প্রসঙ্গ : ধর্ষণ/ ‘সাজানো ধর্ষন ও সম্মতিক্রমে আলামত নষ্টের’ প্রাবল্য বিষ্ময়কর বটে

ডাক্তারি পরীক্ষায় ধর্ষণের আলামত না পাওয়া প্রসঙ্গে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরকে বলেছেন, ‘সাজানো ধর্ষণ, সম্মতিক্রমে আলামত নষ্ট করে হাসপাতালে আসার কারণে ফরাফল নেগেটিভ আসে’। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, গত তিন মাসে জেলার ৩৯ নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে মাত্র ১ জনের ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে বলে ডাক্তার সনদপত্র দিয়েছেন। বাকি ৩৮টি ক্ষেত্রেই রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে। অর্থাৎ এই ৩৮টি ক্ষেত্রে অন্তত ডাক্তারি পরীক্ষা মতে কোন ধর্ষণ সংঘটিত হয়নি। সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) গত জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ৫৯টি ধর্ষণ মামলার তথ্য জানিয়েছেন। ডাক্তারি রিপোর্ট নেগেটিভ আসার বিষয়কে বিবেচনায় নিলে বলতে হবেÑ প্রায় সবগুলো ধর্ষণ অভিযোগই মিথ্যা ও বানোয়াট। বাস্তবতা কি তাই? আমাদের সমাজ এতো সভ্য হয়ে উঠেছে কখন যে, ধর্ষণের মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটে না? তাহলে সমস্যাটা কোথায়? ডাক্তাররা যে রিপোর্ট দেন, সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে বিশেষায়িত জ্ঞানের কারণেই তাঁদের উপর এই ক্ষমতা ন্যস্ত করা হয়েছে। এই ধরনের বৈজ্ঞানিক বিষয় নিয়ে সাধারণ মানুষের মন্তব্যকে অগণ্য বিবেচনা করাই সংগত হবে। কিন্তু এর পরও কথা থেকে যায়, প্রায় সবগুলো ক্ষেত্রেই নেগেটিভ রিপোর্ট আসার বিষয়টি অবাক করার মতো বটে। অন্তত মানুষের মতামত তাই বলে। প্রায় সকলেই ‘সাজানো’ মামলা ও ‘সম্মতিক্রমে ধর্ষণের আলামত নষ্ট করে হাসপাতালে আসেন’, এরকম এক ভয়ানক সমাজচিত্র আমাদের মেনে নিতে হবে? কেন কেবল ধর্ষণের মতো স্পর্শকাতর বিষয়টিকেই মানুষ আরেক জনকে ফাঁসানোর কাজে ব্যবহার করছেন, এর উত্তর খোঁজাও জরুরি। আরও জরুরি, ডাক্তারি সনদ ও জনমতের মধ্যে যে বিশাল ব্যবধান রচিত হয়েছে তার সমাজতাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ হাজির করা। নতুবা বিচারের বাণী নিরবে নিভৃতেই কাঁদবে। বিচার ব্যবস্থা সাক্ষী ও প্রমাণ নির্ভর। ধর্ষণের ক্ষেত্রে ডাক্তারি সনদ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। যখন ধর্ষণের রিপোর্ট নেগেটিভ হয় তখন অভিযুক্ত ব্যক্তির অনুকূল হয়ে পড়ে পুরো প্রক্রিয়াটি। পক্ষান্তরে অভিযোগকারীর চোখের জলে সাগর তৈরি হয়ে যায়, যদি তিনি সত্যি সত্যিই এরকম ঘৃণ্য ঘটনার শিকার হয়ে থাকেন।
ধর্ষণের মতো সামাজিক অপরাধ থেকে আমাদের সমাজ কখনও মুক্ত ছিলো না। পারষ্পরিক সম্মতিতে ধর্ষণ সম্পাদিত হতে পারে না। তাই সম্মতিক্রমে আলামত নষ্ট করে হাসপাতালে আসার বক্তব্যটি ঠিক বুঝা গেল না। সম্মতিক্রমেই যদি আলামত নষ্ট করে ফেলা হয় তাহলে ভিকটিম কেন হাসপাতালে আসবে? ধর্ষণের মতো অপরাধের জায়গায় দুর্বল ব্যক্তিরাই এর শিকার হন। সবল ব্যক্তিরা বিভিন্নভাবে সমাজপ্রপঞ্চকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা সংরক্ষণ করেন। অপরাধ সংঘটনের পর থেকেই প্রভাবমত্ত অপরাধী নিজেকে বাঁচানোর সমস্ত কলাকৌশল শুরু করে দেয়। সমাজের অন্য প্রভাবশালী পক্ষগুলোও অপরাধীর পক্ষে দাঁড়িয়ে যায়। সমাজে বিরাজিত সবল আর দুর্বলের মধ্যে এই যে বাস্তবতা, তার কোনো প্রভাব রয়েছে কি-না রিপোর্ট নেগেটিভ আসার পেছনে, সমাজবিজ্ঞানীদের এখন এ নিয়ে কাজ করা উচিৎ। আমরা জানি, কিছু ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে দরিদ্র লোকদের ব্যবহার করা হয়ে থাকে। বিশেষ করে নারী নির্যাতন আইনে এর অপব্যবহার বেশি। কিন্তু সকল ঘটনাই সাজানো, এরকম সরল সিদ্ধান্ত আমাদের চোখে দেখা বাস্তবতার সাথে ঠিক মেলে না। আমাদের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার জায়গা এখানেই।
যে শিশুটি ধর্ষিত হয়েছে বলে তার পিতা-মাতা আহাজারি করছেন পথে পথে, যার রক্তমাখা প্যান্ট ও জুতো এখনও পুলিশ হেফাজতে রয়েছে, সেই শিশুটির বেদনাকে ধারণ করতে না পারার মতো অমানবিক সমাজ বাস্তবতার অবসান ঘটুক, নিরন্তর আমরা এই ধরনের কথাই বলে যাই।