বন্ধ হোক এই উন্মত্ততা জেগে উঠুক মানবতা

বাঙালি হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গা পূজার অষ্টমীর দিন কুমিল্লা-ঘটনার পর সারা দেশব্যাপী যেসব ঘটনা ঘটছে তা এক কথায় অকল্পনীয়। দেশের বিভিন্ন জায়গায় হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দির ও প্রতিমা ভাংচুরসহ বাড়িঘর আক্রান্ত ও লুণ্ঠনের শিকার হচ্ছে। সরকারিভাবে আশ্বস্ত করার পরও ধারাবাহিকভাবে এসব ঘটনা ঘটে চলেছে। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালনের এই বছরে এমন সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস কবলিত বাংলাদেশ দেখার মতো দুঃখজনক বিষয় আর কিছু হতে পারে না। শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে একটি জনগোষ্ঠী ক্রমাগত নিপীড়নের শিকার হতে থাকবে এমনটা আমাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন বীর প্রজন্ম চিন্তাও করেননি। তাদের চিন্তা ও চেতনায় ছিলো একটি আধুনিক, সহনশীল, সমতাপূর্ণ রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যয়। স্বাধীনতা লাভের পঞ্চাশ বছরের মাথায় এসে আজ আমরা এইসব মহান আদর্শের ভুলুণ্ঠন প্রত্যক্ষ করছি। এর একটাই অর্থ, স্বাধীনতার পর থেকে আমরা জাতি ও রাষ্ট্র গঠনের আদর্শিক দিকটাকে উপেক্ষা করে গেছি, ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়। এই উপেক্ষার সুযোগে বিপরীত মতাবলম্বীরা নিজেদের আদর্শের ভিত গেঁড়েছে শক্তপোক্তভাবে। এই ভিত আজ এতোটাই শক্ত যে, রাষ্ট্রকে চোখ রাঙাচ্ছে তারা। আমরা অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে আশঙ্কা করছি, এই ধারা অব্যাহত থাকলে মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধসম্পন্ন বাংলাদেশ হয়ে যাবে ইতিহাসের কোনো এক অজানা অধ্যায়।
বিশ্বের বহু দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় তেমন সুখে-শান্তিতে নেই। বিশেষ করে শিক্ষা ও অর্থনীতিতে অনুন্নত দেশগুলোতে এই অবস্থা অতিশয় খারাপ। ধর্মকে রাজনৈতিক অনুষঙ্গ বানিয়ে ফায়দা লুটার কৌশল বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছে বিভিন্ন দেশে। আমাদের দেশে সাম্প্রদায়িকতার ট্রাম্প কার্ডটি খেলা হয় বিবিধ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। কখনও ভোটের রাজনীতিতে ফায়দা তুলতে, কখনও দেশান্তরী করে সংখ্যালঘু ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর সম্পদ দখল করতে, কখনও ধর্মকে ব্যবহার করে ক্ষমতারোহণ করতে, কখনও নিছক প্রতিশোধপ্রবণতা মিটাতে। বাংলাদেশে স্বাধীনতার অল্প পর থেকেই এই প্রবণতার শুরু, পচাত্তরের পর যা প্রাতিষ্ঠানিকতা পেয়ে আজ বিশাল বিষবৃক্ষে পরিণত হয়েছে। পরিসংখ্যান বলে, হিন্দু জনসংখ্যা এই দেশে ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। এই হ্রাস পাওয়ার একটাই অর্থ, তা হলো- আমরা সমাজ-রাষ্ট্রকে অসাম্প্রদায়িক চরিত্রের ও সর্বজনীন রূপ দিতে পারিনি।
সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের পিছনে সাধারণ জনগোষ্ঠীর তেমন কোনো সম্পর্ক থাকে না। সাধারণ জনগোষ্ঠী তাদের দৈনন্দিন রুটি রুজির চিন্তায় ব্যস্ত থাকেন। তারা রাজনীতির নোংরা খেলায় জড়াতে অপছন্দ করেন। কিন্তু উদ্দেশ্যসন্ধানী সংখ্যাল্প গোষ্ঠী এমনভাবে ছক আঁটে যেখানে অনেক সময় এই সাধারণ জনগোষ্ঠীর একটি অংশ বিভ্রান্ত ও আবেগতাড়িত হয়ে পড়ে। আবেগের এই জায়গাটি সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী খুব ভালভাবে কাজে লাগাতে পারছে। মানবিক গুণাবলীকে বিকশিত করার প্রকৃত শিক্ষার অভাব এর অন্যতম কারণ। অন্যান্য কারণের মধ্যে রয়েছে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অনুপস্থিতি, ন্যায্য বণ্টনের জায়গায় অন্যায্যতা, গণমুখী রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক চর্চার অভাব প্রভৃতি। আজ বাংলাদেশে যে সাম্প্রদায়িক ঘটনাবলী ঘটছে তার প্রতিবাদে সারা দেশে সকল নাগরিক গোষ্ঠীর অংশগ্রহণে বড় কোনো কর্মসূচীর দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। তবুও প্রতিবাদ আছে, গণমাধ্যম থেকে শুরু করে প্রগতিশীল রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-সামাজিক মহল, বিবেকসম্পন্ন মানবিক জনগোষ্ঠী, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ; যে যেমনভাবে পারেন প্রতিবাদ করছেন। কিন্তু প্রান্তিক পর্যায়সহ সর্বস্তরে আলোড়ন তুলতে দরকার আরও বড় সামাজিক ঐক্য ও প্রতিরোধ। সাম্প্রদায়িকতাকে দূর করতে হবে মানবিকতা দিয়ে । এই মানবিক উত্থানের জন্য সকলের প্রয়াস শক্তিশালী করতে হবে।
স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরে আমরা এমন বাংলাদেশ দেখতে চাইনি। ধর্মীয় পরিচয়ের উর্দ্ধে উঠে মানবিক বাংলাদেশ গঠনের যে স্বপ্ন ছিলো স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম প্রত্যয় তা ফিরিয়ে আনাই হবে চলমান সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস কমানোর পন্থা। তাই সকলের প্রতি আমাদের আহ্বান, কোনো উন্মত্ততা নয়, নয় কোনো অমানবিক কর্মকাণ্ড; আসুন সকলে মিলে মানবিক বাংলাদেশের পরিচয় প্রতিষ্ঠা করি বিশ্ব সভায়।