নৈনগাঁওয়ের গণহত্যা উঠে আসছে নাটকে, মঞ্চায়ন ২০ ডিসেম্বর

বিশেষ প্রতিনিধি
দোয়ারাবাজরের নৈনগাঁও গণহত্যার স্মৃতি মনে হলে এখনো শিউরে ওঠেন গ্রামবাসী। বুধবার সকালে গ্রামের জমশেদ আলী বললেন, ‘১৭ বছর বয়স ওই সময় আমার। সবকিছু পুরোপুরি বুঝি তখন, ছাতকের ফখর রাজাকার লঞ্চে পাক আর্মিদের লইয়া লামছে, পরে হিন্দুরার বাড়িঘর জ¦ালাইছে, জংলাত লুকাইয়া দেখছি কি অত্যাচার। শরীরের লোম খাড়া অইযায় মনে অইলে, গ্রামের মফিজ আলী ও রহমত আলী লন্ডনিরে তো মুখেদি গুলি কইরা মারছে, কিছু মানুষরে লাইন ধরাইয়া গুলি করছে।’ নৈনগাঁওয়ের এমন লোমহর্ষক গণহত্যার কাহিনী নিয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় জেলা প্রশাসন ও দোয়ারাবাজার উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় জেলা শিল্পকলা একাডেমী ঘটনাস্থলেই এবার নাটক ‘দাঁড়াও পথিক’ এর আয়োজন করেছে।
প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু’র রক্তাক্ত ৭১’এ উল্লেখ রয়েছে, ১৯৭১ সালের মধ্য আগস্টে (২ ভাদ্র) দুটি লঞ্চে সুরমা নদী দিয়ে বিপুল সংখ্যক পাকিস্তানি আর্মি ছাতক থেকে রওনা দিয়ে নৈনগাঁও গ্রামের নদীর ঘাটে এসে নামে। প্রথমেই তারা গ্রামের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বাড়িঘরে আগুন দেয়। এসময় গজেন্দ্র দাস, নরেন্দ্র দাসসহ বেশ কয়েকজনকে নিয়ে গ্রামের পূর্বদিকে যেতে থাকে। একপর্যায়ে গ্রামের মসজিদে ঢুকে পাকিস্তানি সেনারা সব মুসলমানকে ‘মুক্তি’ বলে চিৎকার দিয়ে বাইরে বের হওয়ার নির্দেশ দেয়। পরে একসঙ্গে জড়ো করে গ্রামের ইয়াজ উল্লাহর বাড়ির আঙিনায় নিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে নৃশংসভাবে গুলি চালানো হয়।
ওই সময়ে পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে নিহতরা হলেন- নৈনগাঁও গ্রামের দোস্ত মোহাম্মদের ছেলে ইদ্রিছ আলী মাস্টার, পরাণ দাসের ছেলে গজেন্দ্র দাস, মব উল্লাহর ছেলে আসক আলী, জাফর আলীর ছেলে রহমত আলী, মরম আলীর ছেলে আসকর আলী, হোসেন বকসের ছেলে মনফর আলী, জোয়াদ উল্লাহর ছেলে আফরোজ আলী, ওয়াব উল্লাহর ছেলে ইদ্রিছ আলী, আজমত আলীর ছেলে নোয়াজ আলী, আকবর আলীর ছেলে কাচা মিয়া, মোহন আলী সরকারের ছেলে আব্দুল মন্নাফ, আব্দুল মন্নাফের ছেলে আব্দুর রবসহ অনেকে। হানাদারদের গুলিতে নিহতদের মধ্যে শুধু গোলাম মোস্তফার লাশ দাফন করা হয়েছিল। ময়না মিয়া ও আশক আলীর গোপনে জানাজা পড়ে লাশ হাওরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। অন্য মরদেহগুলো স্বজনরা একনজর দেখারও সুযোগ পাননি।
উপজেলার নৈনগাঁও বধ্যভূমিতে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হয়েছে। ওখানে ২৩ জন শহীদের নামের তালিকা রয়েছে।
সুনামগঞ্জ জেলায় এখনো সবচেয়ে বেশি মুক্তিযোদ্ধা দোয়ারাবাজারে। মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে সীমান্তবর্তী এই উপজেলার স্থানে স্থানে পাকিস্তানিদের মোকাবেলা করেছেন বীর যোদ্ধারা।
এবার বিজয়ের মাসে ওই উপজেলার নৈনগাঁওয়ে ব্যাপক আয়োজনে যুদ্ধকালের নির্মম এই হত্যাযজ্ঞ কিভাবে সংগঠিত হয়েছিল তা দেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রক্তাক্ত’৭১, ৭১’এ সুনামগঞ্জ, সুনামগঞ্জে বঙ্গবন্ধু ও তৎকালীন রাজনীতি, দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে ছাপা হওয়া ইদ্রিছ আলী বীরপ্রতীকের লেখা ও মুক্তিযুদ্ধ সমগ্রসহ বিভিন্ন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গ্রন্ত থেকে নেওয়া তথ্যের সহায়তায় পরিবেশ থিয়েটার’ আগামী ২০ ডিসেম্বর আয়োজন করেছে নাটক ‘দাঁড়াও পথিক’। নাট্যকার ও নির্দেশক আহমেদ মঞ্জুরুল হক চৌধুরী পাভেলের সঙ্গে সহকারী নির্দেশক হিসেবে রয়েছেন দেওয়ান গিয়াস চৌধুরী ও দেবাশীষ তালুকদার শুভ্র।
আহমেদ মঞ্জুরুল চৌধুরী পাভেল জানিয়েছেন, নৈনগাঁও স্মৃতিফলকের পাশে সুরমা নদীর পাড়ে মঞ্চ করা হচ্ছে। ১৯৭১ সালের ১৮ আগস্ট লঞ্চে পাক হায়েনারা যেভাবে এসেছিল, সেই একই ধরণের আবহ তৈরির চেষ্টা করা হবে। নাটকে লঞ্চও ব্যবহার করা হবে। সুরমা নদীর অংশ নিয়ে বিশাল জায়গায় নাটকে অভিনয় করবেন অভিনয় শিল্পীরা। তিনটি মাল্টি মিডিয়া প্রজেক্টর, ৪ টি ক্যামেরা এবং ঢাকা, সিলেট ও হবিগঞ্জ থেকে আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নৈনগাঁওয়ের গণহত্যার আগে ছাতকের শিখা সতেরো এবং নৈনগাঁওয়ের ওই সময়ের নির্মমতার বিষয়টি শিল্পীরা তুলে আনবেন। এছাড়া রাজাকারদের প্রেত্মাত্ম এখনো যে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে সেটিও কাহিনীতে থাকবে। মুখোশধারী বর্ণচোরাদের থেকে সাবধান থাকার কথাও থাকবে নাটকে।
আহমেদ মঞ্জুরুল চৌধুরী পাভেল জানান, আবু হেনা মোস্তফা কামালের ‘ছবি’ কবিতা নির্ভর কোরিওগ্রাফি দিয়ে শুরু হবে, এরপর সুরমা নদীতে নৌকায় মাঝির কণ্ঠে শাহ্ আব্দুল করিমের বাংলা মায়ের ছেলে গানটি শোনা যাবে। মুক্তিযুদ্ধের আরও গান, ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, মুক্তিযুদ্ধের আরও কিছু গণহত্যার কথা যুক্ত করা হয়েছে।
জেলা শিল্পকলা একাডেমীর সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শামছুল আবেদীন বললেন, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং জেলা প্রশাসন আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করায় বিজয়ের এই মাসে বড় এই আয়োজনটি করতে পারছে জেলা শিল্পকলা একাডেমী, এই আয়োজনে যুক্ত শিল্পীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।