নির্মল বিনোদনে রাহুর দশা

যদিও কুস্তির ইংরেজি প্রতিশব্দ রেসলিং, তবুও ইদানীং টিভি চ্যানেলে যে রেসলিং দেখানো হয় তার সাথে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী কুস্তি খেলার কোনো সম্পর্ক নেই। তথাকথিত রেসলিং এর নামে নির্মল কুস্তি খেলাকে নির্মমতার চূড়ান্ত পর্যায়ে এবং ক্যামেরার চাতুরিপনার উন্মত্ত বিনোদনে পরিণত করেছে। আমাদের দেশের বিভিন্ন গ্রামে যে কুস্তি প্রতিযোগিতার আয়োজন হয়ে থাকে সেগুলোতে অনেক নিয়ম কানুন আছে, যে নিয়ম-কানুন ওই রেসলিং এর নির্মমতা থেকে কুস্তিকে নিছক এক নির্মল বিনোদনের উপকরণে পরিণত করেছে। তাই গ্রামে গ্রামে কুস্তি বেশ জনপ্রিয়। বলা যেতে পারে লোকায়ত ক্রীড়াচর্চার যে কয়টি এখনও লোকসমাজে টিকে আছে কুস্তি তার অন্যতম। আমাদের বহু লোকখেলা কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। কুস্তিসহ হাডুডু, সাঁতার এমনসব খেলা এখনও টিকে আছে এ কারণে যে মানুষের সভ্যতা বিকাশের ধারার সাথে এসব খেলা ভালো করে নিজেকে মিশিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে। কুস্তি কেবল যুযুধান দুই ব্যক্তির শক্তির লড়াই নয় বরং এখানে বুদ্ধি চর্চার সুযোগ রয়েছে। আছে কৌশলের জুৎসই প্রয়োগের কুশলতা। এই বুদ্ধি ও কৌশল চর্চার সুযোগই কুস্তির টিকে থাকার ও জনপ্রিয় হওয়ার মূলমন্ত্র। মানুষ কুস্তিগিরের এসব মারপ্যাঁচ দেখতে দলে দলে মাঠ ভর্তি করে। এক গ্রামের লোক আরেক গ্রামের কুস্তিবিদদের আমন্ত্রণ করে নিয়ে আসে। এভাবে কুস্তি বিনোদনের সাথে গ্রামীণ সামাজিকতার অনন্য এক উপলক্ষ হয়ে আছে।
সুনামগঞ্জের গ্রামাঞ্চলে কুস্তি সবিশেষ জনপ্রিয়। বছরের একটা সময়ে নিয়মিত স্থানীয় উদ্যোগে কুস্তি প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। গ্রামের লোকেরা নিজেরাই ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে। আমন্ত্রিত গ্রামের মাল (কুস্তিগির) ও আগত অতিথিদের ভালো আপ্যায়নের ব্যবস্থা করেন। খেলা পরিচালনার জন্যও গ্রামেই রয়েছে ভালো বিচারক (আমিন)। কুস্তির নিয়ম-কানুনও লোকচর্চার সাথে ক্রমাগত উৎকর্ষতা লাভ করেছে। এই প্রতিযোগিতার জন্য গ্রামের কেউই কখনও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা চাননি। বলা যেতে পারে নিজেদের ভালোবাসা ও ভালো লাগার অদ্ভুত শিহরণই কুস্তিকে আপন মহিমায় সমুজ্জ্বল করে রেখেছে। ইদানীং এই লোকায়ত গ্রামীণ লোকক্রীড়ায় নাগরিক স্পর্শ লাগতে শুরু করেছে। দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, জেলা ক্রীড়া সংস্থা কর্তৃক আগামী ২৯ ও ৩০ অক্টোবর জেলা স্টেডিয়ামে আয়োজিত কুস্তি প্রতিযোগিতাটি স্থগিত করা হয়েছে। ক্রীড়া সংস্থা কর্তৃক গত ক’ দিনের বৃষ্টিপাতের কারণে মাঠ কর্দমাক্ত হওয়াকে প্রতিযোগিতা স্থগিত করার কারণ হিসাবে উল্লেখ করা হলেও ভিতরের খবর হলোÑ এই প্রতিযোগিতা নিয়ে দুইটি পক্ষের পরস্পরবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করা। ক্রীড়া সংস্থা কর্তৃক আয়োজিত কুস্তি প্রতিযোগিতায় ৫০ টাকা দর্শনির বিনিময়ে খেলা দেখার বিষয়টিকে বিরোধিতা করে অপর পক্ষটি বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের নিকট আবেদন নিবেদন করেছেন। এক পক্ষ অপর পক্ষের বিরুদ্ধে পরস্পর চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলেছেন। এ নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দুই পক্ষের সরব আলোচনা-সমালোচনা লক্ষ্য করা গেছে। এর ফল হিসাবে গ্রামীণ কুস্তি খেলার একটি আয়োজনের অপমৃত্যু ঘটল যা নিতান্তই দুঃখজনক। অর্থাৎ চিরায়ত একটি চর্চার উপর অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ ও পক্ষ-বিপক্ষ অবস্থানের চতুরতায় নির্মল বিনোদন মাধ্যমটির দূষিত হওয়ার পথ উন্মুক্ত হলো।
জেলা ক্রীড়া সংস্থা খেলাধুলার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান। তাদের কোনো কর্মকা-কে কেবল নিছক বিরোধিতার কারণে বাইরে থেকে চাপ প্রয়োগ কিংবা অহেতুক অভিযোগ করার মাধ্যমে প্রতিহত করার অপচেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। এ কারণে প্রতিযোগিতা স্থগিত করার পদক্ষেপটিও গ্রহণযোগ্য নয় বলেই আমরা মনে করি। এতে অন্তর্দ্বন্দ্বকারীরা আরও উৎসাহিত হবে। তাই যত দ্রুত সম্ভব স্থগিত কুস্তি প্রতিযোগিতাটি শুরু করে সুষ্ঠুভাবে শেষ করার জন্য আমরা জেলা ক্রীড়া সংস্থার দৃষ্টি আকর্ষণ করি।