বঙ্গবন্ধুর আমার দেখা নয়া চীন

অনুপ তালুকদার
হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি স্বাধীন বাংলার স্থপতি এবং জাতির পিতা। এ দেশের মানুষের স্বাধীনতার জন্য তিনি জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন কারাগারে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি ছিলেন ফরিদপুর কারাগারে। সেখান থেকেই খবর পেয়েছেন ঢাকায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে রাজপথে পুলিশের গুলিতে নিহতদের কথা, যাকে তিনি মুসলিমলীগ সরকারের অপরিণামদর্শিতার কাজ বলে অবিহিত করেছেন। কারাগার থেকেই তিনি তাঁর ডায়েরীতে লিপিবদ্ধ করে গেছেন জীবনের ঘটনাবহুল দিনগুলোর কথা যা পরবর্তিতে বঙ্গবন্ধুতনয়া বর্তমান প্রধানমন্ত্রি শেখ হাসিনার উদ্যোগে পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়। ১৯৫৪ সালে কারাগারে বসে রচনা করেন স্মৃতিনির্ভর ভ্রমণকাহিনি ‘আমার দেখা নয়া চীন’ গ্রন্থটি যেখানে রয়েছে ১৯৫২ সালে চীনের পিকিং-এ অনুষ্ঠিত এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় আঞ্চলিক শান্তি সম্মেলনে যোগদান করা তরুণ রাজনীতিক হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের অভিজ্ঞতার কথা।
১৯৫২ সালের রাষ্ট্র ভাষার দাবিতে বাংলার দামাল ছেলারা যখন রাজপথে রক্ত দিল ঠিক তার কয়েকমাস পরেই অর্থাৎ ২-১২ অক্টোবর উপরিউক্ত সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়। ফলে ভাষা আন্দোলনের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত একজন তরুণ গণমানুষের নেতাকে ভাষার জন্য শহীদদের স্মৃতি বিচলিত করেছিল। যেজন্য তিনি সেই সম্মেলনে বাংলায় বক্তৃতা করেন। আরও একজন ভারতীয় বাংলাভাষী সাহিত্যিক বাংলায় বক্তৃতা করেন যাঁর নাম মনোজ বসু (১৯০১-১৯৮৭)। এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু বলেন, “ পূর্ব বাংলার ছাত্ররা জীবন দিয়েছে মাতৃভাষার জন্য। বাংলা পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু লোকের ভাষা। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে না জানে এমন লোক চীন কেন দুনিয়ার অন্যান্য দেশেও আমি খুব কম দেখেছি। আমি ইংরেজিতে বক্তৃতা করতে পারি। তবু আমার মাতৃভাষায় বলা কর্তব্য। আমার বক্তৃতার পর মনোজ বসু ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “ ভাই মুজিব, আজ আমরা দুই দেশের লোক, কিন্তু আমাদের ভাষাকে ভাগ করতে কেউ পারে নাই। আর পারবেও না। তোমরা বাংলা ভাষাকে জাতীয় মর্যাদা দিতে যে ত্যাগ স্বীকার করেছ আমরা বাংলা ভাষাভাষী ভারতবর্ষের লোকেরাও তার জন্য গর্ব অনুভব করি”।” [অসমাপ্ত আত্মজীবনী, শেখ মুজিবুর রহমান, পৃ-২২৮]
আমার দেখা নয়া চীন গ্রন্থেও মাতৃভাষায় বক্তৃতা করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ বাংলা আমার মাতৃভাষা। মাতৃভাষায় বক্তৃতা করাই উচিত। কারণ পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলনের কথা দুনিয়ার সকল দেশের লোকই কিছু কিছু জানে। মানিক ভাই (তফাজ্জল হোসেন, ১৯১১-১৯৬৯),আতাউর রহমান খান(১৯০৭-১৯৯১) ও ইলিয়াস (খন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস, ১৯২৩-১৯৯৫) বক্তৃতাটা ঠিক করে দিয়াছিল। দুনিয়ার সকল দেশের লোকই যার যার মাতৃভাষায় বক্তৃতা করে। শুধু আমরাই ইংরেজি ভাষায় বক্তৃতা করে নিজেদের গর্বিত মনে করি”।[পৃ-৪৩] এ থেকেই বুঝা যায় বঙ্গবন্ধুর জাতীয়তাবোধ ও মাতৃভাষার উপর দরদ কত প্রগাঢ় ছিল। নয়া চীন তখন সদ্য কমিউনিস্ট শাসিত দেশ যার নেতা মাও সে তুং (১৮৯৩-১৯৭৬)। তিনি জনগণের রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েমে তার দেশের জনগণের মধ্যে যে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের ফল্গুধারা বইয়ে দিয়েছেন তা বঙ্গবন্ধুর আমার দেখা নয়া চীন গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন এভাবে, “রেলগাড়ির কথা বলি। কম্যুনিস্ট দেশ বলে সকল সমান হয়ে যায় নাই। ট্রেনে দু’রকম ক্লাস আছে, ‘নরম ক্লাস আর শক্ত ক্লাস’। ভাড়ায়ও ব্যবধান আছে। প্রায় দু’গুণ। একটায় গদি আছে আর একটায় গদি নাই। হালান দিয়ে দু’জন করে বসতে পারে বেঞ্চিতে। রাতে ঘুমাবার বন্দোবস্ত আলাদা রুমে হয়। সেখানেও দিনে থাকা যায়। নরম ও শক্ত ছাড়া সুবিধা প্রায় সমান। প্রত্যেক গাড়িতে লাউড স্পিকার ঠিক করা আছে, পথে পথে গান চলে। সাবধান হয়ে বসবার জন্য এবং ময়লা বা নোংরা না করবার অনুরোধ করে। বড় বড় নেতাদের রেকর্ড করা বক্তৃতা শোনানো হয়। কোনো খবর থাকলে বলা হয়। আর স্টেশনের নিকটে আসলে ১৫ মিনিট পূর্বেই বলে দেওয়া হয়, সামনে অমুক স্টেশন। যাত্রীদের তাতে খুবই সুবিধা হয়। চিৎকার করে জিজ্ঞাসা করে বেড়াতে হয় না। অনেক সময় ঘুমাইয়া থাকার জন্যে অথবা নতুন মানুষকে জানতে না পেরে স্টেশন পার হয়ে চলে যেতে হয় না। এমনি প্রত্যেক স্টেশনে বলে দেওয়া হয়। মাঝে মাঝে এসে কামরাগুলি পরিষ্কার করে দিয়ে যায়। কোনো ময়লা পড়ে থাকলে মুছে নিয়ে যায়। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার দিকে খুবই খেয়াল। গাড়িতে খাবার ঘরও আছে। যাদের খাওয়ার দরকার খেয়ে নেয়। টিকিট চেকার সাহেব মাঝে মাঝে ঘুরে যান। তবে যতদুর জানলাম বিনা টিকেটে কেহ ভ্রমন করে না… তারা ফাঁকি দিতেও চেষ্টা করে না। তারা মনে করে এ পয়সা তাদের, রাষ্ট্র তাদের, গাড়ি তাদের, নিজেকে ফাঁকি দিয়ে লাভ কী?” (পৃ-৩০) ।
আরেকদিন বঙ্গবন্ধু পিকিং হোটেলে যাবেন সাথে দোভাষী নেই, তিনি নিজেও চায়না ভাষা জানেন না। কী করা হাঁটতে শুরু করলেন।তাঁর ভাষায়, “ কিছুদূর হেঁটে দেখি একটা রিকশা দাঁড়াইয়া আছে। তাকে বললাম পিকিং হোটেল। পিকিং হোটেল ও বুঝলো, বললো: আসো, কথা না – মাথা নেড়ে। উঠে বসে পড়লাম। ভাবলাম, চিন্তা কি! কোথায় নিয়ে যায় দেখা যাক। দেখি ঠিক হোটেলেই নিয়ে এসেছে। আমার মনে একটা কথা উঠলো, দেখি বিদেশী লোক পেলে, কেমন লুট করে। আমি হটাৎ পকেটে হাত দিয়ে প্রায় ১০ টাকা পরিমাণ হাতে করে ওর সামনে তুলে ধরলাম। ভাবেসাবে বুঝাইয়া দিলাম, যাহা তোমরা নিয়ে থাকো তাই নেও। রিকশাওয়ালা আমার হাত থেকে ঠিক আট আনা পয়সা গুনে নিয়ে চলে গেল।…………তোমরা কী করে এদের চরিত্রের পরিবর্তন এত তাড়াতাড়ি করতে পারলে? তখন সে হেসে উঠে বলতে লাগলো, দেখো এদের ‘ট্রেড ইউনিয়ন’ আছে। এরা যা উপার্জন করে যতটুকু এদের দরকার তা রেখে যতটুকু সম্ভব ইউনিয়নে জমা দেয়। সেই টাকা দিয়ে ওদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া, ওদের জন্য থাকার বাড়ি, রিকশা মেরামত, চিকিৎসার বন্দোবস্ত ও অন্যান্য কাজ করে দেওয়া হয়”।(পৃ-৪৮)
বঙ্গবন্ধু কেরাণী তৈরীর শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তে আগামী প্রজন্মকে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে সদ্য স্বাধীন দেশে ড.কুদরত-ই-খুদার নেতৃত্বে একটি আলাদা শিক্ষা কমিশন গঠন করেছিলেন। সংবিধানে সকল নাগরিকের শিক্ষার সমান সুযোগ রেখেছিলেন। প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণের মাধ্যমে গণমানুষের শিক্ষা গ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করেছিলেন। সেদিনের চীন সফরের অভিজ্ঞতা সম্ভবত তাঁকে এসব সিদ্ধান্ত গ্রহণে উৎসাহিত করেছিল। যা তিনি এভাবে লিপিবদ্ধ করেন- “ বিরাট বিশ্ববিদ্যালয়। আমাদের দেশের মতো কেরানি পয়দা করার শিক্ষাব্যবস্থা আর নাই। কৃষি শিক্ষা, শিল্প, ইঞ্জিনিয়ারিং, টেকনিক্যাল শিক্ষা দেওয়ার বন্দোবস্ত করা হয়েছে। সেখানে আমার সাথে আলাপ হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর মি.হালিমের। তাঁর একটা চীনা নাম আছো, সেটা আমার মনে নাই। ভদ্রলোক ইংরেজি জানে। তাঁর সাথে প্রায় এক ঘন্টা আলাপ হলো। তিনি আমাকে বললেন, বাধ্যতামূলক ফ্রি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছি। প্রত্যেক ছেলেমেয়েকে স্কুলে দিতে হয়। সরকার তাদের যাবতীয় খরচ বহন করে। কৃষকদের জন্য কৃষি স্কুল করা হয়েছে। আমাকে একটা কৃষি স্কুল দেখানো হয়েছিল। সেখানে যুবক কৃষকদের কিছুদিনের জন্য শিক্ষা দিয়ে খামার জমিতে পাঠাইয়া দেওয়া হয়। শ্রমিকদের জন্য স্কুল করা হয়েছে। প্রত্যেক শিল্পকেন্দ্রের কাছে স্কুল আছে। বড়দের শিক্ষা দেওয়া হয় কাজের ফাঁকে, আর তাদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষার জন্য আলাদা বন্দোবস্ত আছে। সকল খোঁজ নিয়া জানা গেল যে, মাত্র চার বৎসরে তারা শতকরা ৩০ জন লোককে লেখাপড়া শিখিয়ে ফেলেছে। গর্ব করে আমাকে বললো, ’১০ বৎসর পরে যদি চীনে আসেন তবে দেখবেন একটা আশিক্ষিত লোকও নাই।(পৃ-৫৯-৬০)
কৃষি প্রধান দেশে কৃষকের ন্যায্য অধিকার ছাড়া উন্নতি সম্ভব নয়। কৃষির উন্নয়নে একটি কম্যুনিস্ট সরকার কী পরিমাণ ভূমিকা রেখেছে তা উল্লেখ করেছেন। হোহাংহো কে বলা হতো চীনের দুঃখ। বিপ্লবের পর চীনারা সেই নদীতে বাঁধ দিয়ে একে আশির্বাদে পরিণত করেছে দেশপ্রেম ও জাতীয় সংহতির দৃঢ়তায়। এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছেন, “নয়াচীন সরকার কায়েম হওয়ার পরে তারা প্রথম কাজ শুরু করলেন, ‘লাঙল যার জমি তার’ এই প্রথা প্রবর্তনের মাধ্যমে। বড় বড় জমিদারদের জমি বাজেয়াপ্ত করে গরীব কৃষকদের মধ্যে বন্টন করে দিলো। সত্যিকারের কৃষক জমির মালিক হলো। যে সমস্ত অনাবাদি খাস জমি পড়ে ছিল, তাও ভাগ করে দিলো কৃষকদের মধ্যে। হাজার হাজার বেকার কৃষক জমি পেলো। যখন তারা বুঝতে পারলো জমির মালিক তারা, তাদের পরিশ্রমের ফল জমিদাররা আর ফাঁকি দিয়া নিতে পারবে না, তখন তারা পুরা উদ্যমে চাষাবাদ শুরু করলো। তবে একথা সত্য যে, নতুন চীন সরকার সকলকে সমান করে দেয় নাই, যা আমরা কম্যুনিস্টদের সম্বন্ধে শুনি। এখনও অনেক বড় চাষি জমির মালিক আছে, তারা লোক রেখে চাষাবাদ করে। তবে প্রয়োজনের অধিক যে জমি ছিল তা বাজেয়াপ্ত করে গরিব চাষিদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে”।(পৃ-৮৯)
পরিশেষে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর জন্মশতবার্ষিকীতে তাঁর কথা দিয়েই শ্রদ্ধা জানাতে চাই। তিনি লিখেছেন, “আমার মতে, ভাত-কাপড় পাবার ও আদায় করে নেবার অধিকার মানুষের থাকবে, সাথে সাথে নিজের মতবাদ প্রচার করার অধিকারও মানুষের থাকা চাই। তা না হলে মানুষের জীবন বোধ হয় পাথরের মতো শুষ্ক হয়ে যায়।(পৃ-১১৯)
লেখক- শিক্ষক, সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়।