প্রকৃতি বিরূপ হওয়ার আগেই বাঁধের কাজ শেষ করুন

ফসল রক্ষায় হাওরের বাঁধ নির্মাণের জন্য সরকার নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রান্ত হয়েছে। মেয়াদ শেষ হলেও জেলার ৭৪৯টি পিআইসি’র একটির কাজও শেষ হয়েছে বলে জানা যায়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, নির্ধারিত শেষ তারিখে বাঁধের কাজ ৭৫ ভাগ শেষ হয়েছে। কিন্তু উল্টো তথ্য দিয়েছেন ফসলরক্ষা বাঁধ নিয়ে গড়ে উঠা সংগঠন হাওর বাঁচাও আন্দোলন নেতৃবৃন্দ। তাঁদের বক্তব্য মোতাবেক কোথাও কোথাও ৫০-৬০% কাজ শেষ হলেও অনেক বাঁধে ৩০ ভাগ কাজও শেষ হয়নি। এই পরস্পরবিরোধী তথ্য দানের মধ্য দিয়েই শেষ হলো বাঁধের কাজ শেষ করার নির্ধারিত তারিখ ২৮ ফেব্রুয়ারি। এদিকে প্রকৃতি পূর্বাভাস দিতে শুরু করেছে। মৃদু বৃষ্টিপাত হয়েছে কয়েকদিন আগে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় অত্যাসন্ন। ২০১৭ সনে ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই পাহাড়ি ঢলে হাওর ডুবতে শুরু করেছিল। সেই ভয়াবহ স্মৃতির দুঃস্বপ্ন এখনও হাওরের কৃষকদের তাড়িয়ে বেড়ায়। আর তাড়িয়ে বেড়ায় বলেই বাঁধের কাজ নিয়ে কথাবার্তা একটু বেশিই হয়। গণমাধ্যমের পর্যবেক্ষণ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাথে মিলে না। এ পর্যন্ত গণমাধ্যমে যেসব রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে তাতে বাঁধের কাজ গড়ে অর্ধেক শেষ হয়েছে বলে মনে হয় না। মাটির কাজ হয়তো অধিকাংশক্ষেত্রে এগিয়েছে কিন্তু সঠিকভাবে কমপেকশন, স্লোপ নির্মাণ, বাঁশ পোঁতা, ঘাস লাগানো; এমনসব কাজের অগ্রগতি মোটেই সন্তোষজনক নয়। এখনও কোনো কোনো উপজেলায় কাজের নি¤œগতির জন্য পিআইসি সভাপতি সম্পাদকদের আটক, মুচলেকা গ্রহণ, জরিমানা করা হচ্ছে। নির্ধারিত তারিখে যদি কাজ শেষই না হবে তাহলে এই মেয়াদ নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা কী ছিল তা আমরা বুঝি না। এখন সর্বত্র তাড়াহুড়ো দেখা যাবে। হুড়মুড় করে কাজ শেষ করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাবে সর্বত্র। এতে কাজের মানের ক্ষেত্রে ঘটবে ভীষণ অবনতি। আবহাওয়া অনুকূল থাকলে পিআইসিদের পোয়াবারো। তারা যেনতেন কাজ করেই বিল তোলার মওকা খুঁজবে। আর যদি প্রকৃতি বিরূপ আচরণ করে তাহলে কপাল পুড়বে কৃষকের-বাংলাদেশের। যে বেনিয়াবৃত্তি পিআইসিগুলোতে অনুপ্রবিষ্ট হয়েছে এবার, তাতে কৃষকের সর্বনাশ হলেও তাদের মন বিন্দুমাত্র টলবে না।
জেলা প্রশাসন আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন বাঁধের কাজ শেষ করতে। তাঁরা প্রতিনিয়ত হাওরে হাওরে ছুটে বেড়াচ্ছেন। যেখানেই অসংগতি দেখছেন সেখানেই প্রতিকার বাতলে দিচ্ছেন। কিন্তু প্রভাবদুষ্ট পিআইসিগুলো তাতে কমই পাত্তা দিচ্ছে। আমাদের দেশটি এখন কোনো ধরনের ব্যবস্থাকেই ধারণ করতে পারছে না। ঠিকাদারি গেল, পিআইসি ব্যবস্থাটিও সমালোচিত, ভবিষ্যতে কী? এমন প্রশ্ন এখন থেকেই ঘুরপাক খাচ্ছে। আবারও পুনর্মুষিকভব যাত্রা ? কৃষকের ত্রাহি দুরবস্থা যাচ্ছে। উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য নেই। ঝুঁকিপূর্ণ ধান চাষাবাদ। সবকিছু মিলিয়ে ধান চাষের প্রতি ক্রমান্বয়ে আগ্রহ হারাচ্ছে কৃষক সমাজ। এই চরম সর্বনাশা প্রক্রিয়া ঠেকাতে নীতিনির্ধারকদের আশ্চর্য নির্লিপ্ততা আমাদের অবাক করে। বাংলাদেশের মেরুদ- কৃষি। মেরুদ- ভেঙে পড়লে দেশটি দাঁড়াবে কিসের জোরে ? এর কোনো উত্তর নেই। উত্তর খোঁজার প্রয়াস অনুপস্থিত। সুতরাং এক অনিশ্চিত গন্তব্যে যাচ্ছে আমাদের ধান চাষ।
বাঁধের কাজে নিয়োজিত পিআইসি ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আমাদের আহ্বান, দ্রুত কাজ শেষ করতে যা করণীয় দ্রুত তা করুন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ শুরু হওয়ার আগেই কাজ শেষ করুন। বিশেষ করে যেসব বাঁধ হাওরের জন্য অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ সেগুলোর দিকে নজর দিন বেশি করে। এবার অনেক অপ্রয়োজনীয় বাঁধ হচ্ছে। সেগুলোর কী পরিমাণ কাজ হচ্ছে তাও নজরে রাখুন। আংশিক কাজ করে যাতে কেউ সম্পূর্ণ টাকা তুলতে না পারে সেটি নিশ্চিত করুন। গণমুখী পিআইসি ব্যবস্থাটিকে টিকিয়ে রাখতে এই খাতে গজিয়ে উঠা আগাছা সমূলে উৎপাটিত করতে হবে। নতুবা কৃষকের বিপদ, দেশের বিপদ।