নারী ফুটবলারদের সাফ জয় অদম্য নারী শক্তির পথ ধরে

এগিয়ে যাক ফুটবল
নেপালের দশরথ স্টেডিয়ামে সোমবার বাংলার মেয়েরা ইতিহাস রচনা করলো। এদিন তাঁরা সাফ মহিলা ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ লড়াইয়ে শক্তিশালী ও স্বাগতিক নেপাল নারী দলকে ৩-১ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। গত কয়েক বছর ধরেই বয়সভিত্তিক বিভিন্ন ফুটবল টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের নারী ফুটবল দল দক্ষিণ এশিয়ায় বেশ ভালো ফলাফল করছিল। কোচ ছোটনের তত্ত্বাবধানে নারী ফুটবলাররা নিজেদের দক্ষতা বাড়িয়ে তুলছিলেন, এরই ফলাফল পাওয়া গেলো সোমবার। সাবিনা, রুপনা, কৃষ্ণা, শামসুন্নাহার, সানজিদাদের নৈপুণ্যে বাংলাদেশ প্রত্যাশামতেই চ্যাম্পিয়নশিপের গৌরবমুকুট মাথায় পড়ল। এই অদম্য নারী ফুটবল দলকে আমাদের প্রাণখোলা অভিনন্দন।
যদিও বিশ্ব ফুটবলের তুলনায় দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবল মান একেবারেই নীচের দিকে, তবুও এই অর্জনকে ম্লান করে দেখার কিছু নেই। যখন বৈশ্বিক বাস্তবতায় নারীদের অবদমিত করে রাখার সচেতন প্রক্রিয়া আমাদের সমাজে ভীষণভাবে ক্রিয়াশীল তখন নারীদের এই অর্জন ওই অবদমিত করে রাখার পুরুষতান্ত্রিক অহম বোধের বিরুদ্ধে সুতীব্র প্রতিবাদও বটে। সুযোগ পেলে নারীরা যে যেকোনো কাজেই সফলতা দেখাতে সক্ষম তা বারবার প্রমাণ করা সত্ত্বেও নারীদের মানুষ হিসাবে ভাবার চিন্তা করার মানসিকতা আমরা এখনও অর্জন করতে পারিনি। সাবিনাদের এই বিজয় যদি আমাদের চিন্তার জগতে সামান্য হলেও পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করে তাহলে সেটাই হবে এই বিজয়ের প্রকৃত মাহাত্ম্য। লক্ষ্য করার বিষয় হলো, বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের প্রায় সকল সদস্যই বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে এসেছেন। তাঁরা কেউই সোনার চামচ-বাটি নিয়ে জন্মগ্রহণ করেননি। বরং অনেকেই দারিদ্রতার করাল রূপ দেখতে দেখতে বড় হয়েছেন। অভিজ্ঞ কোচ ছোটন এদের প্রতিভাকে আবিষ্কার করতে পেরেছেন, ঘষামাজার করে এদের লুক্কায়িত দক্ষতার জৌলুষ উদ্ধার করতে পেরেছেন। ছোটন এজন্য বিশেষভবে অভিনন্দন পাওয়ার যোগ্য। আরেকটি কথা, দারিদ্রতা বা আর্থিক অস্বচ্ছলতা কখনও কারও অযোগ্যতা হতে পারে না, বরং ছাইয়ের নিচেই সোনা চাপা থাকে এই সত্যকে আজ প্রমাণ করল নারী ফুটবলাররা। আমাদের চিন্তার জগতে এও আরেক ধাক্কা দেয়ার মতো বিষয় বটে।
বাংলাদেশে এমনকি বৈশ্বিকভাবেও ফুটবল সবচাইতে জনপ্রিয় খেলা। অথচ আজকাল আমাদের দেশে এই জনপ্রিয় খেলাটিকে যথেষ্ট পরিমাণে অবহেলা করা হচ্ছে। মফস্বলে প্রাতিষ্ঠানিক ফুটবল চর্চা ও নিয়মিত প্রতিযোগিতামূলক লিগ আয়োজনে কর্তৃপক্ষের অনীহা লক্ষ্য করা যায়। আমাদের জেলা সুনামগঞ্জে একটি স্টেডিয়াম আছে, একটি শক্তিশালী ফুটবল ফেডারেশন আছে। কিন্তু ফুটবল কই? নারী ফুটবলারদের প্রতিযোগিতামূলক টুর্নামেন্ট দূরস্ত, ছেলেদের ফুটবলের আয়োজনও নেই। প্রাথমিক বিদ্যালয়ভিত্তিক বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা নামাঙ্কিত ছেলে ও মেয়েদের দুইটি পৃথক টুর্নামেন্ট ছাড়া ফুটবল ফেডারেশনের উদ্যোগে মূলত আর তেমন কোন প্রতিযোগিতা আমাদের চোখে পড়ে না। যেখানে খেলা নেই, চর্চা নেই সেখানে ফুটবলার বেরিয়ে আসবে কোত্থেকে ? বাংলার নারী ফুটবল দল যখন সাফ চ্যাম্পিয়ন হলো তখন এইসব প্রশ্ন গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। আমাদের প্রতিভার অভাব নেই। যেটি আছে তা হলোÑ উদ্যোগ ও পরিকল্পনার অভাব। আমরা চাই ফুটবলের পুনর্জাগরণ। এই জনপ্রিয় খেলায় অন্তত আমাদের এশিয়া সেরা হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এশিয়া জয়ের দ্বার খুললে বৈশ্বিক ফুটবলেও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান তৈরির সুযোগ পাওয়া যাবে। তবে এর আগে ফেডারেশনের আমলাতান্ত্রিক চরিত্র সর্বস্ব কর্তাব্যক্তিদের মানসিকতার ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটিয়ে ফুটবলের প্রসারে উপযুক্ত ভূমিকা রাখতে হবে।
অবদমিত ও অবরুদ্ধ নারী ফুটবলাররা একটি বিজয়ের মাধ্যমে পুরো নারী সমাজের মনে যে অভূতপূর্ব আনন্দ ও পরিবর্তনের একটি তরঙ্গ এনে দিলেন তাতে জনগোষ্ঠীর অর্ধেক নারী সমাজ মানুষ হিসাবে বিবেচিত হওয়ার পরিবেশ পাক, আমরা এমনটাই কামনা করি। আর কেবলমাত্র তাহলেই নারী ফুটবলারদের এই জয় মহিমান্বিত হবে।