষের কোনো ধরণের পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। বরং অবৈধ মাছ শিকারীদের প্রতি একধরণের প্রশয়মূলক মনোভাবই লক্ষ্য করি আমরা। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট খবরে সুনামগঞ্জের জেলা মৎস্য কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করা হয়েছে। তিনি বলছেন, ‘মাছ শিকারের সময় মাছ তো শিকার করবেই। মাছ শিকার না করলে খাবে কি। সমস্যা হবে কেউ মাছের পোনা শিকার করলে।’ এই যখন বক্তব্য হয় এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার তখন আর বলার কিছু থাকে কি? মুক্ত নদীতে মাছ ধরার সরকারি বিধিমালা কী, মাছ ধরতে হলে সরকারের কাছ থেকে নদীর অংশবিশেষ ইজারা নিতে হয় কিনা, এখানে আদৌ পোনা মাছ মারা হয় কিনা তা দেখার জন্য কী নজরদারি রয়েছে; এসব বিষয় উপেক্ষা করে তিনি অবৈধ মাছ শিকারের পক্ষে সাফাই গাইলেন। জেলার ওই কর্মকর্তার বক্তব্যের বিপরীতে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা, দোয়ারাবাজারের বক্তব্যকে আমাদের কাছে দায়িত্বশীল মনে হয়েছে। তিনি সরেজমিনে গিয়ে নদীর চলাচলের পথে জাল পেতে রাখার দৃশ্য দেখতে পেয়ে জালগুলো তোলে ফেলার জন্য নির্দেশ দেন। কিন্তু মাছ শিকারীরা তার নির্দেশ মানেননি। তিনি এই অবৈধভাবে পেতে রাখা জাল অপসারণের জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সহকারে অভিযান পরিচালনার কথা বলেছেন।
নদী দখলের এমন দৃশ্য নদীপথে সবসময় দেখা যায়। আগে মাছ শিকারের জন্য নদীর অংশবিশেষ ইজারা দেয়া হতো। মাছের বংশবিস্তারের জন্য এখন সেরকম কোনো ইজারা দেয়া হয় না। এর ফল হয়েছে উল্টো। মাছের বংশ বিস্তার তো ঘটছেই না। বরং যে যার মতো করে যেখান থেকে ইচ্ছা সেখান থেকেই মাছ আহরণ করছেন। নদীপথে এরকম ব্যারিকেড তৈরি করে মাছ শিকার করা স্পষ্টতই অবৈধ কর্মকা-। এরকম কর্মকা- নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সার্বক্ষণিক প্রতিকারমূলক ব্যবস্থার মধ্যে থাকতে হয়। দুঃখজনক বিষয় হলো, সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো এ বিষয়ে নিদারুণ অবহেলা দেখিয়ে চলেছেন। এই অবহেলার সুযোগে নদী দখল করে মাছের বংশ নাশের কর্মকা- কেবল বাড়ছেই। দেশে মিঠা পানির মাছের দারুণ আকাল দেখা দিয়েছে। বহু প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। চাষের মাছের প্রতি অধিক মনোসংযোগের কারণে আমাদের চিরাচরিত ঐতিহ্যের মিঠাপানির মাছকে রক্ষার ব্যাপারে অনীহা দেখানো হচ্ছে। এই ধরনের কাজ একসময়ে সাংঘাতিক অবিবেচক কর্মকা- হিসাবে বিবেচিত হবে। ততক্ষণে সময় পেরিয়ে যাবে। তখন করার কিছুই থাকবে না। অথচ এই মিঠাপানির মাছ বাঙালির সামাজিক জীবনাচরণের সাথে সম্পর্কিত। ঘরের ঠাকুর ফেলে পরের কুকুর পোষার মতো আমরা যতই দেশীয় প্রজাতির মাছকে উপেক্ষা করে চাষের মাছকে গুরুত্ব দেই না কেন তা কেবল আমাদের দৈনতাকেই প্রকট করে তোলবে।
সুরমা নদীর যেসব স্পট অবৈধভাবে দখল করে মাছ শিকার করা হচ্ছে অবিলম্বে তা বন্ধ করার জন্য আমরা অনুরোধ জানাই।