পূজায় উৎসব নেই

সজীব দে
শারদীয় দুর্গাপূজা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সব থেকে সেরা উৎসব। সারা বছর এই পাঁচ দিনের অপেক্ষায় সবাই পথ চেয়ে বসে থাকেন। কিন্তু এবার কোভিড ১৯ এর কারণে পারস্পরিক দূরত্ব বজায় রাখার নিয়ম জারি রয়েছে। মন্ডপে জমায়েত নিষেধ। এজন্য এবার আরতি প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাটক বা কোন আনন্দ আয়োজন হচ্ছে না। আতসবাজি ও পটকা না ফাটানো, ভক্তিমূলক সংগীত ছাড়া অন্য কোনো গান বাজানো, সন্ধ্যার আরতির পর দর্শনার্থীদের প্রবেশে যেন নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। এবার পূজার অনুষ্ঠানমালা ধর্মীয় রীতিনীতি অনুসরণ করে পূজা-অর্চনার মাধ্যমে মন্দির প্রাঙ্গণেই সীমাবদ্ধ থাকছে।
পূজা কমিটির নেতৃবৃন্দসহ অনেকেই বলছেন, যেখানে মিলনের উপরেই নিষেধাজ্ঞা, সেখানে উৎসব হয় কী করে? তাই এ বছর দুর্গাপূজা আছে, কিন্তু দুর্গোৎসব নেই। এবার পূজা মনে-মনে, নিষ্ঠায়, ভক্তিতে, আরাধনায়। করোনাভাইরাস দূর হোক, সামনের বছর তো আবার আসবেন মা। এ বছর হল না, সামনের বছর নিশ্চয়ই হবে দুর্গোৎসব, মিলনের উৎসব।
উত্তর নতুনপাড়া সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি সত্যজিত চৌধুরী মৃদুল বলেন, সরকারের নির্দেশনা মেনে পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। যথাবিধি নিয়ম মেনে মায়ের পূজা করা হচ্ছে। দূরত্ব বজায় রাখতে কয়েক স্টেপে অঞ্জলি প্রদান করা হচ্ছে। সেখানেও অল্প লোককে রাখা হবে। এবার বাড়তি কোন আনন্দ আয়োজন নেই। দর্শনার্থীদের জন্য হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। যারা মাস্ক ছাড়া আসবেন তাদের মাস্ক দেয়া হবে। হ্যান্ড স্যানিটইজারও রাখা হবে।
শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ আশ্রমের সাধারণ সম্পাদক যোগেশ্বর দাশ বলেন, করোনা মহামারীর কারণে যথাসম্ভব সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। শাস্ত্রমতে পূজাটুকুর বাইরে এ বার কোনও উৎসব পালন হবে না। অন্যবারের মতো নাটক বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হচ্ছে না। শুধু গত শুক্রবার মহা সপ্তমীতে বস্ত্র বিতরণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, কয়েক ধাপে অঞ্জলি দেওয়ার পর প্রসাদ দিয়ে সকলকে মন্দির চত্বর থেকে বের করে গেট বন্ধ করে দেয়া হয়। দর্শণার্থীদের জন্য বিকাল ৪ টা থকে রাত ৮ টা পর্যন্ত মন্দিরের গেট খোলা থাকবে। ভেতরে যাতে দর্শনার্থীরা বেশিক্ষণ অবস্থান করতে না পারেন, সে জন্য মন্দির চত্বরে এবার চেয়ার রাখা হয়নি। ভলান্টিয়াররাও কাউকে বেশিক্ষণ অবস্থান করতে দিচ্ছেন না।
পূর্ব নতুন পাড়া সার্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক লিটন চন্দ্র রায় বলেন, প্রতিবার যে জমকালো আলোকসজ্জা হয় সেটা এবার আমরা করছি না। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা নাটকও হচ্ছে না। স্বাস্থ্যবিধি মেনে পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে অঞ্জলি প্রদানের জন্য মণ্ডপে নিরাপত্তামূলক সার্কেল করা হয়েছে। কয়েক ধাপে অঞ্জলি প্রদান করেছেন ভক্তরা। হাত ধোয়ারও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছাড়াও মহনবমীতে বাসায় বাসায় প্রসাদ পৌঁছে দেয়া হবে। অতিথিদের জন্য শুকনো প্রসাদের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
সার্বজনীন দুর্গাবাড়ী পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুবিমল চক্রবর্তী চন্দন বলেন, যথাবিধি নিয়ম মেনে পূজা অর্চনা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দূরত্ব বজায় রেখে অঞ্জলি প্রদান করা হচ্ছে। প্রতিদিন মায়ের পূজার পর সীমিত আকারে উপস্থিত ভক্তদের মাঝে প্রসাদ বিতরণ করা হচ্ছে। সাংস্কৃতিক বা ভক্তিমূলক সংগীতানুষ্ঠান এবার হচ্ছে না। এছাড়াও দর্শনার্থী যারা আসছেন তাদের মাস্ক পরিধান করার ও শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, এবার আমরা মাকে মন্দিরে স্থাপন করছি। এখন থেকে আর বিসর্জন হবে না। শিবের মতো প্রতিদিন মন্দিরে মায়ের পূজাও হবে। এটাই এবার আমাদের পূজার বিশেষ আকর্ষণ।
জগন্নাথবাড়ী জয়দূর্গা পূজা কমিটির সভাপতি মতিলাল চন্দ বলেন, বর্তমান পরিস্থিতির কারণে অতিরিক্ত কোন অনুষ্ঠান আয়োজনের সুযোগ নেই। নিয়মনীতি অনুসরণ করে মায়ের পূজা করা হচ্ছে। মহাসপ্তমীর রাতে মন্দিরের ভেতরে সীমিত আয়োজনে ছোট ছেলেমেয়েরা ভক্তিমূলক গান করেছে।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সদস্য সচিব ও বাঁধনপাড়া সার্বজনীন পূজা কমিটির সহ সভাপতি অ্যাড. অনুপ কুমার ধর বলেন, পূজা উদযাপন পরিষদ ও স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশনা মেনে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সাংস্কৃতিক আয়োজন এবার থাকছে না। দর্শনার্থীদের মাস্ক পরিধান করে প্রবেশ করার জন্য এবং দূরত্ব বজায় রাখার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে। এছাড়াও সন্ধ্যার পর দর্শণার্থীদের মণ্ডপে প্রবেশে আমরা নিরুৎসাহিত করছি।
জগন্নাথপুর পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নয়ন বর্মন বলেন, নিয়ম মেনে যথাবিধি পূজা করা হচ্ছে। অতিরিক্ত কোন আয়োজন নেই। তবে প্রসাদ বিতরণ ও আরতি অনুষ্ঠিত হবে।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অ্যাড. বিমান কান্তি রায় বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে সুন্দরভাবে পূজা উদযাপিত হচ্ছে। পূজা উদযাপন পরিষদের পক্ষ থেকে করা মনিটরিং সেল সার্বক্ষণিক খোঁজ খবর রাখছেন। উপজেলা কমিটিগুলোও পৃথকভাবে মনিটরিং সেল করে সার্বক্ষণিক তদারকি করছেন। পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দরাও জেলা ও উপজেলার মণ্ডপগুলো ঘুরে ঘুরে দেখছেন।