‘নিষিদ্ধ শহর’ মায়াময় কবিতা

মনোরঞ্জন তালুকদার
আমি কবিতার আগ্রহী পাঠক নই। কারণ অধিকাংশ কবিতার বই পড়ে আমি বুঝতে পারি না। তাই কবিতার প্রতি আমার একটা সহজাত অনাগ্রহ আছে। পাঠক হিসেবে এটা আমারই সীমাবদ্ধতা। তবে আমার যা মনে হয়েছে কবিবৃন্দ সম্ভবত সব পাঠকের জন্য কবিতা লিখেন না। কিছু কিছু কবি তার রাজনৈতিক আদর্শ প্রচারের জন্য কবিতা লিখেন, কেউ কেউ হয়ত বিদগ্ধ পাঠকের জন্য কবিতা লিখেন। তাই তাদের কবিতাগুলো রাজনৈতিক শ্লোগান বা কবিতার নন্দন তত্ত্ব বিচারে উত্তীর্ণ হলেও সার্বজনীন হয়ে উঠে না।
যা হোক তার মধ্যেও হঠাৎ করে কিছু চিত্তাকর্ষক কবিতা মাঝে মধ্যে আগ্রহী করে তুলে কবিতার প্রতি। যে কবিতায় সার্বজনীন অনুভূতির হৃদয়গ্রাহী উপস্থাপনা থাকে, যার প্রতিটি পংক্তি ধারণ করে ভালবাসা ও বিরহের পরস্পর বিরোধী মিথস্ক্রিয়ার দোলাচল, আমাদের যাপিত জীবনের প্রাত্যহিক চালচিত্র ফুটে উঠে যে কবিতায়, যে কবিতা ফেলে আসা শৈশব আর কৌশরের সোনালী স্মৃতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে পাঠককে নস্টালজিক করে তোলে, চাইলেও সে কবিতাকে এড়ানো যায় না। বার বার পড়তে ইচ্ছে করে নিজের ফেলে আসা অতীতের মুখোমুখি হতে।
তেমনি একটি কবিতার বই ‘নিষিদ্ধ শহর’। লেখক নাসিমা জোহা চৌধুরী। বারোয়ারী ভাবনার একটি কবিতার বই। কাব্যগ্রন্থটিতে কবির মোট ৭৪টি কবিতা সংকলিত হয়েছে। বিষয় বৈচিত্রে, ভাবনার সাবলীল প্রকাশে এবং সুতীব্র আবেগে কবিতাগুলো হয়ে উঠেছে অন্তসলিলা নদীর মত প্রবাহমান।
বইটির প্রতিটি কবিতাই প্রিয়তম কবিতা। তবে কবিতাগুলো পড়তে পড়তে বার বার যে প্রশ্নটি আমাকে আলোড়িত করেছে তা হলো- কবিতাগুলো কি কেবলই কবি কল্পনার ছন্দময় প্রকাশ নাকি অভিজ্ঞতা স্নাত জীবনের নির্যাস।
যা সত্য তাই সুন্দর আর যা সুন্দর তাই শ্বাশত। কবি খুব সাহসের সাথে একটা চিরন্তন সত্যকে উন্মোচন করেছেন আমাদের সামনে। যে সত্যকে মনে মনে আমরা অনেকেই স্বীকার বা চর্চ্চা করলেও প্রকাশ্যে উচ্চারণ করি না। আর তা হলো ভালবাসা ভালবাসাই। সেটা যে বয়সে বা যে অবস্থাতেই জীবনে আসুক না কেন। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুনীল, রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ থেকে পৌরাণিক চন্ডীদাস- রজকিনী, কিংবা রাধা-কৃষ্ণ সর্বত্রই ভালবাসার এই সত্য বিরাজমান। ভালবাসার তীব্র আবেগ যেমন কবিকে করেছে মোহবিষ্ট তেমনি বিরহ যাতনায় কবি হৃদয় বেদনাক্লিষ্ট।
ভালবাসার উতাল হাওয়ায় মাতাল হওয়া কবি যখন লিখেন-
তোমার জন্য,
সেই ভোর হতে নিশি অব্দি প্রহর গুনি
মনের খাতায় রঙ বেরঙের,
অযুত নিযুত গল্প বুনি।
…………………………….
তোমার জন্য,
রাত্রি জাগি, ভিজতে থাকি জ্যোৎস্না বানে
জোনাক ডানায় ভর করে যদি,
আসো তুমি সঙ্গোপনে,
তোমার জন্য
সব আয়োজন, চাঁদ ও মেঘের লুকোচুরি
বুকের ভিতর খুব নিরবে গড়েছি এক,
অমরাবতী স্বপ্নপুরী।
কবিতা ঃ তোমার জন্য (৩)
এমনি নিটোল প্রেমের নানা কবিতার পাশাপাশি বিরহ যাতনায় দগ্ধ কবি লিখেন-
……………..ৃ..
তোমারও কি মনটা পোড়ে আমার মত?
দু’চোখে খুব নীরবে অশ্রু ঝরে অবিরত,
স্মৃতিগুলো বুকের ভিতর মিছিল করে
মনপাখিটা একা একা গুমরে মরে,
এটাই বুঝি ভালবাসার শেষ পরিনাম
স্মৃতি কি তবে বেদনার অপর নাম।
কবিতা ঃ স্মৃতি তুমি বেদনা
বিষয় বৈচিত্র্যে কবিতার বইটি এতই বহুমাত্রিক যে কবিতার কয়েকটি শিরোনাম উল্লেখ করলেই বুঝা যাবে। যেমন- বাবার কাছে চিঠি, শোন হে স্কাউট দল, শহীদদের আর্তনাদ, তুমি এলে স্বাধীনতা, হায়রে বাঙালি, পান নামা, রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য এর সাথে ভালবাসা ও বিরহের নানা রকম ব্যাকুলতার আকুল প্রকাশ অন্যান্য কবিতায়। আরো একটি কবিতার কিয়দংশ উদ্ধৃত করে উদ্ধৃতি কেন্দ্রীক আলোচনয় ইতি টানবো। কবিতাটির নাম হচ্ছে-
জন্মভিটা (২)
হে প্রিয় জন্মভিটে
আর কখনো হয়নি এতদিন থাকা কোথাও তোমায় ছেড়ে,
…………….
……..
অতঃপর এলো প্রাণের বৈশাখ
বুকের গভীরে বাজে বিষাদী ঢাক
চারদিকে স্বর্ণালি ধান, চাঁদনি পসরে চলে উঠোন জুড়ে মাড়ানি
উঠোনে উঠোনে ধান নেড়ে নেড়ে ঘুমটা পড়া বধূদের গুনগুনানি,
কিছুই তো হয়নি দেখা।
কৃষকের উচ্ছ্বসিত প্রাণ, রাখালের গান
কিংবা গরুর গাড়ির খটখটানি আওয়াজ হয়নিতো এবার শোনা
তবুও তোমাকে ঘিরে বুকের গহীনে চলে হাজার গল্প বোনা।
………….
কবির বৈশাখের এই জীবন্ত বর্ণনা আমাদের মত গ্রাম থেকে উঠে আসা পাঠকেকে দাঁড় করিয়ে দেয় তার ফেলে আসা কৈশোরের অবিনাশী স্মৃতির মুখোমুখি। করে তোলে নস্টালজিক। আর এখানেই কবি ও কবিতার স্বার্থকতা।
আমার হৃদয়ানুভূতির মুখরতা যে কবিতায় দেখতে পাই তাই আমার প্রিয়তম কবিতা। যে কবিতা পাঠক হৃদয়েকে উতলা করে, যে কবিতায় পাঠক নিজের স্বপ্ন আবেগকে কবিতার চরনে হেঁটে বেড়াতে দেখে, যে কবিতা তার মনে স্নিগ্ধ প্রশান্তির বাতাবরণ তৈরী করে তাইতো পাঠকের কাছে শ্রেষ্ঠ কবিতা। এ নিতান্তই আমার মত এক ব্রাত্যজনের ভাবনা। আমার আরো একটা ভাবনা আছে। আর তাহলো আমি আমার মত করে সাহিত্যকে মোটাদাগে দু’ভাবে দেখি।
১. ভাবের সাহিত্য ২. জ্ঞানের সাহিত্য।
আমি মনে করি ভাবের সাহিত্য চিরকালের সাহিত্য আর জ্ঞানের সাহিত্য কালনির্ভর সাহিত্য। তাই আমার ধারণা জ্ঞানের সাহিত্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে সমকালীনতাকে কেন্দ্র করে যে সাহিত্য রচিত হয় পরবর্তীকালে তার প্রাসঙ্গিকতা সমভাবে, সমমাত্রায় বিদ্যমান থাকে না। একটা উদাহরণ দিয়ে আমার বক্তব্যটা পরিস্কার করতে চাই। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি পরাধীন ভারতবর্ষে বা পাকিস্তানের অধীনস্থ পূর্বপাকিস্তানে যতটা প্রাসঙ্গিক ছিল আজও কি তার প্রাসঙ্গিকতার মাত্রা সমান? সাহিত্যবোদ্ধাদের উত্তর কি হবে জানি না তবে একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে আমার কাছে সমান নয়। আমার এই সীমাবদ্ধ চেতনার স্তরকে নিশ্চয় সবাই বুঝবেন।
নাসিমা জোহা চৌধুরী একজন নারী কবি। কবি তো কবিই তাকে নারী কবি এবং পুরুষ কবিতে বিভক্ত করা অনুচিত। আমি নারী শব্দটা ব্যবহার করেছি অন্য কারণে। আমাদের সমাজ মন ও মননে, চিন্তা ও মানসিকতায় এবং ভাব ও ভাবনায় এই একবিংশ শতাব্দীতে বসবাস করেও অনেক পশ্চাৎপদ। সেই প্রেক্ষাপটে প্রান্তিক অঞ্চলের একজন নারী কবির কবিতা চর্চা আমাকে অহংকারী করেছে। একদিন বেগম রোকেয়া স্বপ্ন দেখেছিলেন নারী মুক্তির, চেষ্টা করেছিলেন নারীকে মানুষের দৃষ্টিতে দেখার সামাজিক মূল্যবোধ সৃষ্টির। তাঁর সেই স্বপ্ন এখনো সুদূর পরাহত। যদিও অনেক ক্ষেত্রেই নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেড়েছে তবে তারজন্য তাদের সমাজের প্রতিকূল দৃষ্টি ভঙ্গির বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও আপোষ করার মধ্য দিয়েই অগ্রসর হতে হচ্ছে। সেই হিসেবে জগন্নাথপুরের একটি পাড়া গাঁ থেকে কবিতার চর্চা করা এত সহজ কাজ নয়।
সেই কঠিন কাজটিই করছেন কবি নাসিমা চৌধুরী জোহা। কবিতার সাথে তার বসবাস হোক নিরবিচ্ছিন্ন এই প্রত্যাশা রেখে এবং তার সর্বাঙ্গীণ সাফল্য কামনা করে আজকের লিখাটা শেষ করছি।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, জগন্নাথপুর সরকারি কলেজ।