পরিবেশ দূষণের বিরুদ্ধে অভিযান ধারাবহিক হতে হবে

শনিবার জেলা প্রশাসক টাঙুয়ার হাওরে পরিচ্ছন্নতা অভিযানের উদ্বোধন করেছেন। উদ্বোধন করতে যেয়ে তিনি বলেছেন, পর্যটকবাহী নৌকায় ডাস্টবিন রাখতে হবে। প্রচারের পাদপ্রদীপের আলোয় বেশি বেশি আসা এবং করোনার সংক্রমণ হার নিম্নগামী হওয়ার কারণে সুনামগঞ্জের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে এবার পর্যটকদের ভিড় বেশ লক্ষণীয় রকমভাবে দেখা গেছে। বিশেষ করে টাঙুয়ার হাওরে এই ভিড় ছিলো সবচাইতে বেশি। সমুদ্রসম দিগন্ত বিস্তৃত নীল জলরাশির সৌন্দর্য ও জলমধ্যে মাথা তুলে দাঁড়ানো হিজল-করসের অপরূপ দৃশ্য দেখতে সারা দেশ থেকে এখানে পর্যটকরা ছুটে আসেন। মূলত পুরো হাওরাঞ্চলই পর্যটন সম্ভাবনাময় এলাকা। হাওর, পাহাড়-টিলা ঘেরা সুনামগঞ্জের বহু ছোট ছোট জায়গাকে পর্যটন-কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তুলা যায় যা সহজেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পিয়াসু পরিব্রাজকদের আকৃষ্ট করতে পারে। এর একটি বড় উদাহরণ তৈরি করেছেন বিশ^ম্ভরপুর উপজেলার তরুণ ও উদ্যমী উপজেলা নির্বাহী অফিসার। তিনি একদিকে যেমন উপজেলা সদরের হতশ্রী অবস্থাকে শিল্প-শোভন করে তুলেছেন তেমনি উপজেলা সদরের সন্মুখে করচার হাওর-পাড়ে হাওর বিলাস নামে একটি ঝুলন্ত প্লাটফরম স্থাপন করে হাওরের সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ করে দিয়েছেন। তিনি কারেন্টের বাজারে বোয়াল চত্ত্বর, পলাশ বাজারে হাওর-বৃত্ত এবং সীমান্ত সংলগ্ন চ্যাংবিলে তৈরি করেছেন মনোহর পাহাড় বিলাস। এই দুই বিলাস-চত্ত্বর দেখতেও পর্যটকরা এখন সমান উৎসাহ দেখাচ্ছেন। সুনামগঞ্জের পর্যটন সম্ভাবনাকে বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগানোর জন্য পরিকল্পনা গ্রহণের কথা একাধিক মন্ত্রী ও সরকারের উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ বিভিন্নভাবে বলে আসছেন। সুতরাং পর্যটন শিল্প হিসাবে কক্সবাজার, চট্টগামের সাথে অদূর ভবিষ্যতে সুনামগঞ্জের নামও যে সমান মর্যাদা নিয়ে উচ্চারিত হবে সে কথা আমরা জোর দিয়ে বলতে পারি। পর্যটন বিকাশের এই ইতিবাচক জায়গায় শঙ্কারও কিছু বিষয়বস্তু রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান হলোÑ পর্যটকদের দ্বারা পরিবেশ দূষণ। পর্যটকরা আমোদ ও সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে বেমালুম ভুলে বসে থাকেন যে, সৌন্দর্যের আধারকে রক্ষা করতে হবে। তারা অবিবেচকের মতো অপচনশীল প্লাস্টিক বর্জ্য দ্বারা পুরো হাওর এলাকার পরিবেশ দূষিত করে চলেছেন। বিভিন্নভাবে সচেতন করা সত্ত্বেও তারা দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিচ্ছেন না । এমন প্রেক্ষাপটে জেলা প্রশাসকের হাওর পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করার গুরুত্ব অনেক বেশি।
পরিবেশ দূষণের নাগরিক-বিচ্যুতির দৃশ্য কেবল হাওর এলাকাতেই সীমাবন্ধ নয়। বরং সর্বত্রই মানুষের এমন অবিবেচক প্রকৃতি ও পরিবেশ সংহারী অপতৎপরতার দেখা মিলে। সকলের আবর্জনা ফেলার একমাত্র জায়গা হয়ে উঠেছে পাশর্^বর্তী নদী, খাল কিংবা অন্য কোনো নীচু জায়গা। নির্বিচারে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা হচ্ছে এসব জায়গায়। ফলে নদী, খাল ও হাওরগুলো ক্রমাগত দূষিত হয়ে প্রকৃতি, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। আমরা জানি পরিবেশ দূষণের বিরুদ্ধে দেশে কার্যকর আইন রয়েছে। এসব দেখভালের জন্য রয়েছে সরকারি সংস্থা। কিন্তু আমরা কোথাও পরিবেশ বিষয়ক আইনের কোনো প্রয়োগ দেখতে পাই না। অন্যদিকে পরিবেশ রক্ষায় নাগরিক উদ্যোগও নেই বললেই চলে। এমন নিস্পৃহতার কারণে সাধারণ মানুষ সকলেই যেন হয়ে উঠছেন এক একজন প্রকৃতি সংহারক হিসাবে। সুতরাং পরিবেশ বিষয়ক আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং ব্যাপক নাগরিক সচেতনতা বাড়ানো ছাড়া পরিবেশ রক্ষার আর কোনো বিকল্প রাস্তা নেই।
জেলা প্রশাসক টাঙুয়ার হাওরে পরিচ্ছন্নতার জন্য যে অভিযান শুরু করেছেন, আমরা চাই এর ধারাবাহিকতা বজায় থাকুক। পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি হাওর-নদী যাতে দূষিত না হয় সে বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপও কামনা করি। প্রকৃতি নিজ হাতে যে রূপের ডালি আমাদের উপহার দিয়েছে তা যেন কারও বিবেচনাহীন কর্মকা-ের কারণে ধ্বংস না হয় তা নিশ্চিত করাও সমান জররি।