নয় পেরিয়ে উদ্যম দশে দৃষ্টি রয়েছে সামনে

পঙ্কজ কান্তি দে
এক নিদারুণ দহনকাল অতিক্রম করছে মানবসভ্যতা। কোভিড ১৯ পরিস্থিতি বাংলাদেশে এই সময়ে সবচাইতে আতঙ্কজনক অবস্থায় পৌঁছেছে। দুই সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন দুই শতাধিক মৃত্যু ও ৩০ এর অধিক আক্রান্ত হার দেখছে বাংলাদেশ। দেশের ঝুঁকিপূর্ণ ১১ জেলার তালিকায় সুনামগঞ্জের নাম রয়েছে। জেলায় যারা কোভিড পরীক্ষা করাচ্ছেন গড়পড়তা তাদের অর্ধেকই পজিটিভ হচ্ছেন। মারাও যাচ্ছেন অনেকে। শহরের পরিচিত কয়েকজনের করুণ মুত্যু এ মাসে আমাদের কাতর করেছে। গ্রামে-শহরে ব্যাপকভাবে জ্বর-সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এদের গরিষ্ট অংশই কোনো পরীক্ষা করাচ্ছেন না। অন্যদিকে স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে ব্যাপক গণঅনীহা লক্ষণীয় যা পতঙ্গের আগুনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মাহুতি দেয়ার মতো পরিস্থিতির সাথে তুলনীয়। কঠোর লকডাউন চলছে। সবকিছু বন্ধ আবার অনেককিছুই খোলা থাকার মতো অদ্ভুত এক বাস্তবতা চলছে। এরকম এক দুঃসহ পরিস্থিতিতে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর আজ দশম বছরে পদার্পন করেছে। আমাদের জন্য এই দিনটি আনন্দের অন্যতম এক উপলক্ষ বটে কিন্তু বাস্তবতা আজ আমাদের যাবতীয় আনন্দ প্রকাশের পথ রূদ্ধ করে দিয়েছে। গতবছরও একই বাস্তবতার কারণে আমরা নবম বছর পূর্তির কোনো উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে পারিনি। সময়ের নিয়মে দিনপঞ্জির পাতা বদলায়। দিন মাস বছর পরিবর্তিত হয়। সেই অমোঘ নিয়মের হাত ধরে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর আজ তার জন্মের দশম বছরে প্রবেশ করলো। এই শুভদিনে সকলের প্রতি আমাদের উষ্ণ অভিনন্দন।
একেবারে শুরুর বছরের মতো সদ্যগত বছরেও আমাদের মোকাবিলা করতে হয়েছে নানাবিধ বাধা-বিপত্তি। এই বছরেও সংবাদে জনস্বার্থ সংরক্ষণের দায় শোধ করার মূল্য চুকাতে হয়েছে আমাদের আত্মগত মর্যাদার দরোজায় তালা লাগিয়ে অশেষ মনোকষ্টের বিনিময়ে। আমরা জানি পাঠক সত্য ভালবাসেন। পত্রিকার পাতায় নির্জলা নিখাঁদ সত্য খোঁজেন। পাঠকচাহিদার এই সমধিক গুরুত্বপূর্ণ দিকটির প্রতি আমরা বরাবরই অনুগত। কবিগুরু সেই যে বলেছেন- “সত্য যে কঠিন/কঠিনেরে ভালবাসিলাম/সে কখনো করে না বঞ্চনা।/আমৃত্যু দুঃখের তপস্যা এ জীবন/ সত্যের দারুণ মূল্য লাভ করিবারে/ মৃত্যুতে শোধ করে দিতে।” আমরাও সেই মূল্য চুকিয়ে চলেছি গত ৯ বছর ধরেই। এই পাঠকনিষ্ঠতা থেকে আমরা বিচ্যুত হতে চাই না। পাঠকরাই আমাদের বাঁচিয়ে রাখবেন এইসব রূঢ় বাস্তবতা ও নিরেট হাতুরি পেটানোর হৃদয়হীন শত সহস্র আঘাত থেকে। এইটুকু আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার। এই গর্ব-অহঙ্কারটুকো হলো দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের অলঙ্কার। আমরা আর কিছু চাই না। এই সালঙ্করা সুনামগঞ্জের খবর প্রতি সূর্যোদয়ে উপহার দিতে চাই আপনাদের করকমলে।
আমরা সুনামগঞ্জ ও বাংলাদেশের শুভ্র সমুজ্জ্বল উন্নয়নের সাথে থাকতে চেয়েছি- থেকেছি। আমরা উন্নয়নপ্রয়াশীগণের সমর্থক হয়ে অবিচল দৃঢ়তায় অকুণ্ঠ থেকেছি। আমরা মানুষের দুর্ভোগ ও সমস্যার কথা আলোয় আনতে চেয়েছি- করার চেষ্টা করেছি। আমরা প্রান্তজনের কষ্ট যন্ত্রণা প্রকাশের মাধ্যমে তাদের সহায়ক হতে চেয়েছি। আমরা জনসম্পদ ও উন্নয়ন-খাদকদের বিরুদ্ধে কলম শাণিত করার অভিপ্রায়ী ছিলাম। বঞ্চিত মানবাত্মার অশ্রুসজল চোখ হতে চেয়েছিলাম আমরা। আমরা আমাদের মত করে এইসব করে গেছি। সামনেও তাই করব। কবি সুকান্তের দুর্মর ইচ্ছার মতোই আমরাও “যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ/প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল।”
আমরা সৌভাগ্যবান এই কারণে যে, কখনও আমরা নির্বান্ধব ছিলাম না। সুজন-ছায়ানীড়ের প্রশান্তির এতটুকু অভাব ছিল না কখনও। ওইসব বন্ধু মহানুভবগণের ভালবাসার জলবিন্দু দ্বারা আমরা সর্বক্ষণ শীতল ছিলাম। তাই তো পদে পদে বাধার যে বিন্ধ্যাচল তৈরি হয় তা আমরা টপকে যেতে পেরেছি নিরন্তর। ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞতা, হৃদয়াঞ্জলি হে সুহৃদবৃন্দ। আপনাদের বলিষ্টতাই আমাদের দুর্বলতা সংহারক।
করোনা দুষ্কালে আমাদের অনেক কর্মী নিয়মিত সময় দিতে পারেননি। অনেকেই ছিলেন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। কাজ শেষ করতে হয়েছে ঘড়ির কাটা ধরে। এই কঠিন সময়ে পত্রিকা প্রকাশনা সচল রাখতে অক্লান্ত কাজ করেছেন আমাদের বার্তা প্রধান সজীব। আসাদমনি, লিপসন, পুলকরাজ, কামরান, সাগররা অফিসের নিরবতা দূর করেছে স্বভাবসুলভ কর্মচঞ্চলতা দিয়ে। প্রবীণ আকরাম উদ্দিন পথে পথে ঘুরে পথের খবর এনে দিয়েছেন। উপজেলায় থাকা জ্যেষ্ঠ সহকর্মী অর্থাৎ স্টাফ ও প্রতিনিধিরা আগের মতই ভালবাসার নিদর্শন রেখে গেছেন। বিষুদা রাত গভীর হলেও অম্লান হাসি দিয়ে প্রেস সামলেছেন। জুবের মমতা দিয়ে সাজিয়েছে ভালবাসার পত্রিকা। অশেষ কৃতজ্ঞতা কবি কুমার সৌরভ, প্রথম আলোর সিলেট অফিস প্রধান উজ্জ্বল মেহেদী, সুনামগঞ্জের স্টাফ রিপোর্টার খলিল রহমান, আমাদের সহকারী সম্পাদক এনাম আহমদ ও মাহবুবুল হাছান শাহীনের প্রতি।
পত্রিকা প্রকাশ কোনো একক কর্ম নয়। এ হলো দলগত উদ্যোগ। এই জায়গায় একটি ভাল দল ছিল আমাদের। এই দলটিই পত্রিকার প্রাণবায়ু। দশম বছর শুরুর শুভক্ষণে আমাদের অদম্য খবর-দলকে শুভেচ্ছা।
মানুষের মনের দশটি অবস্থা বিদ্যমান থাকে। একে বলে দশদশা। আবার দশ দিক বলতে আমাদের অবস্থানের সকল দিকগুলোকে নির্দেশ করে। তার মানে হলো- দশ সংখ্যাটি পরিপূর্ণতা নির্দেশক। আমরা মনে করি একটি দৈনিক ৯ বছর ধরে ধারাবাহিক প্রকাশনার পথ ধরে যখন দশের দুয়ারে পৌঁছে যায় তখন সে তার নিজের পরিপূর্ণতার কথাই দশদিকে জানান দিতে চায়। এখন আর কোনো পিছুটান নয়, নয় বিহ্বলতা। এখন শঙ্কাহীনভাবে সামনে এগিয়ে চলার দীপ্ত প্রত্যয় ঘোষণার সময়। এই প্রত্যয়ই আমরা ব্যক্ত করছি সকলের উদ্দেশ্যে। আপনারা সামনের দিনগুলোতে আমাদের সাথী হোন হৃদয়ের সমান উত্তাপ নিয়ে। এমন প্রত্যাশা দহনকালের এই স্নিগ্ধ সকালে। সকলে ভাল থাকুন। মহামারীর মহাতঙ্ক থেকে মুক্তি পাক আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ-পুরো পৃথিবী।