পৃথক সংগীত বিদ্যালয় দাবি, আর্থিক সংকটে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো

পুলক রাজ
সংস্কৃতি মানুষকে অপরাধ থেকে দূরে রাখতে সহায়তা করে। এজন্যই সংস্কৃতি চর্চা আবশ্যকীয় মনে করা যায়। সংস্কৃতি মানে মার্জিত চিন্তাধারা, যেই চেতনার সৌন্দর্য সবাইকে আকর্ষিত করে, অনুকরণীয় করে এবং আত্মশুদ্ধির সফল মাধ্যমও বলা যায়। সাহিত্য, সংগীত, থিয়েটার, শিল্প হচ্ছে সংস্কৃতির প্রমিত স্টেশন, সেসব স্টেশনের কোনো যাত্রী সমাজ, রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হয় না। তারা নিজের ভেতর এক ধরনের মানবিক বিশ্ব সৃষ্টি করে থাকেন।
সুনামগঞ্জ সংস্কৃতি চর্চার আঁতুড়ঘর হলেও এখানকার সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর পরিবেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন। সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে সমৃদ্ধ করতে সংগঠক ও সংস্কৃতিকর্মীদের প্রয়াস থাকলেও সংগঠনগুলোর ভিত শক্তিশালী করতে কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে না। প্রশাসন থেকে যথাযথ সহযোগিতা না করা, সর্বোপরি অর্থ সংকটে এর বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক সংগঠনে কর্মী সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। এ ছাড়াও অনেক সংগঠন স্থায়ী অনুশীলন কেন্দ্র এবং অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে কার্যক্রম পরিচালনা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। অনেক সংগঠন অস্থায়ীভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রশিক্ষকদের বেতন দিতে হিমশিম খেতে হয় সংগঠনগুলোকে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে যে আর্থিক অনুদান দেয়া হয় তা দিয়ে সংগঠন চলে না। এদিকে জেলার সকল সাংস্কৃতিক সংগঠনের জন্য একটি স্থায়ী স্কুল করে দেয়ার দাবি জানিয়েছেন অনেকে।
সুরালোক সংগীত বিদ্যালয়ের সভাপতি সন্তোষ কুমার চন্দ বলেন, ২০০৬ সালে নতুনপাড়ার মুন্নিদির বাসায় আমি, মুন্নি দি, মাহবুবা চৌধুরী মিলে সুরালোকের প্রতিষ্ঠা করি। ধ্রুব পরিষদের আন্ডারে সুরালোক আছে। রবিন্দ্র, নজরুল, রাগাশ্রয়ী, লোক, তবলা বিষয়ে বছরে একবার পরীক্ষা নেয়া হয়। এসব বিষয়ে সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়। আমাদের মূল সমস্যা হলো অনুশীলন কেন্দ্র নেই। পুরো বাসা ভাড়া না করলে হয় না। যেহেতু সুরালোক ছোট স্কুল তাই বড় বাসা ভাড়া নিয়ে ১০ বা ১৫ হাজার টাকা দেয়ার আর্থিক স্বচ্ছলতা আমাদের নেই।
শুদ্ধ সংগীত পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক রবীন্দ্র রায় বলেন, বেসরকারী সংগীত শিক্ষা বোর্ড ধ্রুব পরিষদের সিলেবাস অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। প্রতি বৎসর শাস্ত্রীয় সংগীত, রবীন্দ্র সংগীত, নজরুল সংগীত ও তবলা বিষয়ে পরীক্ষা গ্রহণ এবং উত্তীর্ণ ছাত্র/ছাত্রীদের মাঝে সনদ বিতরণ করা হয়।
শিক্ষার্থীদের শুদ্ধভাবে সংগীত চর্চায় তৈরী করে স্থানীয় মান থেকে জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছানো এবং সুনামগঞ্জের লোকসংস্কৃতিকে সঠিক সুরে বিশ্বের দরবারে পৌঁছানো এই দুই লক্ষ ও উদ্দেশ্য আমাদের, বললেন রবীন্দ্র রায়।
শতদল শিল্পী গোষ্ঠী ও সংগীত বিদ্যালয়ের পরিচালক অরুণ তালুকদার বলেন, স্কুল থেকে প্রতি বৎসর সংগীত প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা ও সংগীত বিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীদের বার্ষিক মূল্যায়ন পূর্বক সনদ প্রদান করা হয়। সংগীত বিদ্যালয়ে ৬৫ জন ছাত্র ছাত্রী আছেন। পুরাতন শিল্পকলায় ক্লাস করানো হয়। ১০০ টাকা করে প্রতি মাসে মাসিক ফি নেওয়া হয়। তিনজন শিক্ষক ক্লাস করান। স্কুল চালাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়।
স্পন্দন সংগীত বিদ্যালয়ের পরিচালক অ্যাড. অলক ঘোষ চৌধুরী বলেন, ১৯৯৬ সালে বিদ্যালয়টি স্থাপিত হয়। প্রতি শুক্রবার সকাল ১০ টা থেকে বিকাল ৩ টা পর্যন্ত সংগীতের ক্লাস করানো হয়। নতুনপাড়া শাখায় শুক্রবার বিকাল ৪ টা থেকে সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত ক্লাস করানো হয়। লোক সংগীত, দেশাত্মবোধক, নজরুল সংগীত, রবীন্দ্র সংগীত, উচ্চাঙ্গ সংগীত বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হয়। শুরুতে শিশুদের সারগাম গীত, লক্ষণগীত ১ ঘন্টা করানো হয়। শিশুরা যখন উচ্চাংগ সংগীত শিক্ষার উপযোগী হয় তখন তাদের উচ্চাঙ্গ সংগীতের ক্লাসে পাঠানো হয়। তারা বিভিন্ন রাগের উপর খেয়াল পরিবেশন করে। উচ্চাঙ্গ সংগীতের পর তাদের নজরুল ও রবীন্দ্র সংগীতে তালিম দেওয়া হয়। হাছননগরের স্কুলে ছাত্র ছাত্রী আছে ৬৫ জন, নতুনপাড়া শাখায় আছে ২২ জন। আমাদের আরেকটা শাখা হাছননগরে করার চিন্তা ধারা ছিলো কিন্তু আর্থিক সমস্যার জন্য করতে পারছি না।
সুন্দরম সংগীত বিদ্যালয়ের পরিচালক শুক্লা রায় চৌধুরী বলেন, আমার বিদ্যালয়টির নিজস্ব কোন স্থান নেই। ভাড়ার বিনিময়ে বিদ্যালয় চালাতে হয়। শিক্ষকদের বেতন আমি আমি ঠিক সময় দিতে পারি না। অনেক ছাত্র ছাত্রীকে বিনা বেতনে শিক্ষা দান করে যাচ্ছি। আমার সংগীত শিক্ষাদানের উদ্দেশ্য হলো তারা যেন শুদ্ধ সংগীত শিখে।
লোকদল সংগীত বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বিধান বনিক বলেন, আমরা স্কুলটা চালাতে গিয়ে খুব কষ্টে আছি। অর্থনৈতিকভাবে আমরা খুব দুর্বল। আমাদের সংগঠনে চারজন সংগীত প্রশিক্ষক রয়েছেন। তাদের বেতন দিতে আমাদের সমস্যা হয়। ১৯৯৮ সন থেকে শিক্ষার্থী প্রতি আমরা ২০০ টাকা করে ভর্তি ফিস নিচ্ছি। এখন মাসে ১০০ টাকা করে মাসিক ফি নিচ্ছি। বেতন বাড়ানোর জন্য তাদেরকে কোন সময় বলি না।
তিনি বলেন, সংস্কৃতিক মন্ত্রণালয় থেকে আমরা যে আর্থিক অনুদান পাচ্ছি তা দিয়ে বিদ্যালয় চলে না। আমার দাবি সাংস্কৃতিক বিদ্যালয়গুলোর জন্য যেনো একটি সাংস্কৃতিক বিদ্যালয় করে দেয়া হয়।