পুলিশের বিরুদ্ধে মনগড়া এজাহারে মামলা দায়েরের অভিযোগ

বিশেষ প্রতিনিধি
ধর্মপাশার সুনই জলমহালের দখল নিয়ে প্রতিপক্ষের হামলায় এক জেলে নিহতের ঘটনায় পুলিশ মনগড়া এজাহার দিয়ে মামলা নিয়েছে বলে থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন নিহতের ছেলে চন্দন বর্মণ। মঙ্গলবার সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপারের নিকট চন্দন বর্মণ এই বিষয়ে ব্যবস্থা নেবার জন্য লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
সুনই মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি চন্দন বর্মণ লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেছেন, সুনই মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি সকল আইনী প্রক্রিয়া মেনে সুনই নদী জলমহাল উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ৬ বছরের জন্য বন্দোবস্ত নেয়। কিন্তু এজাহারে উল্লেখিত আসামীগণ বৃহস্পতিবার রাতে মারাত্মক অস্ত্রসস্ত্রে সজ্জিত হয়ে জলমহালের পাড়ে থাকা খলায় হামলা করে তাঁর বাবা শ্যামাচরণ বর্মণকে খুন করে। খলা জ¦ালিয়ে দেয়। এ ঘটনায় গত শনিবার মামলা দায়েরের জন্য ঘটনায় জড়িত ৬৩ জনের নামোল্লেখ করে থানায় এজাহার নিয়ে যান তিনি। পুলিশ তাদের মামলা গ্রহণ করে নি। কিন্তু পরদিন অজ্ঞাতনামা ৬৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়ে পুলিশের একজন সাব ইন্সপেক্টরকে বাদী করে থানায় একটি মামলা (নম্বর-৩, তারিখ ১০.০১.২১) হয়েছে।
লিখিত অভিযোগে তিনি দাবি করেছেন, প্রকৃত ঘটনাকে আড়াল করার জন্য ধর্মপাশা থানা পুলিশ এই মামলা নিয়েছে। এ ব্যাপারে পুলিশ সুপারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি। এই অভিযোগের সঙ্গে চন্দন বর্মণ তার নিজের দায়ের করা এজাহার কপিও পুলিশ সুপারের নিকট জমা দিয়েছেন। পরে পুলিশ সুপার কার্যালয়ের রিসিভ করা কপি সাংবাদিকদের দিয়েছেন চন্দন বর্মণ।
পুলিশ সুপারের কাছে দেওয়া চন্দন বর্মণের এজাহার কপিতে দেখা গেছে ওই দিনের ঘটনায় ৬৩ জনের নামোল্লেখ করেছেন তিনি। অভিযুক্ত ৬৩ জন হচ্ছেন- সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন, তার ভাই উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হোসেন রুখন, আরও দুই ভাই মোবারক হোসেন মাসুদ ও মোবারক হোসেন যতন। এছাড়া (যথাক্রমে) মাহাবুব আলম রিপন (৪৫), আ. ছালাম মুন্সি (৪৮), সোহরাব (৪৫), তমিজ উদ্দিন (৫২), খায়রুল (৫০), কাশেম (৫৫), শাহজাহান (৩৫), সোফেল (২৮), জাহাঙ্গীর (৩২), রনি খান (৩৮), সালমান শাহ (৩০), আবু জাহিদ (৫০), জুলহাস (৩২), স¤্রাট (৩৮), সাগর মিয়া (২৮), মনিরুজ্জামান মোহন (৩২), তানিন চৌধুরী (২৪), খোকন (৩৫), সুবল চন্দ্র বর্মণ (৫০), দিগেন্দ বর্মণ (৫০), গিয়াস উদ্দিন (৪২), সাগর বর্মণ (২৮), রিপন বর্মন (৩০), জানু খাঁ (২৫), রতন মিয়া (৫০), সামছুল হক চৌধুরী (৫৫), কবির মিয়া (৫০), স্বপন মিয়া (৫০), বাতেন মিয়া (৪২), তুফাজ্জল (৪০), চান মিয়া (৪৫), রুবেল (২৮), হালিম (২৫), শরীফ (২৮), মানিক(২৫), তানভির হোসেন সাগর (২৬), মোতালিব (৫৫), আব্দুল মোতালিব (৪০), আতাহারুল (৩০), মিয়া খাঁ (৪০), মনো মিয়া (৪০), কালাম (২৬), আনিস (৩২), পিন্টু (৩২), জসিম উদ্দিন (২৭), সোহেল (৩০), জুয়েল (৪০), পিয়াস (২৮), শাহবাজ (৪৮), আমির খাঁ (৪২), সোহেল (৩৫), নয়ন (৪০), মর্ত্তুজ আলী (৪২), জহুর উদ্দিন (৪৫), শাহজাহান মেম্বার (৬৫), বকুল মিয়া (৪৮), মহিউদ্দিন আহম্মেদ কনিক (৩৫), সোনা মিয়া (৫০) ও জায়েদ মিয়া (৫২)।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, বহুল আলোচিত সুনই জলমহালে সুনই মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি সকল আইনি প্রক্রিয়া মেনে উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ইজারা নিলেও জলমহালটি দখল করতে সমিতির লোকজনকে নানাভাবে হুমকি দিয়ে আসছিলেন সংসদ সদস্যের ভাই মোয়াজ্জেম হোসেন রতনসহ অন্যরা। এর জের ধরেই ৭ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার রাতে জলমহালে হামলা চালানো হয়।
অভিযোগ প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বলেন, চন্দন বর্মণের অভিযোগ তিনি পেয়েছেন। কিন্তু তাতে তাঁর কিছুই করার নেই। চন্দন বর্মণ মামলা না দেওয়ায় ধর্মপাশা থানার পুলিশ ১০ জানুয়ারিতে বাধ্য হয়ে মামলাটি নিয়েছে আইন প্রক্রিয়া চালানোর জন্য। চন্দন বর্মণ এই বিষয়ে আদালতে মামলা দায়ের করতে পারেন বলে জানান তিনি।
প্রসঙ্গত, সুনামগঞ্জের ধর্মপাশার বৃহৎ জলমহাল সুনই নিয়ে দুই মৎস্যজীবী সমিতির দ্বন্দ্ব চলছিল দুই বছর ধরে। জলমহালের খাজনা পরিশোধ করে দুই পক্ষই মহালের মালিকানা দাবি করে আসছে। সম্প্রতি চন্দন বর্মনের পক্ষ স্থানীয় সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন ও তাঁর ভাই উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোজাম্মেলন হোসেন রোকনের বিরুদ্ধে জাতীয় প্রেসক্লাবে মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন করেছিল।
এই দ্বন্দ্বের জের ধরে ৭ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮ টায় জলমহালে পাড়ে থাকা একপক্ষের মাছের খলায় আরেকপক্ষ আগুন ধরিয়ে দেয়। প্রতিপক্ষের লোকজন সুনই গ্রামের সুনই মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লি. এর সভাপতি চন্দন বর্মনের পিতা শ্যামাচরন বর্মণকে গলা করে হত্যা করে। এসময় উভয় পক্ষের কমপক্ষে ২৫ জন আহত হয়। জলমহালে থাকা একপক্ষের স্থাপনা (খলা) পুড়িয়ে দেওয়া হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে নিহতে শ্যামাচরণ বর্মণের লাশ উদ্ধার করে। বৃহস্পতিবার রাতেই ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহে পুলিশ ২৩ জনকে আটক করে পরদিন আদালতে সোপর্দ করে।