প্রয়াত বিপ্লবী বরুণ রায়’র জন্মদিন আজ

স্টাফ রিপোর্টার
ভারতবর্ষ, পাকিস্তান, বাংলাদেশ তিনকালের একজন সজীব সাক্ষী বরুণ রায়ের জন্ম ১৯২২ সালের ১০ নভেম্বর। তিনি জন্মেছিলেন ভারতের বিহার রাজ্যের পাটনার এক ঐতিহ্যবাহী ও আলোকিত জমিদার পরিবারে। তার প্রকৃত নাম প্রসূন কান্তি রায়। তার পিতামহ রায় বাহাদুর কৈলাস চন্দ্র রায় বিহার রাজ্যের শিক্ষা বিভাগের আন্ডার সেক্রেটারি ছিলেন।
বরুণ রায়ের পিতা করুণা সিন্ধু রায় বিরাট জমিদার হলেও কৃষকদের দাবি নিয়ে সোচ্চার ছিলেন। প্রজাস্বত্বের নেতা হিসেবে করুণা সিন্ধু রায় কৃষকের মাঝে অমর হয়ে আছেন। বরুণ রায় সিলেট ছাতকের মিডল ইংলিশ স্কুল থেকে প্রাথমিক পড়া শেষ করে বর্তমান ব্রাম্মণবাড়িয়া জেলার কসবা থানাধীন মোগরা হাইস্কুলে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯৪২ সালে মেট্রিক (প্রবেশিকা) পাস করেন। ১৯৪৩ সালে সুনামগঞ্জ কলেজে আইএ ক্লাসে ভর্তি হন। ১৯৪৭ সালে আইএ পাস করে সিলেট এমসি কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু ১৯৪৮ সালে বিএ টেস্ট পরীক্ষার আগে ভাষা আন্দোলন শুরু হলে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ঠিক একই সময়ে কুখ্যাত নানকার শোষণের বিরুদ্ধে সিলেট শহরে অনশন পালিত হয়। অনশনের সমর্থনে বরুণ রায় শহরে মিছিল ও গোবিন্দ পার্কে সভা করেন। সভা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। এতে বরুণ রায়ের লেখাপড়ায় স্থায়ী ছেদ পড়ে। একটানা ৫৩ সাল পর্যন্ত জেলে আটক থাকেন। সিলেট জেলে তিন বছর থাকার পর তাঁকে রাজশাহী জেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পাঁচ বছর পর সেখান থেকে মুক্তি পেলেও গ্রামের বাড়িতে তাঁকে অন্তরীণ রাখা হয়। এর আগে কংগ্রেস ঘোষিত স্বাধীনতা দিবস পালন করতে গিয়ে ১৯৪২ সালে গ্রেপ্তার হয়ে কিছুদিন জেলে আটক ছিলেন।
মাত্র ২০ বছর বয়সে বরুণ রায় ১৯৪২ সালে ভারতীয় কমিউনিষ্ট পার্টির পূর্ণ সদস্য পদ লাভ করেন। পাকিস্তান সৃষ্টির পর ১৯৪৮ সালে সিলেট জেলা ছাত্র ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৫০ সালে সিলেট জেলা কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিনিধি নির্বাচিত হন। ওই বছরই জেলা কমিটির সদস্য, ১৯৬৬ সালে জেলা সম্পাদক ম-লীর সদস্য এবং ১৯৬৮ সালে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। এ ছাড়া কৃষক সমিতির জেলা ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও সহসভাপতির দায়িত্বে ছিলেন।
১৯৫৪ সালের নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক ফরমান জারি করলে বরুণ রায়কে আবারো গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় দীর্ঘ ৫ বছর কারাগারে থাকতে হয়। ১৯৬৮-৬৯ সালে গণ আন্দোলনের সময় তিনি প্রকাশ্যে চলাফেরা থেকে বিরত থাকেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ‘ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের’ যৌথ গেরিলা বাহিনীর সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে দেশের বুকে প্রতিক্রিয়াশীল মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তির পুনরুত্থান ঘটে। এ সময় থেকে দেশে প্রগতির ধারা অব্যাহত রাখা, মুক্তিযুদ্ধের সুফল ও অর্জন রক্ষা করা, সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তিকে প্রতিহত করার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ও প্রগতিশীলদের ঐক্য প্রতিষ্ঠায় নিরলস প্রচেষ্টা চালান।
১৯৮০ সালে জেনারেল জিয়াউর রহমানের আমলে তাকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৮৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (১৫ দলের প্রার্থী হিসাবে) কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী হিসাবে তিনি সুনামগঞ্জ- ১ আসন থেকে জয়লাভ করেন। ১৯৮৭ সালে এরশাদ-বিরোধী আন্দোলন চলাকালে তাকে আবার গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হয়। তিনি ১৯৯০ সালে বার্ধক্যের কারণে সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নেন। শেষ বয়সে তিনি মণি সিংহ-ফরহাদ স্মৃতি ট্রাস্টের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। কমরেড বরুণ রায় ৮ ডিসেম্বর ২০০৯ মৃত্যুবরণ করেন।
জীবনের ১৪টি বছর নির্জন কারাবাসে কাটিয়েছেন পাকিস্তানি অন্ধকার যুগের নন্দিত জননেতা বরুণ রায়। মাতৃভূমি ও জনগণের কল্যাণে জীবন উজাড় করে আজীবন সৎ, ত্যাগী ও নির্লোভ রাজনীতি করেছেন। জীবনের সুন্দরতম দিনগুলো কারাগারে ও আত্মগোপনে কাটিয়েছেন। সমাজ ও পারিপার্শ্বিকতায় তিনি তারুণ্যের মতো করেই দেখেছেন। বার্ধক্যের দিনগুলোতেও তারুণ্যের উদ্যমে সচল ও গতিশীল থাকতেন। এ জন্য যুবক-তরুণেরা তাঁকে শ্রদ্ধায় ভালোবাসায় সব সময় সিক্ত করেছে। প্রতিটি কালকে প্রত্যক্ষ করেছেন প্রাজ্ঞ রাজনীতিকের সচেতন দৃষ্টি দিয়ে। এ জন্য বরুণ রায় অত্যন্ত সৌভাগ্যবান। আমরা যারা তাঁর রাজনৈতিক জ্ঞানে আলোকিত হয়েছি আমরাও ভাগ্যবান এবং গর্বিত। ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর বার্ধক্যজনিত কারণে সুনামগঞ্জ শহরে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর স্ত্রী নারীনেত্রী শীলা রায় সুনামগঞ্জ জেলা উদীচীর সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। আর একমাত্র পুত্র সাগর রায় বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী।