বঙ্গবন্ধুর বাকশালনীতির ভবিষ্যৎ

ইকবাল কাগজী
জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র একস্থানে (পৃষ্ঠা : ২৩৪, দ্বিতীয় মুদ্রণ : সেপ্টেম্বর ২০১২, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিেিটড) লিখেছেন, ‘আমি নিজে কমিউনিস্ট নই; তবে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি এবং পুঁজিবাদীনীতি বিশ্বাস করি না। একে আমি শোষণের যন্ত্র হিসেবে মনে করি। এ পুঁজিপতি সৃষ্টির অর্থনীতি যত দিন দুনিয়ায় থাকবে, তত দিন দুনিয়ার মানুষের ওপর থেকে শোষণ বন্ধ হতে পারে না। পুঁজিপতিরা নিজেদের স্বার্থে বিশ্বযুদ্ধ লাগাতে বদ্ধপরিকর। নতুন স্বাধীনতাপ্রাপ্ত জনগণের কর্তব্য বিশ্বশান্তির জন্য সংঘবদ্ধভাবে চেষ্টা করা। যুগ যুগ ধরে পরাধীনতার শৃঙ্খলে যারা আবদ্ধ ছিল, সা¤্রাজ্যবাদী শক্তি তাদের সর্বস্ব লুট করেছেÑ তাদের প্রয়োজন নিজেদের দেশকে গড়া ও জনগণের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক মুক্তির দিকে সর্বশক্তি নিয়োগ করা।’ অর্থাৎ তিনি কমিউনিস্ট ছিলেন না, অথচ সমাজতন্ত্রী ছিলেন।
শেখ মুজিব কমিউনিস্ট না হয়েও সমাজতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ আত্মোৎসর্গী অমর এক বিপ্লবী। মার্কসবাদী দার্শনিক দার্ঢ্যতা তাঁর ছিল না, তিনি পুঁজিবাদের সুহৃদ হতে পারতেন, অকালে জাতি তার পিতাকে হারাত না। অকমিউনিস্ট কিন্তু অপুঁজিবাদী এবং সমাজতন্ত্র সাধনে বদ্ধপরিকর এতোটাই যে, স্বপ্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের সংবিধানে রাষ্ট্রনীতিরূপে সমাজতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন।
তাঁর রাজনীতির একটা আদর্শিক রূপরেখা ছিল। জানতেন, প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা না ভাঙলে তাঁর স্বপ্ন সফল হবে না। ৩০ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীন করা দেশে যদি পাকিস্তানের মতোই মানুষ-কর্তৃক-মানুষকে-শোষণ টিকে থাকে, মানুষের উপর মানুষের প্রভুত্ব থাকে, মানুষে মানুষ পীড়ন করে, সংখ্যালঘিষ্ঠ ধনীরা সর্বসম্পদসুবিধা ভোগ করে ও সুবিধাবাদীদের হাতেই থাকে রাষ্ট্রক্ষমতা, গণমানুষ দারিদ্র্যের দুর্ভোগে পীড়িত হয় ও অশিক্ষার অন্ধকারে তাদের জীবন কাটে, তাহলে দেশটাকে প্রতি-মুহূর্তে-মৃত্যুর-সঙ্গে-লড়ে পাকিস্তান থেকে আলগা করলেন কেন ? ছয় দফা দিয়েছিলেন কেন ? মানুষ যদি বেকার থাকলো, তাদের জীবন যদি উন্নত না হলো, তো এই স্বাধীনতা দিয়ে মানুষ করবেটা কী ? এমন হলে, দেশের কৃষক-শ্রমিক মেহনতি মানুষকে প্রতিশ্রুত তাঁর ওয়াদা রক্ষা হবে না। দেশের সাধারণ মানুষের মুখে তিনি হাসি ফুটাতে পারবেন না। অথচ দেশের দুঃখী মানুষের দুঃখ দূর করাই তাঁর জীবনব্রত। তাঁর রাজনীতিকে এই ব্রতের পথ ধরেই চলতে হবে। পাকিস্তানের মতো ধনিক সৃষ্টির রাজনীতির পথ তাঁর জন্যে নয়। গণমানুষের দুঃখকষ্ট দূর করার অর্থনীতি চাই। পুঁজিবাদ নয়, এমন ‘একটা নতুন অর্থনীতির পথ’ তিনি দেখে এসেছেন চীনে।
১৯৫২ সালে চীনসফরের অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালের পাকিস্তানের সার্বিক পরিস্থিতির মূল্যায়ন করে তিনি ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে লিখেছেন, “আমরা স্বাধীন হয়েছি ১৯৪৭ সালে আর চীন স্বাধীন হয়েছে ১৯৪৯ সালে। যে মনোভাব পাকিস্তানের জনগণের ছিল, স্বাধীনতা পাওয়ার সাথে সাথে আজ যেন তা ঝিমিয়ে গেছে। সরকার তা ব্যবহার না করে তাকে চেপে মারার চেষ্টা করেছে। আর চীন সরকার জনগণকে ব্যবহার করছে তাদের দেশের উন্নয়নমূলক কাজে। তাদের সাথে আমাদের পার্থক্য হল, তাদের জনগণ জানতে পারল ও অনুভব করতে পারল এই দেশ এবং এদেশের সম্পদ তাদের। আর আমাদের জনগণ বুঝতে আরম্ভ করল, জাতীয় সম্পদ বিশেষ গোষ্ঠীর আর তারা যেন কেউ নন।” (পৃষ্ঠা : ২৩৪।) এই উপলব্ধি থেকে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, নিজের মতো করে বাকশাল করবেন। এ এক নতুন রাজনীতি, নতুন অর্থনীতি। যে-রাজনীতি, যে-অর্থনীতির কোনও আন্তর্জাতিক মুরুব্বি থাকবে না, দেশের মানুষকে মুক্তি দেবে শোষণ থেকে। বাকশালের গঠনতন্ত্র পাঠ করলে তা বুঝা যায়।
যে-কারও মনে হতেই পারে সমাজতন্ত্র আর বাকশালের কর্মসূচি একটা আর একটার বিকল্প। সেখানে (গঠনতন্ত্রের প্রথম ধারা : লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য-এর ১ উপধারায়) একস্থানে বলা হয়েছে, ‘[…] কৃষক ও শ্রমিকসহ মেহনতি ও অনগ্রসর জনগণের ওপর শোষণ অবসানের জন্য পূর্ণ অর্থনৈতিক মুক্তি ও সামাজিক স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শোষণমুক্ত ও সুষম সাম্যভিত্তিক এক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা […]’ বাকশাল গঠনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। এই ঘোষণার নিহিতার্থ সন্ধানে সমাজতান্ত্রিকতার সৌরভ যে-কেউ পেতেই পারেন। এমনি একটি নিহিতার্থ তৎকালের আওয়ামী লীগের ভেতরের প্রতিক্রিয়াশীলদের চেতনায় যেমন প্রতিভাত হয়েছিল, তেমনি প্রতিভাত হয়েছিল সা¤্রাজ্যবাদের দালাল ও সা¤্রাজ্যবাদীদের চেতনায়ও। তারা ভয় পেয়েছিল এবং বুঝেছিল, মুজিব একদা ছয় দফা দিয়েছিলেন কিন্তু সেটা ছিল পূর্ববঙ্গের স্বাধীনতার সনদ, তেমনি এবার বাকশালের কর্মসূচি দিয়েছেন, আসলে সেটা সমাজতন্ত্রের সনদ।
একজন আবুল বারকাত ‘বঙ্গবন্ধু-সমতা-সা¤্রাজ্যবাদ’ নামে একটি বই লিখেছেন। তিনি মালয়েশিয়ার মহাথির মোহাম্মদের দেশ-পরিচালনার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর দেশ-পরিচালনাকে তুলনা করে তাঁর (বঙ্গবন্ধুর) দেশোন্নয়নের নীতিকে ‘দেশীয় উন্নয়ন দর্শন’ বলে অভিহিত করেছেন এবং বলেছেন, ‘[…] মালয়েশিয়ার নেতৃত্ব “সমাজতন্ত্রের” কথা বলেননিÑ ড. মহাথির মোহাম্মদ আসলে নিয়ন্ত্রিত মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রবক্তা ছিলেন, আর আমাদের বঙ্গবন্ধু তার উন্নয়ন দর্শনের অন্যতম প্রধান অবিচ্ছেদ্য মৌল হিসেবে সমাজতন্ত্র গ্রহণ করেছিলেন (যা সংবিধানের চার মূল স্তম্ভের অন্যতম একটি স্তম্ভ)।’ (পৃষ্ঠা : ১১৩Ñ১১৪, মুক্তবুদ্ধি প্রকাশনা, দ্বিতীয় মুদ্রণ : ২৩ আগস্ট ২০১৫) আজকের দিনে আরও অনেক বিদগ্ধজন গবেষণা করে মুজিবের জনতান্ত্রিক রাজনীতির মর্মার্থ উদ্ধার করছেন এবং অবগত হওয়া গেছে যে, পুঁজিবাদের উচ্ছেদ ঘটিয়ে সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াসই তাঁর মৃত্যুকে নিশ্চিত করেছিল। পুঁজিবাদ সেদিন মুজিবকে হত্যা করে নি, হত্যা করেছিল বাংলাদেশের মানুষের শোষণমুক্তির স্বপ্নকে। যে-মুক্তির জন্যে এখনও প্রাণান্তকর সংগ্রাম করে চলেছে দেশের মানুষ।
যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশ গড়া ও মানুষের দুঃখ দূর করার বাকশাল নামক পথটি আর যা-ই হোক তাতে অন্তত এটা প্রকাশ পায় না যে, তিনি তাঁর জনমভর-স্বপ্ন-দেখা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি কী স্বপ্ন দেখতেন ? একজন রওনক জাহান ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : রাজনৈতিক চিন্তাধারা’ শিরোনামের এক প্রবন্ধে লিখেছেন, ১৯৭২ সালে একবার এক জনসভায় বঙ্গবন্ধু তাঁর স্বপ্নের কথা বলেছিলেন, “আমি কী চাই ? আমি চাই বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত খাক। আমি কি চাই ? আমার বাংলার মানুষ সুখী হোক। আমি কী চাই ? আমার বাংলার মানুষ হেসে খেলে বেড়াক। আমি কী চাই ? আমার সোনার বাংলার মানুষ আবার প্রাণ ভরে হাসুক।” (কালি ও কলম, ষোড়ষ বর্ষ দ্বাদশ সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০, পৃষ্ঠা : ৪৪)। কথা ক’টি নিতান্ত সহজেই যে-কোনও সাধারণ বোধবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের মনে এই বোধ জাগায় যে, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের একটাই অর্থ : দেশের গরিব দুঃখী মানুষের দুঃখ দূর করা। আর এই দুঃখ দূর করার সাধনা সমাজতন্ত্রের সঙ্গেই কেবল যায় বা খাপ খায়, যেখানে বা যে-আর্থসামাজিক বিন্যাসের ভেতরে মানুষ মানুষের প্রভু হয়ে উঠবে না, মানুষ মানুষকে দাসে পরিণত করবে না, মানুষ মানুষের উদ্বৃত্তশ্রম শোষণ করে নিজে রঁতিয়ে হয়ে বেঁচে থাকার অন্যায় স্বপ্নে বিভোর থাকবে না। সহজ কথায় মানুষের জীবন হবে শোষণমুক্ত, মানুষ বাঁচবে সত্য ও স্বাধীনতার মাঝে সুন্দরের জন্য, মানুষ বাঁচবে মানুষের জন্য।
১৯৭৫-য়ের ১৫ আগস্টের আগের সময়টুকুতে বোধ করি শত্রুমিত্র ভেদে সকলেইর হৃদবোধ হয়ে গিয়েছিল যে, মুজিব বাকশালের কর্মসূচি বাস্তবায়নের দ্বারা সমাজতন্ত্র বিনির্মাণ করবেন। দেশ বদলে যাবে, রাজনীতিক ক্ষমতায়নের পালাবদল হবে, লুটপাটের আর মওকা থাকবে না, রাজনীতি নিয়ে বাণিজ্য করার দিন চিরতরে শেষ হয়ে যাবে, দুর্নীতিবাজ প্রতারক রাজনীতির অবসান ঘটবে, অবসান ঘটবে যে-রাজনীতিকে তিনি প্রত্যক্ষ করে এসেছেন অতীতের দিনগুলোতে। আসলে প্রচলিত রাজনীতির ধাঁচধরণটা মুজিবের নখদর্পর্ণে ছিল, এর আগাপাছতলা তিনি জানতেন, লেনিন যেমন জানতেন, “যত অসভ্য ও জরাজীর্ণ মনে হোক না কেন প্রত্যেকটি পুরনো প্রতিষ্ঠানই টিকে আছে কোনো না কোনো শাসক শ্রেণির শক্তির জোরে।” (সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক বিপ্লব, প্রগতি প্রকাশন মস্কো, ১৯৬৮, পৃষ্ঠা : ১৪।) এবং সেটা পাল্টে ফেলতে হবে। মুজিব জানতেন, সমাজতন্ত্র করার জন্য রাশিয়াতে লেনিন কিংবা চীনে মাওয়ের যে-রকম বিদগ্ধ ও সংগ্রামী মার্কসবাদী পার্টি ছিল সে-রকম পার্টি তাঁর নেই। তাঁর চারপাশে ছিল অধঃপতিত রাজনীতির উত্তরাধিকারী মোস্তাকের মতো অন্তর্ঘাতপ্রসূ বিশ্বাসঘাতকরা, যারা সুযোগে সহযাত্রীর খুনি হতেও কসুর করে না। ইতিহাস সাক্ষী তারা কী করেছে।
মুজিব তাঁর স্বপ্নসফলের একটি বিকল্প রাস্তা বের করেছিলেন এবং যথারীতি বাস্তবায়নের পথে প্রথম কদম ফেলেছিলেন। যে-মানুষ পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শোষণ রুখতে ছয় দফা দেন, ৭ মার্চে কয়েক মিনিটের ভাষণে প্রকৃতপ্রস্তাবে স্বাধীনতার দ্বারোন্মোচন করেন, ২৫ মার্চ বিপর্যয়ের মুখে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, এমনি সব বিশ্ববিরল অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলা এই সনিষ্ঠ মানুষকে সমাজতন্ত্রের পথে ‘প্রথম কদম ফেলতে’ দেওয়াটা পুঁজিবাদের পক্ষে ঠিক নয়। এই বোধ থেকে তাঁকে তৎকালের সা¤্রাজ্যবাদ ও সা¤্রাজ্যবাদের দলালরা কোনও সুযোগ দিতে রাজি ছিল না।
পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র এক সঙ্গে বাস করে না। সুতরাং মুজিব যখন বাকশাল করতে ব্যস্ত, পুঁজিবাদ তখন তাকে হননের ব্যবস্থা করে। আবুল মাল আবদুল মুহিত লিখেছেন, “[…] একটি ষড়যন্ত্রকারী দেশশত্রু গোষ্ঠী পাকিস্তান ও লিবিয়ার সহায়তায় বাংলাদেশে প্রতিবিপ্লবের ব্যবস্থা করে। তাদের দলটি ছিল কতিপয় সেনা কর্মকর্তা এবং কয়েকজন রাজনীতিবিদ নিয়ে গঠিত।” (বাংলাদেশের গৌরব বিশ্বনেতা শেখ মুজিবুর রহমান, কালি ও কলম, ষোড়শ বর্ষ, দ্বাদশ সংখ্যা, জানুয়ারী ২০২০, পৃষ্ঠা : ১১) এবং আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী লিখেছেন, “পাকিস্তানী ইনটেলিজেন্স এবং মর্কিন সিআইএ’র প্রত্যক্ষ মদদে” [তাজ-উদ্দীন বিতর্ক ॥ ইতিহাসের আলোকে (৪), চতুরঙ্গ, জনকণ্ঠ : ১৯ আগস্ট ২০২০, পৃষ্ঠা : ৫ ] মুজিব হত্যার ঘটনাটি ঘটেছে। তাঁর এক ঘনিষ্ঠজন তোয়াব খান লিখেছেন, “চিলির নির্বাচিত প্রগতিশীল প্রেসিডেন্ট আলেন্দেকে হত্যার পর বঙ্গবন্ধু অবিলম্বে নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি প্রচার করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি একথাও বলেছিলেন, একে একে আমাদের সবাইকে এভাবে শেষ করা হবে। এবার টার্গেট করা হবে আমাকে। কী আশ্চর্য সেই ভবিষ্যদ্বাণী।” (কী আশ্চর্য সেই ভবিষ্যদ্বাণী, জনকণ্ঠ, ৮ আগস্ট ২০২০, পৃষ্ঠা : ২)।
মুজিবের (১৯২০Ñ১৯৭৫) জন্মের কয়েক বছরের মধ্যেই লেনিন (১৮৭০-১৯২৪) মৃত্যুবরণ করেন। এই লেনিন একদা (১৯১৪) বলেছিলেন, “পুঁজির গোটা ইতিহাসটাই হল হত্যা ও লুঠ, রক্ত ও পাঁকের ইতিহাস”। (সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক বিপ্লব, প্রগতি প্রকাশন মস্কো, ১৯৬৮, পৃষ্ঠা : ২৩।) নিজের জীবনের রাজনীতিক অভিজ্ঞতার আলোকে লেনিনের মতোই মুজিব জেনেছিলেন পুঁজির রক্তাক্ত ইতিহাসকে। তিনি বলেছেন, “এ পুঁজিপতি সৃষ্টির অর্থনীতি যত দিন দুনিয়ায় থাকবে, তত দিন দুনিয়ার মানুষের ওপর থেকে শোষণ বন্ধ হতে পারে না।” এবং যথারীতি ইতিহাসের এই রক্তাক্ত নোংরা পথ থেকে নেমে তিনি হাঁটতে শুরু করে ছিলেন অন্যরকম একটি সুন্দর পথে, প্রগতির পথে।
মানুষ তার মুক্তির পথ বেছে নেবেইে, পুঁজির পথ মানুষ একদিন পরিহার করবেই। তখন মুজিবের নাম উচ্চারিত হবে সেই সব শ্রেষ্ঠ মানুষদের সঙ্গে, যাঁরা পৃথিবীকে পৃথিবীর মানুষকে গভীরভাবে ভালোবেসে ছিলেন। উত্তর প্রজন্মের মানুষেরা নিজেদের জীবনকে সুন্দর, স্বচ্ছন্দ ও ঋদ্ধ করার জন্যে যে-আর্থসামাজিক বিন্যাসই বেছে নিক না কেন, সেটা বাকশালনীতির আর্থসামজিক বিন্যাসের চেয়ে খুব একটা তফাৎ কীছু হবে বলে মনে হয় না। এমন সময় আসবে যখন বাংলাদেশে মানুষ মাত্রেই মুজিবের ভ- অনুসারী হবে না, প্রতারণা করবে না মুজিবের নীতি-আদর্শের সঙ্গে। বাংলাদেশের মানুষকে মুজিবের প্রকৃত অনুসারী হয়ে বাকশালের রাজনীতিকে জীবনের একমাত্র উপায়, মানুষের মুক্তির একমাত্র মীমাংসা বলে মেনে নিতে হবে। সমাজতন্ত্রই বলেন আর বাকশালনীতিই বলেন, তাতে কীছু যায় আসে না, নিপীড়িত মানুষের মুক্তির জন্য এর বাইরে কোনও বিকল্প নেই। ফিরতে হবে মুজিবের কাছেই। আর সে-ফেরাই হবে মার্কস, লেনিন কিংবা মাওয়ের কাছে ফেরা। একেই বলে লাউয়ের নাম কদু।