পর্যটনে নতুন সম্ভাবনার জেলা সুনামগঞ্জ

বিশেষ প্রতিনিধি
বাড়ছে পর্যটক। বছরে বছরে তৈরি হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা। হাওর-পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কাজে লাগিয়ে নতুন নতুন পর্যটন স্পট গড়ে ওঠছে। তবে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট না হওয়ায় পর্যটকরা এসে রাত্রীযাপন করতে পারছেন না। স্থানীয়রা বলেছেন, দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসা যাওয়ায় সময়ক্ষেপণ হয়, রাতেও থাকতে সমস্যা হয়, না হয় আরো বাড়তো পর্যটক আসা। মঙ্গলবার বিশ^ পর্যটন দিবস উপলক্ষে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে আলোচনা সভা হবে।
সংস্কৃতির বিভিন্ন ঐতিহ্যের টানে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সুনামগঞ্জে পর্যটকদের আগমন বেড়েছে। জেলায় রয়েছে মুক্তিসংগ্রামের স্মৃতি বিজড়িত নানা স্থান। বৈষ্ণব কবি রাধারমণ, মরমি কবি হাসন রাজা, জ্ঞানের সাগর দুর্বীণ শাহ, বাউল স¤্রাট শাহ আব্দুল করিমসহ অসংখ্য সাধকের জন্মস্থান সুনামগঞ্জ। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা বলেছেন, এখানকার পর্যটনস্পটগুলোকে পর্যটকবান্ধব করে দিতে পারলে, এই জেলা হবে দেশের অন্যতম পর্যটক আকর্ষণীয় জেলা।
টাঙ্গুয়ার হাওর, লাউড়ের গড়, শহীদ সিরাজ লেক (নীলাদ্রী লেক), হাসন রাজার বাড়ী, ডলুরা শহীদ সমাধী সৌধ, সুনামগঞ্জ ঐতিহ্য জাদুঘর, বৈষ্ণব কবি রাধারমণের সমাধী, শিমুল বাগান, হলহলিয়া রাজবাড়ি, পাইলগাঁও এর জমিদার বাড়ি, দোহালিয়া জমিদার বাড়ি, সুখাইড় জমিদার বাড়ি, গৌরারং জমিদার বাড়ী, বারেকের টিলা, বাউল স¤্রাট শাহ আব্দুল করিমের বাড়ী, নারায়ণতলা মিশন, টেকেরঘাট-বাঁশতলা-মহেষখলা স্বাধীনতা উপত্যকা, পণতীর্থ, শাহ আরেফিনের মাজারসহ পর্যটক আকর্ষক নানা স্থান রয়েছে এই জেলায়।
এই জনপদের শিল্প সংস্কৃতির ধরণ দেশের অন্য জেলা থেকে ভিন্ন, তা চর্চার ক্ষেত্রেও স্বতন্ত্র রীতি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। নাগরিক সমাজের ধাঁচে এখানে শিল্প নির্মাণ হয় না, শিল্পচর্চা ও বিনোদন হয় জীবনকেন্দ্রিক। জেলায় ছোট বড় প্রায় ৬৫ টি হাওর ও ২৬টি নদী রয়েছে। বেশির ভাগ অঞ্চলই হাওর, বাওর ও অপেক্ষাকৃত নীচু অঞ্চল নিয়ে গঠিত এবং বৎসরের প্রায় ৭-৮ মাস জলমগ্ন থাকে। বর্ষার সময় এখানে সমুদ্রের মত ঢেউ খেলে এবং গ্রামগুলোকে মনে হয় এক একটি ছোট ছোট দ্বীপ। বিরল প্রজাতির মাছ ও পাখির স্বর্গরাজ্য টাঙ্গুয়ার হাওর। এখানে প্রায় ২০০ প্রজাতির মাছ, ১৫০ প্রজাতির উদ্ভিদ, ২০৮ প্রজাতির পাখি পাওয়া যায়। নৌ ভ্রমণের মাধ্যমেও জেলার সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ রয়েছে। জেলা ব্র্যান্ডিং এ এজন্যই সুনামগঞ্জ জেলাকে ‘হাওর কন্যা’ বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষ যতœবান হলে জেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ঘিরে পর্যটন শিল্পের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড এবং বাংলাদেশ ইনবাউন্ড ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন (বিডি ইনবাউন্ড)’এর জরিপ অনুযায়ী দেশের অন্যতম বৃহৎ জলাভূমি টাঙ্গুয়ার হাওরে ২০১৯ সালে পর্যটক এসেছিলেন দুই লাখ। ২০২০ সালে করোনা মহামারী থাকায় পর্যটক কমে যায়। এরপরও লাখ খানেক পর্যটক আসেন। ২০২১ সালে প্রায় সাড়ে তিন লাখ পর্যটক এসেছেন। এই বছর (২০২২ সাল) পর্যটকের সংখ্যা পাঁচ লাখ ছাড়িয়ে যাবে বলেছেন নৌ-পর্যটক উদ্যোক্তারা।
টাঙ্গুয়ার হাওরে রাজধানীর নৌ-পর্যটক উদ্যেক্তাদের ৫০ টির মতো হাউস বোট আছে। যেগুলো কেবল পর্যটকদেরই বহন করে। জেনারেটর বা আইপিএসসহ রাত্রীযাপন এবং বাবুর্চি দিয়ে রান্না করার সুবিধাও আছে এসব বোটে। এছাড়া স্থানীয় উদ্যোক্তাদের ২০০ থেকে ২৫০ টি পর্যটকবাহী ট্রলার আছে। বছরে পাঁচ থেকে ছয় মাস এসব নৌ-পরিবহন সচল থাকে। উদ্যোগ নিলে সারা বছর এই জেলাকে পর্যটনবান্ধব করা সম্ভব মনে করছেন পর্যটন উদ্যোক্তারা।
রাজধানীর নৌ-পর্যটন উদ্যোক্তা মাসুক উর রহমান বললেন, সীমান্ত নদীগুলোকে খনন, কালচারালই সমৃদ্ধ এই জেলার পর্যটন এলাকায় গানের আবহ্ তৈরি, হাওর-পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যকে কাজে লাগিয়ে সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে হোটেল- মোটেল ও কটেজ স্থাপন করলে সারাবছর পর্যটন বান্ধব হবে এই জেলা।
মাসুক উর রহমানের মতে টাঙ্গুয়ার হাওরে আসা পর্যটকদের যারা শিশু-কিশোর সঙ্গে নিয়ে আসেন, তারা হাউস বোটে রাত্রী যাপন করতে ভয় পান। আবার হোটেল, মোটেল-রিসোর্ট না থাকায় দিনের মধ্যেই ফিরেন তারা। আসা-যাওয়ায় সময় চলে যাওয়া এবং পথকষ্টের জন্যও এখানে অনেকে আসেন না। হাওর ও পাহাড়ের ভিউকে কাজে লাগিয়ে সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে হোটেল- মোটেল, রিসোর্ট গড়ে ওঠলে পর্যটক বাড়বে।
স্থানীয় নৌ-পর্যটন উদ্যোক্তা কাশমির রেজাও একই ধরণের মন্তব্য করে বললেন, যোগাযোগের সকল অব্যবস্থা দূর করতে হবে। পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করতে হবে স্থানে স্থানে।
জেলা প্রশাসক জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, পর্যটনে সুনামগঞ্জের রয়েছে অপার সম্ভাবনা। জেলা ব্র্যান্ডিং হিসেবে পর্যটনকে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গ্রহণ করা হয়েছে বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা। ইতোমধ্যে বারেকের টিলায় ২০ একর জমি পর্যটন কর্পোরেশনকে নামেমাত্র মূল্যে দেবার প্রশাসনিক অনুমোদন হয়েছে। ওখানে পর্যটকদের ছোট ছোট কটেজ হবে। খাবারের হোটেল রেস্তোরা থাকবে। জামালগঞ্জ-ধর্মপাশা উড়াল সড়কের (শেখ হাসিনা উড়াল সড়ক) সঙ্গে তাহিরপুরের বারেকের টিলার সংযোগ সড়ক থাকবে। বারেকের টিলার পাশের জাদুকাটা নদীতে সেতুর কাজ শেষের পথে। এসব উন্নয়ন কাজ শেষ হলে সুনামগঞ্জের স্থানীয় শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের ‘পর্যটক গাইডের’ চাকুরি দেওয়া হবে। তারা এখানে আসা পর্যটকদের গাইড করবেন।