প্রচার বিলাসিতার জন্য সরকারি টাকা নয়

কেন্দ্রীয়ভাবে যখন কোনো স্থাপনার ডিজাইন আসে তখন স্থানীয়ভাবে সেই ডিজাইন পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। অথচ ধর্মপাশা উপজেলায় তাই হয়েছে। নিছক ব্যক্তিবিশেষের প্রচার বিলাসিতার কারণে ডিজাইন পরিবর্তন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নীচে তাদের দুই ভাইয়ের ছবি লাগানো হয়েছে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি খবর থেকে জানা যায়, মধ্যনগর সেতু সংলগ্ন এলাকায় একটি ম্যুরাল স্থাপনের জন্য ধর্মপাশা উপজেলা প্রকৌশল অফিস থেকে ১০ লাখ টাকা ব্যয়ের কার্যাদেশ জারি করা হয়। ম্যুরালের একপাশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যপাশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি থাকার কথা। কিন্তু কার্যােেদশের ডিজাইন পরিবর্তন করে প্রধানমন্ত্রীর ছবির নীচে ওই আসনের সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন ও তাঁর সহোদর ধর্মপাশা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হোসেন রুকনের ছবি দেয়া হয়েছে। বিষয়টি কেবল বিধিবহির্ভূতই নয়, এটি ভীষণ রকমের দৃষ্টিকটু ও নি¤œরূচির পরিচায়ক।
সংবাদ তথ্য অনুসারে ওই কাজের কার্যাদেশপ্রাপ্ত ঠিকাদার মো: ইজাজুর রহমান রানা নিজে কাজটি করেননি। ঠিকাদার বলেছেন, তাঁর কাছ থেকে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান লাইসেন্স নিয়ে জনৈক চুন্নু মিয়াকে দিয়ে কাজটি করিয়েছেন। চুন্নু মিয়া গণমাধ্যমকে বলেছেন, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের কথায় তিনি ডিজাইন পরিবর্তন করেছেন। স্পষ্টতই এখানে ক্ষমতার অপপ্রয়োগ ও স্বেচ্ছাচারিতা দেখানো হয়েছে। এই উপজেলায় এর আগেও নির্ধারিত ঠিকাদারের পরিবর্তে অন্য লোককে দিয়ে কাজ করানোর কথা আমরা জানি। আলোচ্য ক্ষেত্রেও তাই হলো। তার অর্থ দাঁড়ালো ধর্মপাশায় সরকারের নির্দেশাবলী বহুক্ষেত্রে অচল। ব্যক্তিবিশেষের ইচ্ছা অনিচ্ছার গুরুত্ব বেশি। অথচ উপজেলায় সরকারি নিয়ম প্রতিপালনের জন্য বেতনভুক্ত সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা রয়েছেন। উপজেলা প্রকৌশল অফিস প্রধানত এই কাজের তদারকী ও বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান। কাজ চলাকালে ডিজাইন পরিবর্তনের বিষয়টি কেন তাঁদের গোচরিভূত হলো না? অবস্থা দৃষ্টে বুঝা যায় ওই অফিসটি ব্যক্তিবিশেষের ইচ্ছের পরিবর্তে সরকারি স্বার্থ ও নিয়ম রীতি পালনের জন্য দায়িত্ব পালনে খুব বেশি আগ্রহী নন। নতুবা কাজ চলাকালেই এই অনিয়মটি ধরা পড়ত। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বক্তব্যও খুব বেশী দায়িত্বপূর্ণ নয়। তিনি বিষয়টি জানেন না বলে জানিয়েছেন। অবশ্য এইভাবে ডিজাইন পরিবর্তন করা যায় না বলে তিনি স্বীকার করেছেন। বলেছেন, সঠিক ডিজাইন অনুসারে কাজ করার জন্য তিনি ঠিকাদারকে নির্দেশ দিবেন। প্রশ্ন আসেÑ কোন্ ঠিকাদারকে তিনি নির্দেশ দিবেন। কাগজপত্রের ঠিকাদার তো কাজই করেননি। কাজ করেছেন অন্য লোক। এই যে নির্ধারিত ঠিকাদারের পরিবর্তে আরেকজনকে দিয়ে কাজ করানো হলো, এই অন্যায় কাজটি একটি উপজেলায় কীভাবে নির্বিঘেœ চলতে পারে? আর কেনই বা কাজ চলাকালীন কাজের অনিয়ম জানা যাবে না, যেখানে নিয়মিত পরিদর্শন করার মাধ্যমে কাজের মান যাচাই করার বিধান রয়েছে।
কারও প্রচার বিলাসিতাজনিত শখ পূরণের জন্য সরকারি তহবিল খরচ করা যেতে পারে না। এই ধরনের মন মানসিকতা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির ভাবমূর্তির সাথে বেমানান। এরকম কর্মকা-ের মধ্য দিয়ে জনপ্রতিনিধিত্ব বিষয়ে জনগণের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছায়। এর বাইরে সরকারি কাজ বাস্তবায়নের সাথে জড়িত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দায়িত্ব কর্তব্য পালনে ব্যক্তি বিশেষের ইচ্ছা পূরণের যে বিপুল আগ্রহ ধর্মপাশায় লক্ষ করা যায় তাও আরেক বিপত্তি বটে। জনগণের করের টাকার ইচ্ছানুরূপ ব্যয় করার এই অভ্যাসটিও অস্বচ্ছতার দৃষ্টান্ত মাত্র। তাই ধর্মপাশায় ম্যুরালের ডিজাইন পরিবর্তনের মাধ্যমে নিজেদের ছবি প্রদর্শনের যে কাজ করা হলো তা উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সঠিকভাবে আইনসম্মত পদক্ষেপের আওতায় আনা প্রয়োজন বরে আমরা মনে করি।