পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী হচ্ছেন ড. শামসুল আলম

সু.খবর ডেস্ক
টেকনোক্র্যাট কোটায় পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সাবেক সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী হচ্ছেন। এর আগে তিনি দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরির দায়িত্ব পালন করেছেন। গত বৃহস্পতিবার তিনি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে ফোন পেয়েছেন, আগামীকাল রবিবার (১৮ জুলাই) চূড়ান্তভাবে শপথ নেবেন।
একুশে পদক প্রাপ্ত এ অর্থনীতিবিদ বলেন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী হওয়ার জন্য ফোন করা হয়েছে। রবিবার শপথ। সবাই দোয়া করবেন, প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া দায়িত্ব যেন সঠিকভাবে পালন করতে পারি।
২০২১ সালের ১ জুলাই পর্যন্ত তার চাকরির মেয়াদ বাড়িয়েছিল সরকার। ড. আলম ২০০৯ সালে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে যোগ দেন। এখনও কর্মরত রয়েছেন। গত ১২ বছর ধরে জিইডি সদস্য পদে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
ড. শামসুল আলমের হাত ধরে তৈরি হয়েছে বেশ কয়েকটি উন্নয়ন পরিকল্পনা। যেগুলো এখন চলমান। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক ও সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণীত হয়েছে তার হাত ধরে। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে দ্বিতীয় দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্র (২০০৯-১১) সংশোধন ও পুনর্বিন্যাস করে ‘দিনবদলের পদক্ষেপ’ ২০১১ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়েছে। রূপকল্প ২০২১-এর আলোকে বাংলাদেশের প্রথম পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনা (২০১০-২০২১) তৈরি করে জিইডি। এ ছাড়া প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে টেকসই উন্নয়ন কৌশলপত্র, সামাজিক সুরক্ষা কৌশলপত্র প্রণীত হয়েছে তার সময়ে। বর্তমানে ১০০ বছরের বদ্বীপ পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ শেষের পথে। এগুলোর বাইরে তার দায়িত্ব পালনকালে এমডিজি অর্জন বিষয়ক ১৫টি গ্রন্থ, তার তত্ত্বাবধান ও সম্পাদনায় ৬৩টি মূল্যায়ন প্রতিবেদন, অধ্যয়ন ও গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
ড. শামসুল আলম এ বছর সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ইকোনমিক মডেলিং কর্তৃক বাংলাদেশে এ সময়ে ইকোনমিস্ট অব ইনফ্লুয়েন্স অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতির ১৬তম বার্ষিক সম্মেলনে এ বছর তাকে স্বর্ণপদকে ভূষিত করা হয়। বাংলাদেশ শিক্ষা পর্যবেক্ষণ সোসাইটি তাকে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতি পদক ২০১৮-এ ভূষিত করে। তার গবেষণাগ্রন্থ, পাঠ্যপুস্তকসহ অর্থনীতি বিষয়ক প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা ১২টি। মন্ত্রিসভায় টেকনোক্র্যাট কোটায় প্রতিমন্ত্রী হচ্ছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক ড. শামসুল আলম। (সূত্র : বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম)
সংক্ষিপ্ত জীবন কথা
১. ড. শামসুল আলমএসএসসিপরীক্ষায়উত্তীর্ণ হয়ে১৯৬৫ সনের সেপ্টেম্বর মাসে তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি অর্থনীতি স্নাতক (সম্মান) কোর্সে ভর্তি হন। ড. শামসুল আলম ১৯৭৩ সনে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষি অর্থনীতিতে এম. এস.সি., ১৯৮৩ সনে ব্যাংককের থাম্মাসাট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ. অর্থনীতি এবং ইংল্যান্ডের নিউ ক্যাসেল আপন টাইন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯১ সনে অর্থনীতি বিষয়ে পি.এইচ.ডি. ডিগ্রি অর্জন করেন। ড. আলম বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও শিক্ষকতায় ১৯৭৪ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত নিয়োজিত ছিলেন। অধ্যাপনা জীবনেড. আলম ২০০৮ সনে জার্মানির হামবোল্ট বিশ্ববিদ্যালয়, বেলজিয়ামের ঘেন্ট বিশ্ববিদ্যালয় এবং নেদারল্যান্ডের ভাগিনিঙ্গেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট ইকনোমিকস স্কুলে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষকতায় অংশগ্রহণ করেন।বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ্যাডজাঙ্কট্‌ ফ্যাকাল্টি হিসেবে কৃষি অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষকতায় যুক্ত ছিলেন।
২. ড. আলম বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটে পরপর তৃতীয় মেয়াদে, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রিজেন্টস বোর্ডে (চতুর্থ মেয়াদ), সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটে (চতুর্থ মেয়াদ), সিলেট বিজ্ঞান ওপ্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটে (তৃতীয় মেয়াদে) এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের (দ্বিতীয় মেয়াদে) সম্মানিত সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।তিনি বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অভ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ এর গভার্নিং বোর্ডের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ড. আলম জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থায় মার্চ ২০০২ থেকে ডিসেম্বর ২০০৫ পর্যন্ত পূর্ণকালীন চাকুরিরত ছিলেন। ইউএনডিপি বাংলাদেশে ১৪ মাস সিনিয়র স্কেলে পূর্ণকালীন জাতীয় কনসালটেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তিনি জাতীয় দৈনিকসমূহে উপসম্পাদকীয় পৃষ্ঠায় গত তিন দশকের অধিক সময় ধরে আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক বিষয়ে বিশ্লেষণধর্মী অসংখ্য কলাম লিখেছেন।
৩. পঁয়ত্রিশ বছরের অধ্যাপনার অভিজ্ঞতা শেষে ড. শামসুল আলম ১ জুলাই ২০০৯ সনে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে যোগদান করেন এবং এখনো (২০১৯) কর্মরত আছেন।ড. আলমের কর্মজীবন ২০১৮ সনে ৪৩ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সৃষ্টির পর সদস্য হিসেবে ২০০৯ থেকে ড. আলম দীর্ঘতম সময়ের জন্য নিয়োজিত রয়েছেন। ড. আলম ২০১৬ সনে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসরোত্তর ছুটিতে যান।ড. শামসুল আলম ২০১৪ সনের ফেব্রুয়ারী মাস থেকে মহামান্য রাষ্ট্রপতির ১০% কোটায় ক্যাডার সার্ভিসের বাইরে প্রথম সিনিয়র সচিব পদমর্যাদা অর্জন করেন।পেশাগত জীবনে তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিব্যবসা ও বিপণন বিভাগে দীর্ঘ ৩৫ বছর অধ্যাপনায় যুক্ত ছিলেন।প্লানিং কমিশনের সদস্য হিসেবে যোগদানের পূর্বে প্রফেসর আলম, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন এবং বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন। পরিকল্পনা কমিশনে তাঁর প্রাপ্ত প্রথম দায়িত্বের মধ্যে ছিল দ্বিতীয় দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্র (২০০৯-১১), সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে সংশোধন পুনর্বিন্যাস করা। সংশোধিত সেই দলিল ‘দিন বদলের পদক্ষেপ’ জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিল কর্তৃক অনুমোদিত হয়ে ২০১০-১১ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়। রূপকল্প ২০২১ এর আলোকে প্রণীত বাংলাদেশের প্রথম দীর্ঘমেয়াদী প্রেক্ষিত পরিকল্পনা (২০১০-২০২১), ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০১১-২০১৫) ড. আলমের নেতৃত্বে ও অংশগ্রহণে প্রণীত হয়। ড. আলমের নেতৃত্বে প্রণীত বাংলাদেশের সপ্তম পঞ্চবার্ষিক (২০১৬-২০২০) পরিকল্পনার বাস্তবায়নজুন ২০২০ সম্পন্ন হবে। পরিকল্পনা কমিশনে ড. আলমের কার্যকালীন সময়ে অন্যসবের মধ্যে বাংলাদেশে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বিষয়ক ১৬ টি গ্রন্থ,বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়ন কৌশলপত্র (২০১১-২০২১)এবং বাংলাদেশের প্রথম সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলপত্র (২০১৫-২০২৫) প্রণীত হয়েছে। ড. আলমের নেতৃত্বে বাংলাদেশ শতবর্ষী বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ প্রণীত হয়েছে (২০১৮)। সাধারণ অর্থনীতি বিভাগে কার্যকালীন সময়ে তাঁর তত্ত্বাবধানে ও সম্পাদনায় এ পর্যন্ত ৮২ টি মূল্যায়ন প্রতিবেদন, অধ্যয়ন ও গবেষণা গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
৪. ড. শামসুল আলম ২০১৮ সনে South Asian Network for Economic Modelingকর্তৃক বাংলাদেশে‘Economist of Influence Award’অর্জন করেন। ড. আলমের গবেষণা গ্রন্থ, পাঠ্যপুস্তকসহ অর্থনীতি বিষয়ক প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা ১২ টি।দেশে-বিদেশেপ্রকাশিতসম্পাদিতগ্রন্থ সংখ্যা২০ টি। দেশ-বিদেশে প্রকাশিত জার্ণালে গবেষণা নিবন্ধ ৫০ টি। কৃষি অর্থনীতি বিষয়ে দক্ষতা ও অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতি ১৬তম দ্বিবার্ষিক সম্মেলন ২০১৮ সনে ড. আলমকে স্বর্ণপদকে ভূষিত করে। সরকার অনুমোদিত বাংলাদেশ শিক্ষা পর্যবেক্ষণ সোসাইটি ড. আলমকে “বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিপদক ২০১৮” তে ভূষিত করেছেন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এ্যালামনাই এ্যাসোসিয়েশন ২০১৮ সনে শিক্ষকতা ও গবেষণায় বিশেষ অবদান রাখার জন্য ‘সম্মাননাএওয়ার্ড’ প্রদান করেন। শিক্ষকতায় সাফল্য ও বিশেষ অবদানের জন্য বিশ্ব শিক্ষক দিবস জাতীয় উৎযাপন কমিটি (২০১৮), ৫ অক্টোবর, ২০১৮ ড. আলমকে ‘বিশেষ সম্মাননা স্মারক’ প্রদান করেন।
৫. সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও সরকারি দায়িত্ব পালনে ড. আলম বিশ্বের ৪৮ টি দেশ ভ্রমন করেছেন। ড. শামসুল আলম সেপ্টেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় ২০১০ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত নয়বার প্রধানমন্ত্রির সরকারি সফরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় যোগদান করেছেন। ৭-১১ মে ২০১১ ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত স্বল্পোন্নত দেশগুলোর সম্মেলনে এবং মে ২০১৬ প্রধানমন্ত্রির সরকারি জাপান সফরে ড. আলম সফর সঙ্গি ছিলেন। ড. আলমের পারিবারিক জীবনে স্ত্রী, দুই পুত্র সন্তান, ও এক নাতনী রয়েছে। ড. আলমের জন্ম চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তর উপজেলার সম্ভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারে ১৯৫১ সনের ১ জানুয়ারি।
সূত্র : পরিকল্পনা কমিশন, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।