নির্বাচনে টাকার খেলা ও প্রবাসী মনস্তত্ত্ব

নির্বাচনে টাকার খেলা অনেকটা নিষিদ্ধ সম্পর্কের মতো গোপনীয়। নিষিদ্ধ সম্পর্কে পরষ্পরের এক ধরনের সম্মতি থাকে কিন্তু কেউই বাইরে এটি প্রকাশিত হোক চায় না। এরা নিজেরা নিজেরা সম্পর্কের মধু আহরণ করে পরিতৃপ্ত হয়। এই ধরণের মৌতাতকে আবার অনৈতিক অভিধায়ও আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। নির্বাচনে কিছু ভোটারকে টাকা দিয়ে প্রভাবিত করার কুশেশ নতুন কোন খেলা নয়। এ বহু পুরনো চর্চা। কিন্তু ‘ধরা যাবে না, বলা যাবে না, ছুঁয়া যাবে না’ এর মতো এও আরেক বায়বীয় বিষয়। অনুভব করা যায় কিন্তু প্রমাণ করা যায় না। সংগোপনে সাধিত হয় এই কা-। যিনি দেন এবং যিনি নেন তাদের বাইরে আর কেউ দেখে না এটি। আবার দাতা-গ্রহীতা কেউই এ নিয়ে বাইরে আলোচনা করতে অনাগ্রহী থাকেন। কালেভদ্রে এই গোপন সম্পর্কের অনৈতিক সংযুক্তির খবরটি চাউর হয়। দেখা গেল এক এলাকায় কোন প্রার্থী টাকা দিয়ে এক শ’ ভোট কিনলেন। গণনার পর ওই প্রার্থী হয়ত সাকুল্যেই ১ শ’ ভোট পেলেন না। তখন খাপ্পা হয়ে তিনি হম্বিতম্বি ফলান। টাকা বিলানোর ঠিকাদারকে জবাবদিহি করেন। নানা বায়নাক্কা করে ঠিকাদার মশাই নিজের দোষ স্খলনের চেষ্টা করেন। এরা বলার চেষ্টা করেনÑ হুজুর এই হাড় হা-ভাতে লোকগুলোর চরিত্রের ঠিক নেই। এরা আপনার টাকাও নিয়েছে আবার আরেকজনের কাছ থেকেও নিয়েছে। এদের এই অধম্ম ধর্মে সইবে না। কিন্তু বলেন না যে, হা-ভাতে ভোটারদের তো সুযোগ একবারই নিজেকে বিক্রি করার। সুতরাং এই মওকা ছেড়ে লাভ কী। ভোটের পর তো তারা যেই কে সেই ঘাটের মরা রূপেই বিবেচিত হবে। সুতরাং নীতি-নৈতিকতার গালভরা বুলি শুনে লাভ নেই। যে যেভাবে পার- নাও।
গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে জগন্নাথপুরের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রবাসী প্রার্থীদের টাকা ওড়ানোর উপর একটি সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রবাসী প্রার্থীরা দেদারসে টাকা ওড়াচ্ছেন বলে খবর দিয়ে বলা হয়েছে প্রমাণের অভাবে এমন অনৈতিক কর্মকা-ের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থাও নেয়া যায় না। জগন্নাথপুর বা বৃহত্তর সিলেটের প্রবাসী প্রার্থীরা দেশে নির্বাচন এলেই রক্তে এক ধরণের বিশেষ স্পন্দন অনুভব করেন। তারা দলে দলে ছুটে আসেন, নির্বাচনে প্রার্থী হতে নতুবা পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে। সাথে নিয়ে আসেন মুদ্রার বা-িল। এই প্রার্থীরা বিজয়ী হলে দেশে কয়েক মাস থাকেন। পরে অন্য কাউকে দায়িত্ব দিয়ে আবার বিদেশ পারি দেন। হারলে আর কয়েক মাস থাকার কষ্ট সহ্য করেন না। নির্বাচনে বিজয়ী হতে তাঁরা দুই হাতে টাকা খরচ করেন। দেশের কিছু ভোটার বা কর্মীরা এই প্রার্থীদের পছন্দ করেন। এদের পক্ষে কাজ করলে অন্তত নির্বাচনি মৌসুমটি ভাল কাটে। এরা যে ঠিক নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতা চর্চা করে লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে টাকা দিয়ে ভোটার প্রভাবিত করেন বিষয়টি এমন নয়। এরা সম্মানের জন্য জনপ্রতিনিধি হতে চান। এই সম্মানের জন্য টাকা পয়সাকে হাতের ময়লা মনে করেন এঁরা। প্রবাসীরা কোন উপলক্ষ পেলেই দেশে নানা কাজে টাকা দেন। এলাকার বহু উন্নয়ন কাজ প্রবাসীদের বদান্যতায় হতে দেখি আমরা। প্রবাসীরা ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় নির্বাচনি সংস্কৃতির এই মন্দ দিকটি দ্বারা সাংঘাতিকভাবে আক্রান্ত হয়ে যান যা আখেরে দুর্ভাগ্যজনক। এই কারণে দেশের সমাজসেবকরা পিছিয়ে পড়ছেন। তারা পেরে উঠেন না প্রবাসী অর্থের দাপটের সাথে।
টাকা দিয়ে ভোটার প্রভাবিত করার অনৈতিক আচরণটি সহসা বন্ধ হওয়ার লক্ষণ দেখি না। এটি দীর্ঘ সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক চর্চার সাথে জড়িত। যতক্ষণ নির্বাচন প্রকৃত অর্থে সমাজসেবার মহত্তর জায়গায় প্রতিষ্ঠিত না হবে ততক্ষণ এই ধরণের কর্মকা-ের বিলুপ্তি হবে না।