- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://sunamganjerkhobor.com -

বন্যা : পাঁচ দিন পর অনেকের লাশ দাফন হয়েছে

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জে কবর দেবার মতো জমি না থাকায় ৫ দিন পর লাশ দাফন করা হলো আশরাফ আলীর। শহরতলির সুরমা ইউনিয়নের ইব্রাহিমপুর গ্রামের কবরস্তানের সামান্য অংশ ভাসায় বুধবার দুপুরে আশরাফ আলীর লাশ দাফন হয়। এই গ্রামের আরেকজন সাজন মিয়ার মরদেহ পাঁচদিন হয় কবরস্তানের কফিনেই আছে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার কবরস্তানের অন্য অংশ ভাসলে, এই লাশ দাফন করবেন জানিয়েছেন স্বজনরা।
বৃহস্পতিবার উজানের ঢল ও প্রবল বর্ষণে সুনামগঞ্জ শহরসহ প্রতিটি গ্রাম প্লাবিত হয়। শুক্রবার ভোর রাতে হঠাৎ করে পানি চার থেকে পাঁচ ফুট উচ্চতায় বাড়ি-ঘরসহ জনপদে প্রবেশ করতে থাকে। পরিস্থিতি এতোই ভয়াবহ আকার ধারণ করে একতলা ঘরবাড়ি পানির নীচে চলে যায়। উচুঁ কবরস্তান – শ্মশানেও গলা থেকে ডুব সমান পানি ছিল। এই অবস্থায় স্বজনের লাশ কফিনে ঢুকিয়ে কবরে নিয়ে বাঁশ কোপে বেঁধে রেখেছিলেন কেউ কেউ।
সুনামগঞ্জ শহরতলির ইব্রাহিমপুর ইব্রাহিম আলী জানালেন, ঘরে ছাল সমান পানি হলে বাবাকে নিয়ে ইব্রাহিমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দু’তলায় ওঠেন তারা। ওখানেই শুক্রবার রাত পৌঁনে একটায় বাবা আশরাফ আলী (৭০) মারা যান। পরেরদিন অনেক চেষ্টা করে একটি কাঠের বাক্সের কফিন নিজেরাই তৈরি করেন তারা। পরে দুটি বাঁশ কোপে কবরস্তানে পানির ওপরে লাশ বেঁধে রাখেন। ৫ দিন পর বুধবার কবরস্তানের উচুঁ অংশ ভেসে ওঠলে বাবার লাশ দাফন করেন তারা। ইব্রাহিম আলী কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ত্রাণকেন্দ্রে গিয়ে হঠাৎ করে বাবা অসুস্থ্য হলে, বিনা চিকিৎসায় মারা যান তিনি।
একই গ্রামের সাজন মিয়া (৬০) বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা থেকে ফেরার সময় বাসে মারা যান। তাকেও একদিন পর শনিবার কাঠের বাক্সে ঢুকিয়ে ইব্রাহিমপুর কবরস্তানে নিয়ে বাঁশ কোপে বেঁধে রাখা হয়।
স্থানীয় ইউপি সদস্য গিয়াস উদ্দিন বললেন, পাঁচ-ছয় ইউনিয়নের মধ্যে কোন মরদেহের কবর দেবার ভাসা জায়গা ছিল না। আমরা চেষ্টা করেছি সাহায্য করার। পরে তাদেরকে কাঠের বাক্স দিয়ে সহায়তা করে বলেছি, কফিন নিয়ে পানির উপরে ভালো করে বেঁধে রাখো। পানি কমলে কবর দেবে। আজ কবরস্তানের উঁচু একটি অংশের পানি কমেছে, এজন্য একজনের কবর দেবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সাজন মিয়াকে কাল কবর আরেকটু ভাসলে কবর দেওয়া হবে।
শহরতলির ইব্রাহিমপুরে দাফন করার জায়গা না থাকায় ছয়দিন হয় মৃত ব্যক্তির মরদেহ নিয়ে স্বজনরা বসে আছেন, খবর পেয়ে বুধবার কোস্টগার্ডের একটি দলও সেখানে লাশ উদ্ধার করতে যায়।
কোস্টগার্ডের কর্মকর্তা লে. সাব্বির আলম বললেন, বানভাসিদের উদ্ধার ও ত্রাণ প্রদানে কাজ করছে কোস্টগার্ড। বুধবার সকালে আমরা খবর পাই লাশ দাফনের জায়গা না পেয়ে ছয়দিন ধরে লাশ নিয়ে বসে আছে দুটি পরিবার। আমরা তাদের সহায়তা করতে যাই। গিয়ে দেখেছি কবরস্তানের উচুঁ অংশ ভেসেছে এবং একজনের লাশ দাফন হচ্ছে। আরেকজনের লাশ দাফনে আমরা সহায়তা করবো। স্বজনরা জানিয়েছেন, এই কবরস্তানেই কাল বৃহস্পতিবার লাশ দাফনের কাজ করবেন স্বজনরা।
কেবল এই তিনজন নয়, স্বজনের খোঁজ নেই, কিংবা মৃত স্বজনের লাশ নিয়ে বেকায়দায় পড়েছিলেন আরো অনেকে।
শহরতলির ফিরোজপুরের অরুন চন্দ্র দাসের স্ত্রী মাখন রানী দাস তার মেয়ের বাড়ি দোয়ারায় ছিলেন। বৃহস্পতিবার ঘরে প্রবলবেগে পানি ঢুকার সময় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি। ওখানে দুইদিন মৃতের শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে না পেরে ট্রলারে মরদেহ নিয়ে শনিবার সুনামগঞ্জে আসা হয়। এখানে আসার পর আত্মীয়-স্বজনরা অনেক চেষ্টা করেও লাশের শেষকৃত্যের কোন স্থান পান নি।
মৃতার আত্মীয় বিশেন্দু দেব বলেন, পরে সকলের পরামর্শে মরদেহে পাথর বেঁধে সুরমা নদীতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়।

  • [১]