বঙ্গবন্ধুর পরিবার : আত্মত্যাগের অনুচ্চারিত মহান ইতিহাস

হিরন্ময় রায়
বেশ কয়েক বছর ধরেই ইতিহাস হাতড়ে ফিরছি। এ পৃথিবীর যে সকল জাতিরাষ্ট্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছে, তাদের নেতাদের ইতিহাস। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ওয়াশিংটন, ভারতের মহাত্মা গান্ধী, জহরলাল নেহেরু, ইন্দোনেশিয়ার সুকর্ণ, মোহাম্মদ আতা, বসনিয়ার আলিজা ইজেতবেগোভিচ, পাকিস্তানের জিন্নাহ, পূর্ব তিমুরের জানানা গুসমাও প্রভৃতি জাতীয় নেতাগণ স্বাধীনতা আনতে গিয়ে নির্মম নির্যাতন, জেল, জুলুম সহ্য করেছেন, সংগ্রাম করে সফল হয়েছেন। অনেককে প্রাণ দিতে হয়েছে, নির্বাসিত হতে হয়েছে। কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমান অনন্য। তিনি শুধু একা নন, তাঁর পরিবারের মতো আর কোন পরিবারকে একটি জাতি রাষ্ট্রের স্বাধীনতার জন্য এতো ত্যাগ স্বীকার করতে হয়নি। ইতিহাস তন্ন তন্ন করে খুঁজেও শেখ পরিবারের মতো আত্মবলিদানের ইতিহাস আর কোন জাতির মধ্যে পাইনি।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় তিনি সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে পূর্ব বাংলায় দুর্বার গণজাগরণ গড়ে তোলেন। ভারতের আসাম প্রদেশের সাথে থাকা ও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকা সিলেট জেলা (বর্তমান সিলেট বিভাগ) কে পাকিস্তানের অঙ্গীভূত করতে তাঁর বিশাল ভূমিকা ছিলো। কিন্তু ১৯৪৭ সালে ১৪ই আগস্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানীরা বাঙালিদের শোষন করছে। পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদ দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তান সমৃদ্ধ হচ্ছে। সরকারের সামরিক, বেসামরিক প্রশাসন, প্রতিরক্ষা বাহিনী একচেটিয়া পশ্চিম পাকিস্তানীরা দখল করে রেখেছিল। পূর্ব পাকিস্তানের বাণিজ্য চলে যায় পাকিস্তানী ২২ পরিবারের কাছে। রাজনৈতিকভাবেও পূর্বপাকিস্তানের পক্ষে কথা বলা হতো না। এরকম পরিস্থিতিতেই মাওলানা ভাসানী সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানরা আওয়ালীগ লীগ গঠন করেন। বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করে তাঁর নেতৃত্বে বাঙালিদের পশ্চিম পাকিস্তানের শোষনের বিরুদ্ধে জাগ্রত করেন এবং স্বাধিকার আন্দোলন দুর্বার করে বাঙালির জন্য একখন্ড স্বাধীন দেশের অভ্যুদয়ে এগিয়ে নিয়ে যান। এই আন্দোলনের পথ ছিল কাঁটা সংকুল, পঙ্কিল। পাকিস্তানের ২৪ বছরের শাসনামলের মধ্যে বাঙালি জাতির মুক্তির আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকে ৪৬৭৫ দিন কারাগারে থাকতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধু তখন হয় জেলে থাকতেন, না হয় পূর্ব পাকিস্তানের গ্রামে, গঞ্জে, শহরে, বন্দরে চষে বেড়াতেন বাঙালিকে মুক্তির আন্দোলনকে সংগঠিত করতে। এই আসা যাওয়ার পথেই দেখা হতো বৃদ্ধ পিতা-মাতা, স্ত্রী শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবের সাথে, সন্তানদের সাথে, ভাই বোনদের সাথে। তাঁর কারাবাসের এই নির্জনবাস কী শুধু তিনি একাই ভোগ করতেন? একটু ভাবি সকলে। তাঁর বৃদ্ধ পিতা-মাতা চাইলেই তাদের আদরের সন্তান “খোকাকে’’ কাছে পেতেন না। একজন স্ত্রী বেগম মুজিব চাইলেই আর দশটা বাঙালি বধূর মতো তাঁর স্বামীকে নিয়ে সুখের ঘর করতে পারেননি। বেগম মুজিবকেও স্বামীর জন্য দুঃশ্চিন্তা নিয়ে কাটাতে হয়েছে হাজার হাজার দিন-রাত। তাঁর সন্তান শেখ হাসিনা, শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রেহেনা, শিশু সন্তান শেখ রাসেল তাদের শৈশব হারিয়েছেন পিতৃস্নেহ বঞ্চিত থেকে। অনেক ঈদ তাদের কেটেছে নিরানন্দে। কারণ পরিবারের সবচেয়ে আশ্রয়ের যে জায়গায় ছিলেন বঙ্গবন্ধু, সেই তিনিই তখন জেলে জেলে কাটাচ্ছেন জীবন-যৌবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো। বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গবন্ধুর পরিবারে ত্যাগের কথা ভাষায় বুঝানো কঠিন, একমাত্র তাঁর জায়গায় থেকে দেখলে বুঝা যাবে আমাদের স্বাধীনতা এনে দিতে তিনি ও তাঁর পরিবার কি হারিয়েছে তাদের জীবদ্দশায়। এর কয়েকটি প্রামাণ্য দলিল ফুটে উঠেছে বঙ্গবন্ধুর “ অসমাপ্ত আত্মজীবনী ’’ বইটিতে।
বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীর পৃষ্ঠা নং ১৬৪ এর একটি জায়গা কোট করছি, ‘‘আমার বোনের বাড়িতে পৌঁছালাম, একদিন দুই দিন করে সাত দিন সেখানে রইলাম। ছেলেমেয়েদের জন্য যেন একটু বেশি মায়া হয়ে উঠেছিল। ওদের ছেড়ে যেতে মন চায় না, তবুও তো যেতে হবে। দেশ সেবায় নেমেছি, দয়া মায়া করে লাভ কি? দেশকে ও দেশের মানুষকে ভালবাসলে ত্যাগ তো করতেই হবে এবং সে ত্যাগ চরম ত্যাগও হতে পারে।”
বঙ্গবন্ধু তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনে কারাগারের অন্ধকারে কাটিয়েছেন ৪৬৭৫টি দিন-রাত। যেখানে আমরা মাত্র কয়েক দিন পরিবার বিচ্ছিন্ন থাকলে অস্থির হয়ে উঠি, অনেকে চাকুরির মায়া ত্যাগ করে পরিবারের কাছে চলে আসে। সেখানে মাত্র সাতটি দিন কাটিয়ে আবারো দেশের জন্য জেলে কাটাতে হবে জেনেও বেড়িয়ে পড়তেন বঙ্গবন্ধু। তাঁর পরিবার, তাঁর বৃদ্ধ পিতা মাতা, তাঁর স্ত্রী, সন্তান কিভাবে খাবে, কিভাবে সংসার চলবে, সেই চিন্তা করার ফুসরত পেতেন না তিনি। হয়তো তাঁর ভিতরে ভিতরে দহন হতো, কিন্তু দেশ ও জনগণের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের কাছে তাঁর ব্যক্তিগত পরিবার ছিল গৌণ।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি গ্রন্থ “শেখ মুজিব আমার পিতা” গ্রন্থে লিখেছেন, “কামাল তখন অল্প অল্প কথা বলা শিখেছে। কিন্তু আব্বাকে ও কখনও দেখেনি, চেনেও না। আমি যখন বারবার আব্বার কাছে ছুটে যাচ্ছি, আব্বা আব্বা বলে ডাকছি , ও শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছে। …ও হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞাসা করল, হাসু আপা, তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা বলি।’’
একই ঘটনার সাক্ষ্য দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু তাঁর “অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে।’’ বঙ্গবন্ধু বলছেন, “ একদিন সকালে আমি ও রেণু বিছানায় বসে গল্প করছিলাম। হাচু ও কামাল নিচে খেলছিল। হাচু মাঝে মধ্যে খেলা ফেলে আমার কাছে আসে আর আব্বা আব্বা বলে ডাকে। কামাল চেয়ে থাকে। একসময় কামাল হাচিনাকে বলছে, “হাচু আপা, হাচু আপা, তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা বলি।’’ আমি আর রেণু দু‘জনই শুনলাম। আস্তে আস্তে বিছানা থেকে উঠে গিয়ে ওকে কোলে নিয়ে বললাম,“ আমি তো তোমারও আব্বা।’’ কামাল আমার কাছে আসতে চাইত না। আজ গলা ধরে পড়ে রইল।”
ভেবে ভেবে হৃদয় ভেঙ্গে আসে। বঙ্গবন্ধুর প্রথম পুত্র শেখ কামাল তাঁর জন্মের পর কখনো তাঁর পিতাকে দেখেনি এবং তাঁকে দেখেও বুঝতে পারছে না যে, বঙ্গবন্ধু তাঁর পিতা। দেশ ও জাতির জন্য এই শেখ পরিবার কতটুকু আত্মত্যাগ করেছে।

সন্তান শেখ হাসিনা, শেখ রাসেল ও নাতি সজীব ওয়াজেদ এবং নাতনি সায়মা ওয়াজেদের সঙ্গে একান্ত পারিবারিক সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।


বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীর পৃষ্ঠা নং ১৬৪ এর আরেকটি জায়গা কোট করছি, “ আব্বা আমাকে কিছু টাকা দিয়েছিলেন। আর রেণুও কিছু টাকা নিয়ে এসেছিল আমাকে দিতে। আমি রেণুকে বললাম,“ এতদিন একলা ছিলে, এখন আরও দু‘জন তোমার দলে বেড়েছে। আমার দ্বারা তো কোনো আর্থিক সাহায্য পাবার আশা নাই। তোমাকেই চালাতে হবে। আব্বার কাছে তো সকল সময় তুমি চাইতে পার না, আমি জানি। আর আব্বাই বা কোথায় এত টাকা পাবেন। আমার টাকার বেশি দরকার নাই। শীগ্রই গ্রেফতার করে ফেলবে। পালিয়ে বেড়াতে আমি পারব না। তোমাদের সাথে কবে আর দেখা হয় ঠিক নাই। ঢাকায় এসো না। ছেলেমেয়েদের কষ্ট হবে। মেজোবোনের বাসায়ও জায়গা খুব কম। কোনো আত্মীয়দের আমার জন্য কষ্ট হয়, তা আমি চাই না। চিঠি লিখ, আমিও লিখব।’’
পরিবারকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে তিনি ছুটেছেন বাঙালিকে স্বাধীন করার সংগ্রামে। ১৯৪৭-১৯৭১ সন পর্যন্ত বাঙালির মুক্তি সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু ১৯৬৯ সালে একবার আগারতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ও ১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় ফাঁসির দোরগড়ায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। পশ্চিম পাকিস্তানে তাঁর কারাগারের সেলের সামনে তাঁর জন্য কবর খোঁড়া হয়েছিল। তবুও তিনি বাঙালির মুক্তির দাবির প্রশ্নে আপোষ করেননি। তাঁর সুদৃঢ় নেতৃত্বে, তাঁর দেখানো পথে পৃথিবীর বুকে বীর বাঙালি একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে । এই বাঙালিকে নিজের পরিবারের সদস্যদের থেকেও, নিজের রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের থেকেও, নিজের বন্ধু রাষ্ট্রদের থেকেও ভালোবাসতেন বঙ্গবন্ধু। এই বাঙালিদের মধ্য থেকে কেউ তাঁকে হত্যা করতে পারে তা তিনি বিশ্বাসই করতে পারেননি। ফলে মিত্ররা তাঁকে বারবার সতর্ক করলেও তিনি আমলে নেননি। সেই বিশ্বাসের ভিত ভেঙ্গে দিয়ে পরাজিত শত্রুদের মদদে একদল বিপদগামী বাঙালি এই জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান, তাদের জাতির পিতা, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধুকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হত্যা করে, সেখানেই থেমে থাকেনি পিশাচদের হত্যাযজ্ঞ। তাঁর স্ত্রী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ কামালে স্ত্রী সুলতানা কামাল ও শেখ জামালের স্ত্রী রোজী জামাল, বঙ্গবন্ধুর শিশু পুত্র রাসেল, তাঁর ভাই শেখ নাসের, তাঁর ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনি ও তাঁর অন্ত:স্বত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনি,আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, সেরনিয়াবাতের কন্যা বেবী, পুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, নাতি সুকান্ত বাবু. আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের বড় ভাইয়ের ছেলে সজীব সেরনিয়াবাতকে ।
কী অপরাধ বঙ্গবন্ধুর? বাঙালিকে স্বাধীনতা এনে দেয়ার, তাদের মুক্তির জন্য তাঁর তেরটি বছর কারাগারে কাটানো, তাঁর পরিবারের অনিশ্চয়তায় ভরা দুটি যুগ।
বহিরাগত শত্রুরা সাহস করেনি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার, কিন্তু স্বাধীনতায় অনিচ্ছুক পাকিস্তানপন্থী একটি গোষ্ঠী এই ঘৃণিত হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বর্হিবিশ্বের কাছে বাঙালিকে পিতৃহত্যার কলংকে ডুবিয়েছে চিরকালের জন্য।