প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটি, তথাকথিত শিক্ষিত নয়, আলোকিত মানুষদের দেখতে চাই

প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও সংসদ সদস্য মনোনীত একজন করে বিদ্যোৎসাহী নারী ও পুরুষ সদস্যের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সোমবার একটি নীতিমালা প্রকাশ করেছে। নতুন নীতিমালা অনুসারে এখন থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হতে হলে ন্যূনতম ¯œাতক পাস ও বিদ্যোৎসাহী সদস্যদের এসএসসি পাস থাকতে হবে। আপাত দৃষ্টিতে নীতিটি ভাল মনে হলেও আমাদের জাতীয় প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে এই নীতি প্রযুক্ত করা খুব সহজ হবে কি? উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রগতি এখনও আশানুরূপ পর্যায়ে উন্নীত হয়নি। যারা ¯œাতক পাস করেন তাদের কয়জন এলাকায় বসে সমাজসেবায় নিয়োজিত থাকেন সেটিও বিবেচ্য বিষয়। পড়াশোনা শেষ করে সকলেই কাজের পিছনে ছুটেন। এখন নীতিমালার বাধ্যবাধকতা থাকার কারণে দেখা যাবে অনেক বিদ্যালয় এলাকায় নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পন্ন উৎসাহী ও উপযুক্ত ব্যক্তিই খোঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এইসব জায়গায় কি ব্যবস্থাপনা কমিটির এই পদগুলো শূন্য থাকবে? গণমাধ্যমে নীতিমালার যতটুকু প্রকাশিত হয়েছে তাতে বিষয়টি স্পষ্ট নয়। এছাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি পদে আসতে কেবল কি শিক্ষাগত যোগ্যতাই বিবেচ্য বিষয় বলে পরিগণিত হওয়া উচিত? শিক্ষাগত যোগ্যতার চাইতেও এখানে যিনি সভাপতি হবেন শিক্ষার প্রতি তাঁর অনুরক্তি ও শিক্ষার প্রসারে তার আগ্রহ ও পরিকল্পনার বিষয়টি বেশি বিবেচনাযোগ্য হওয়া উচিত। কেবল ¯œাতক পাস করলেই যে তিনি শিক্ষানুরাগী হয়ে যাবেন এমনটি নয়। আমাদের দেশে বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রিহীন জনদরদী ও সমাজসেবী ব্যক্তি। বর্ণিত নীতিমালার কারণে এখন এইসব সমাজ হিতৈষী ব্যক্তির প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটিতে আসার পথ রুদ্ধ হল।
স্বশিক্ষিত বলতে একটি কথা প্রচলিত আছে। আমাদের চারপাশে বহু ব্যক্তির দেখা পাওয়া যায়, যারা তথাকথিত ডিগ্রিধারী বহু ব্যক্তির চাইতে বিবেচনাবোধ, পরিমিতিবোধ, সমাজচিন্তা, শিক্ষানুরাগ; ইত্যাদি ক্ষেত্রে অনেক অগ্রসর। শিক্ষার অগ্রগতিতে এই স্বশিক্ষিত ব্যক্তিদের ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটিতে শিক্ষিত ব্যক্তিকে আনার চাইতেও জরুরি বিষয় হলো এখানে টাউট বাটপারদের আগমন রোধ করা। শিক্ষিত হলেই তিনি টাউট বাটপার বা সুযোগ সন্ধানী অথবা ঝোপ বুঝে কোপ মারার অভ্যাসগ্রস্ত হবেন না, এমন কথা বলা যাবে না কিছুতেই। অপরাপর ক্ষেত্রে চোখ বুলালেই এমন কথার সত্যতা মিলবে। শিক্ষা মানুষের অন্তর্দৃষ্টিকে সমৃদ্ধ করে, ব্যক্তির যোগ্যতাকে আরও উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে যায়। শিক্ষার সাথে তাই সর্বাবস্থায় ভাল মানুষগুলোর সংযুক্ত রাখার ব্যবস্থা করাটা ভীষণ প্রয়োজনীয়। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখতে পাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পদবী দখল করে অনেকেই ধান্দাবাজ হয়ে উঠেন। এরা যেকোনো পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্ষতিকারক। নীতিমালায় এই ধান্দাবাজ শ্রেণির শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আগমন নিষিদ্ধ করার উপায় বর্ণিত থাকা কাম্য।
দেশের যেকোনো পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি হতে শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো বিধান নেই। নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়া কেউ যদি যেকোনো পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি কিংবা মন্ত্রী হতে পারেন তাহলে কেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটিতে আসা যাবে না? নীতিমালাটি স্ববিরোধী হয়ে গেল না কি? নীতিমালায় বাস্তবতার প্রতিফলন থাকতে হয়। নীতিমালা যারা প্রণয়ন করেন তাদের পূর্বাপর সবকিছু বিচার-বিশ্লেষণ করতে হয়। কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি কিংবা বিদ্যোৎসাহী সদস্যের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সম্ভবত আমাদের গ্রামীণ জনপদের সমাজ কাঠামো, শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর অবস্থান ও লভ্যতা ইত্যাদি বিষয়কে উপেক্ষা করা হয়েছে। তাই মন্ত্রণালয়ের উচিত হবে নীতিমালাটি পুনর্বিবেচনা করার। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটিতে তথাকথিত ডিগ্রিধারী শিক্ষিত লোক নয় বরং অন্তর্লোকের আলোতে উদ্ভাসিত আলোকিত মানুষদের আমরা দেখতে চাই।